ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন | ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
[সোমবার সকালে ঢাকা থেকে সিলেটমুখী বিমানের একটি ফ্লাইট উড্ডয়নরত অবস্থায় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এতে সিলেটগামী ওই ফ্লাইটটি মাঝ আকাশ থেকে আবার ঢাকায় ফিরে যায়। এই ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন। নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা মঙ্গলবার ফেসবুকে তুলে ধরেছেন তিনি-]
বিমানের ঢাকা-সিলেট ফ্লাইট। ৩১ আগস্ট সকাল ১১ টার ফ্লাইট। বেশ চমৎকার ব্যবস্থাপনা। ভালোই লাগল। কর্মীদের মধ্যে সেই চিরচেনা জড়োসড়ো ভাব নেই। সকালটাও বেশ পরিচ্ছন্ন। বিমানবন্দরের কাউন্টারে তখন আরও তিনটি বেসরকারি সংস্থার বিমান—‘সিলেট, সিলেট’ বলে যাত্রীদের ডাকাডাকি করছে। দেখে মনে হলো, সিলেটের মানুষজন সড়কপথের ঝক্কিঝামেলা এড়িয়ে আকাশপথেই চলাচল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
যথারীতি আমাদের ফ্লাইটও উড়ে গেল।
আমি আমার মেটা গ্লাসটি পরে বেশ আয়েশ করে বসে আছি। গোটা বিশেক যাত্রী। সামনে-পেছনে বসা লোকজন একে অন্যের সঙ্গে বেশ জোরে গল্প করছেন। মেটা গ্লাসে তাদের কথাবার্তাও রেকর্ড হচ্ছিল। বিমানে বসে অন্য কারও নীরবতার প্রতি বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে আলাপ জমিয়ে তোলার এক অসাধারণ ক্ষমতা আমাদের যাত্রীদের আছে। আলাপের বিষয়ও বিস্তৃত—মধ্যপ্রাচ্যে কার কোথায় চাকরি, কোন সরকারি অফিসে কী হচ্ছে, কে কাকে চেনে—সবই চলছে।
মিনিট বিশেক পর হঠাৎ পাইলটের কণ্ঠ ভেসে এলো—
‘Ladies and gentlemen…’
আমি বেশ উৎসাহী হয়ে উঠলাম। নিজের শহরে দ্রুতই নামছি। মনে মনে দিনের সূচিটাও মিলিয়ে নিচ্ছি। ভায়রা ভাই জানিয়েছেন, মাছ আর ডাল-ভাতের মধ্যাহ্নভোজে আমাকে যোগ দিতে হবে। তিনি হয়তো আমাকে নিতে বিমানবন্দরেও চলে আসবেন। পাইলটই হয়তো পরিবারের কেউ, শহরের কেউ। কোনও সারপ্রাইজ ঘোষনা আসছে। যেমন করে দেশের বাইরে এমন হয়। পাইলট যাত্রী বেশে তাঁর শিক্ষককে দেখে মাইক্রোফোনে অভিবাদন জানায়।
আমাকে হতাশ করে দিয়ে পাইলট জানালেন—যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আমরা আবার ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে ফিরে যাচ্ছি।
মুহূর্তের মধ্যে বিমানের পরিবেশ বদলে গেল।
সামনে বসা খালাম্মা দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেছেন। পাশের আসনে সিঁদুর পরা মাসীমাও মন্ত্র জপ করছেন। ধর্ম-বর্ণের বিভাজন তখন কোথায় যেন উধাও। সবাই যার যার পদ্ধতিতে ওপরওয়ালার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছেন।
এমন সময় পেছন থেকে একজন চিৎকার শুরু করলেন—
‘আমি কিন্তু শুরু থেকেই বুঝেছি, ইঞ্জিনে সমস্যা আছে!’
তিনি জানালেন, দীর্ঘদিন ট্রাক চালান। ইঞ্জিনের শব্দ শুনেই বোঝা গিয়েছিল—গড়বড় আছে। এমন অবস্থায় তিনি কখনো ট্রাক নিয়ে রাস্তায় নামতেন না।
পাইলট ফ্লাইট শুরুর আগেই সেটা বুঝতে পারেননি—এ নিয়ে তিনি যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। বিমান তখন আকাশে, আর তিনি পাইলটকে নিয়ে যে ভাষায় সমালোচনা শুরু করলেন, তা এখানে পুনরুৎপাদন না করাই ভালো।
বিমান ক্রুরা নিজেদের সামলে আমাদেরও শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন। একসময় জানালেন, ঢাকায় নেমে দ্রুতই অন্য একটি বিমানে আমাদের সিলেট পাঠানো হবে।
পেছনের সেই ভদ্রলোক তখন ঘোষণা করলেন—
‘কোনো অবস্থাতেই আমি আর এই বিমানে উঠব না!’
ট্রাক চালানোর অভিজ্ঞতা বলে কথা!
আমার পাশের আসনে দুই ভাই—সুলতান ও হোসেন। আমার কোনো নড়াচড়া নেই দেখে বেচারাদের মনে হয় আমার জন্য মায়া হলো। একজন মিষ্টান্ন এগিয়ে দিলেন।
বললেন, ‘ভাই, সকাল থেকে কিছু খাননি।’
মিষ্টান্ন সাধারণত এড়িয়ে চলি। কিন্তু জীবনের কিছু কিছু মুহূর্তে খাদ্যাভ্যাসের নীতিমালা সাময়িক স্থগিত রাখা যায়। মনে হলো—এখনই বোধহয় মিষ্টি খাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
এরপর সেই ট্রাকচালক ভাইটি আমাকে উদ্দেশ করে বললেন—
‘আপনি কিছু বলছেন না দেখছি। কিছু টের পাননি?’
আমি বোকার মতো তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আসলে তিনি সমস্যাটা আগে থেকেই বুঝেছিলেন—এমন একটা ভাব ধরে সময় নিচ্ছিলাম। কী বলব! বললাম না কিছু। বিমান ক্রুরা সম্ভবত বুঝতে পারলেন, আমি অন্তত এই মুহূর্তে তাদের কাজে সহযোগিতা করছি। তাঁদের মুখে কৃতজ্ঞতার এক ধরনের মিষ্টি হাসি।
শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই ঢাকায় অবতরণ করলাম। দ্রুত অন্য একটি বিমানে উঠিয়ে দেওয়া হলো আমাদের।
নতুন বিমানে উঠেই ট্রাকচালক ভাই আবার তাঁর বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে হাজির—
‘এবার সাউন্ডটা শুনেন। আগেরটার চেয়ে ভিন্ন।’
আমি মেটা গ্লাসের রেকর্ড চালিয়ে শোনালাম।
সত্যিই ভিন্ন!
তখন মনে হলো, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কখনো কখনো পাইলটের পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ ট্রাকচালকের উপস্থিতিও বেশ উপকারী হতে পারে।
এবার আর কোনো নাটক হলো না। নিরাপদে সিলেট অবতরণ করলাম।
শাহজালালের শান্ত শ্যামল নগরীতে নীরবেই যেন জড়িয়ে ধরে বলেছে - এসেই পড়েছ যখন দিনকয়েক থেকে যাও। সেই উৎকণ্ঠা, দোয়া-দরুদ, মন্ত্র, ট্রাকের ইঞ্জিনতত্ত্ব—সব পেছনে ফেলে আবার নিজের শহরের মাটিতে পা রাখলাম। সুলতান ও হোসেন—ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের কাজে সিলেট এসেছেন—পরম আন্তরিকতায় তাঁদের রেস্তোরাঁয় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন।