ড. মোহাম্মদ আমীন | ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
অনেকে জানতে চেয়েছেন, জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে যারা ড. ইউনূসকে অপমান করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে তাঁদের কী কী শাস্তি হতে পারে?
প্রথমে বলে রাখি, মার্কিন আইন অনুযায়ী, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের কার্যক্রমে কোনো অপরাধ ছিল না, বরং তা ছিল মার্কিন সংবিধানে বর্ণিত বাক্স্বাধীনতার আইনানুগ অংশ। তাই বিদ্যমান মার্কিন আইনে ড. ইউনূসকে অপমানকারীদের কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না। তাঁদের শাস্তি দিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে।
আইনের ছাত্র হিসেবে নিচে বিষয়টির আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো:
যুক্তরাষ্ট্রের আইনের মূল ভিত্তি দেশটির সংবিধানের প্রথম সংশোধনী (First Amendment)। এই সংশোধনী নাগরিকদের দুটি অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয়। অধিকার দুটির প্রথমটি হলো: বাকস্বাধীনতা (Freedom of Speech) এবং দ্বিতীয়টি: শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার (Right to Peaceably Assemble)।
প্রথম সংশোধনীতে যে-কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা কটূক্তি করা, স্লোগান বা গালি দেওয়া এবং অসন্তোষ প্রকাশের (Free Speech) ব্যাপক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। জনসমক্ষে বা বিমানবন্দরের সাধারণ অংশে দাঁড়িয়ে কাউকে লক্ষ করে রাজনৈতিক স্লোগান বা গালি দেওয়া বা সমালোচনা বা কটূক্তি কিংবা অপমানকর উক্তি করা এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে বলা হয়েছে, "কংগ্রেস কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন সংক্রান্ত অথবা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করে; অথবা বাকস্বাধীনতা কিংবা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করে; অথবা জনগণের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার এবং ক্ষোভ বা অভিযোগ প্রতিকারের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করার অধিকারকে সংকুচিত করে— এমন কোনো আইন প্রণয়ন করবে না।" (“Congress shall make no law respecting an establishment of religion, or prohibiting the free exercise thereof; or abridging the freedom of speech, or of the press; or the right of the people peaceably to assemble, and to petition the Government for a redress of grievances.”)
ওপরের বর্ণনায় এটি স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে বাক্স্বাধীনতা খুবই সুরক্ষিত। এই স্বাধীনতা এতই প্রবল যে, কেউ যদি কাউকে (তা সে যতই বিখ্যাত হোক না) উদ্দেশ করে কটূক্তি, গালি, বিদ্রূপ বা অপমানকর কোনো বক্তব্য দেন তা বেআইনি নয়; বরং বাক্স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আইনানুগ গণ্য হয়। তাই জন এফ কেনেডি (JFK) বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কটূক্তি করা বা তার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বেআইনি বা অপরাধ হয়নি।
কটূক্তি করা সরাসরি অপরাধ না হলেও, প্রতিবাদের প্রকৃতি যদি নিম্নরূপ হতো, তবে তা বেআইনি ও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। যথা:
১. শারীরিক আক্রমণ বা ভীতি প্রদর্শন (Assault/Battery): মৌখিক কটূক্তির পাশাপাশি যদি ড. ইউনূসকে শারীরিকভাবে আঘাত করা, ধাক্কা দেওয়া, কিংবা শারীরিকভাবে ক্ষতি করার স্পষ্ট ও আসন্ন হুমকি দেওয়া হতো (Assault or Harassment) তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। তবে, বিক্ষোভকারীগণ ড. ইউনূসের সঙ্গে এমন কোনো আচরণ করেননি। তাই বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আইন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না।
২. বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি (Disorderly Conduct): যদি বিক্ষোভকারীগণের আচরণ বিমানবন্দরের সাধারণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত করত, জনসাধারণের চলাচলের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে কিংবা কোনো দাঙ্গা বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করত তাহলে তাঁদের কাজকে অপরাধ গণ্য করে শাস্তির আওতায় আনা যেত।
৩. নিরাপত্তা বলয় লঙ্ঘন (Breach of Security): যারা ড. ইউনূসকে গালি দিয়েছেন, তাঁরা যদি বিমানবন্দরের কোনো সংরক্ষিত বা সুরক্ষিত নিরাপত্তা বলয় (TSA Security Checkpoint) ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেতেন, তা হলে তা গুরুতর ফেডারেল অপরাধ হিসেবে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত।
সংক্ষেপে, ড. ইউনূসকে উদ্দেশ করে বিক্ষোভকারীগণ কর্তৃক জেএফকে বিমানবন্দরে যে স্লোগান দেওয়া বা কটূক্তি করা হয়েছে, তা কেবলই উচ্চবাচ্য বা মৌখিক প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এতে ওপরে বর্ণিত তিনটি উপদানের কোনোটি ছিল না। সুতরাং, বিক্ষোভকারীগণের কাজ ছিল মার্কিন আইন অনুযায়ী বাকস্বাধীনতার অংশ এবং সন্দেহাতীতভাবে আইনানুগ।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায় অনুযায়ী, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো নেতা বা বিখ্যাত ব্যক্তির বিরোধিতা করা, স্লোগান দেওয়া বা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে সুরক্ষিত। কোনো ব্যক্তির বক্তব্য বা রাজনৈতিক অবস্থান যদি অন্যের কাছে চরম আপত্তিকর বা ক্ষোভের কারণও হয়, তবুও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেবল ‘অপ্রীতিকর রাজনৈতিক বক্তব্য’ বা ‘বিক্ষোভ’ হওয়ার কারণে কাউকে গ্রেফতার বা অপরাধী সাব্যস্ত করতে পারে না।
অতএব, ড. ইউনূসকে উদ্দেশ করে জেএফকে বিমানবন্দরে যে স্লোগান বা কটূক্তি করা হয়েছে, তা কেবলই উচ্চবাচ্য বা মৌখিক প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সুতরাং, তা মার্কিন আইন অনুযায়ী বাকস্বাধীনতার অংশ এবং কোনো বেআইনি কিছু বা অপরাধ নয়। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত মার্কিন আইনে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।