নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ২১:৩৫

‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারে ‘সুজন’ আড়াই কোটি, ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ পায় ২০ লাখ টাকা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনকে দেওয়া হয় সেড ফাউন্ডেশনের নামে

গত ২৩ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের (বৈছাআ) একাংশ গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ১ কোটি টাকার তথ্য গোপন ও তহবিল তছরুপের অভিযোগ আনা হয়।

বৈছাআর সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুল ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনেন জুলাই-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সংগঠনটির মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশা, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাশরাফি ও সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক আতিক শাহরিয়ার।

এরপর আলোচনায় আসে বাংলাদেশ ব্যাংক কী প্রক্রিয়ায় কীভাবে এই টাকা দেয়। পরে রিফাত রশিদ এই টাকা প্রাপ্তির তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। জানিয়েছেন, তারা কোন রেজিস্টার্ড কোন সংগঠন না হলেও ‘স্টুডেন্টস এগেইন্স্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশন’ নামের অন্য একটি সংগঠনের নামে কৌশলে তাদেরকে এই টাকা দেওয়া হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মাত্র ৭ দিনের প্রচারণার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তাদেরকে এই টাকা দেয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফাউন্ডেশনটি যৌথমূলধনী ও ফার্মসমূহের অধিদপ্তরে নিবন্ধিত হয় ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি, অর্থাৎ গণভোটের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে। গণভোট ‘সফল’ করার লক্ষ্যে জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনটি কাজের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা চেয়ে আবেদন করে ওই ফাউন্ডেশন। ‘অনলাইন রেফারেন্ডাম প্রচারনা’, ‘রেফারেন্ডাম কনসার্ট’ আয়োজন এবং ‘স্ট্র্যাটেজিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এ ন্যাশনওয়াইড ইয়ুথ এনগেজমেন্ট ক্যাম্পেইন’–এই তিন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ওই অর্থ চাওয়া হয়।

কেবল বৈছাআ-ই নয় গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে আরও অনেকগুলো সংগঠন বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে টাকা পায়। এর মধ্যে রয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নানা দায়িত্ব পাওয়া বদিউল আলম মজুমদারের সংগঠনও। ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ বা ‘সুজন’কে আড়াই কোটি (২ কোটি ৫২ লাখ) টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ তহবিল থেকে ২০ লাখ (২০ লাখ ৮৪ হাজার) টাকা অনুদান পায় বিতর্ক সংগঠন ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’।

বদিউল আলম মজুমদারের প্রতিষ্ঠান সুজনকে টাকা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মৌখিক নির্দেশনা দেন। এ বিষয়ে এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনের ভাষ্য, “তৎকালীন গভর্নর মহোদয় এবিবির নেতাদেরকে তার অফিসে ডাকেন। তিনি (গভর্নর) ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বড় অংকের টাকা ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারের জন্য দিতে বলেন।’’ মাসরুর আরেফিন বলেন, ওই অর্থ দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে লিখিত নির্দেশনা চেয়েছিল এবিবি। ব্যাংক পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া যাবে না বলেও জানিয়েছিল। তখন ঠিক হয়, ব্যাংকের বদলে এবিবির তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হবে।

বৈছাআ-কে ১ কোটি টাকা দেওয়ার তথ্য সম্প্রতি প্রকাশিত হলেও সুজন ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি নামের সংগঠনগুলো অনুদান দেওয়ার তথ্য এ-বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক বণিক বার্তা-সহ একাধিক গণমাধ্যম এনিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ’ বা ‘এবিবি’ চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন ওই সময় দৈনিক বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, ‘এবিবির পক্ষ থেকে সুজন ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে ‘সুজন’কে। বাকি ২০ লাখ টাকা ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’কে দেয়া হয়েছে। এ অর্থে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার ও নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজন করা হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও পরামর্শেই আমরা এ টাকা দিয়েছি।’

পত্রিকাটিতে প্রতিবেদনে জানায়, দেশের সব ব্যাংক এমডি বা শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ১১ জানুয়ারি। ‘ব্যাংকার্স সভা’ নামে পরিচিত ওই বৈঠকে গভর্নরের পক্ষ থেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর প্রচারে সহযোগিতা করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরামর্শেই ‘সুজন’, ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ ও ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’কে অনুদান দেয়ার প্রস্তাব তোলা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘সুজন’, ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’কে অনুদান দেয়ার বিষয়ে বৈঠকে কেউ আপত্তি তোলেননি। তবে বৈষম্যবিরোধীদের কীভাবে টাকা দেয়া হবে, সে বিষয়ে অনেক এমডি আপত্তি জানান। কারণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কোনো নিবন্ধিত দল বা সংগঠন নয়। এ সংগঠনের নামে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নেই। কার নামে টাকা দেয়া হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে টাকা দেয়ার প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘নাগরিক সংগঠন হিসেবে “‍সুজন” বহুল পরিচিত। আর বিতর্ক আয়োজনের জন্য “‍ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি”র পরিচিতি রয়েছে। তাদের কার্যক্রম সমাজে দৃশ্যমান। সংস্থা দুটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ওই অর্থ দেয়ার বিষয়টি ব্যাংকার্স সভায় তোলা হয়। টাকার অংক কম হওয়া ও প্রস্তাবের যৌক্তিকতার বিচারে ব্যাংক নির্বাহীদের কেউ এ বিষয়ে আপত্তি জানাননি। তবে বৈষম্যবিরোধীদের অনুদান দেয়ার প্রসঙ্গ এলে সে প্রস্তাব পাস হয়নি।’

ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে এবিবির মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা বুঝে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ‘সুজন’-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি ওই সময় দৈনিক বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, ‘সুজন বহুদিন ধরে বাংলাদেশে নাগরিক অধিকার, জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও সংস্কারের পক্ষে আন্দোলন করে আসছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত দুটি সংস্কার কমিটিতে ছিলাম। সে হিসেবে জুলাই সনদের বাস্তবায়নে আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। জনগণকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করতেই আমরা ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে অনুদান নিয়েছি। এ অর্থের যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করা হবে।’ এবিবির কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা বুঝে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণও।

যদিও সিএসআর হলো এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার বা রীতি, যা সমাজের প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে নিয়মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত কার্যক্রমের ফলে উদ্ভূত বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব দূর করা ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে বিদ্যমান ক্ষোভ, অসমতা ও দারিদ্র্য কমানোর উদ্দেশ্যেই এর প্রবর্তন। বর্তমানে সারা বিশ্বেই সিএসআর খাতে ব্যয়কে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো প্রজ্ঞাপন জারি করে সিএসআর খাতে ব্যয় করার জন্য ব্যাংকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয়। তারপর একাধিকবার প্রজ্ঞাপন জারি করে বিধিমালা দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মোট সিএসআরের ৩০ শতাংশ শিক্ষায়, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি প্রশমন ও অভিযোজন খাতে ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে (আয়-উৎসারী কার্যক্রম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং অন্যান্য) ২০ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের নির্দেশনা দেয়। একই বছরের ২৯ নভেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট তহবিলে মোট সিএসআর ব্যয়ের ৫ শতাংশ অনুদান হিসেবে দিতে হবে।

এদিকে, জানুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনকে টাকা দেওয়া না হলেও সম্প্রতি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন ও সংগঠনটির নেতাদের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে বিষয়টি সামনে আসে। সংবাদ সম্মেলনে আনিত অভিযোগ প্রসঙ্গে ২৪ এপ্রিল রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তার নিজের বিরুদ্ধে আসা বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাখ্যা দেন রিফাত রশিদ।

ফেসবুক পোস্টে রিফাত রশিদ বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইনের জন্য আমাদের ফান্ডের প্রয়োজন ছিল। সেই ফান্ড সংগ্রহের জন্য আমরা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সবশেষে, বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের ফান্ড দিতে সম্মত হয়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে, কারণ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকারের কোনো রেজিস্টার্ড সংগঠন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নন-রেজিস্টার্ড কোনো সংগঠনকে অনুদান বা স্পন্সর করতে পারে না।

গণভোট প্রচারণার অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে রিফাত বলেন, ‘গণভোটের ক্যাম্পেইনকে সামনে রেখে আমাদের ১৫ দিনব্যাপী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ৫ কোটি টাকা প্রদানের বিষয়ে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। তবে ভোটের আগে সময়-স্বল্পতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক রেজিস্টারকৃত সেড ফাউন্ডেশনকে ৭ দিনের প্রচারণার জন্য ১ কোটি টাকা দেয়। এরপর আপনারা জানেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সারা দেশব্যাপী ৭ দিন গণভোটের ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়।’

রিফাত দাবি করেন, গণভোটের প্রচারণার সম্পূর্ণ আর্থিক হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত একটি অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা করা হয়। সেই অডিট রিপোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সিএসআর ফান্ড থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গড়া ‘স্টুডেন্টস এগেইন্স্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশন’, বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এবং হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মোট ৩ কোটি ৭২ লাখ ৮৪ হাজার অনুদান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত