২৮ মে, ২০২৬ ২৩:৫৫
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে মালদ্বীপের বিপক্ষে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ম্যাচ জিতেছে ৪-২ ব্যবধানে। এই জয়ে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ, আর টানা দুই ম্যাচ হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিল মালদ্বীপ।
ম্যাচের শুরুটা হয়েছিল রূপকথার মতো, যা ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘদিন মনে থাকবে। ভারতের রেফারি কামানি রচনা ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজানোর পর চোখের পলক ফেলতেই মালদ্বীপের জালে বল জড়ায়। ঘড়ির কাঁটায় তখন মাত্র ১১ সেকেন্ড! অবিশ্বাস্য এই কীর্তি গড়েন সুইডেন প্রবাসী ফুটবলার আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী। রকেট গতির এই শুরুর পর প্রশ্ন উঠেছে, আনিকার এই গোলটিই কি বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের দ্রুততম? নিখুঁত ও আনুষ্ঠানিক রেকর্ডের অভাব থাকলেও ফুটবল সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বাংলাদেশ তো বটেই, এমনকি সাফ পুরুষ ও নারী ফুটবল ইতিহাসের সব আসর মিলিয়েও এটিই দ্রুততম গোল।
কিক-অফ থেকে বল পেয়েই অধিনায়ক মারিয়া মান্দা নিখুঁত এক পাসে খুঁজে নিয়েছিলেন উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমাকে। ঋতুপর্ণা দ্রুত বক্সে বল ঠেলতেই সেখানে ওত পেতে থাকা আনিকা দারুণ ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান। জাতীয় দলের জার্সিতে এটিই আনিকার প্রথম গোল। এর আগে তিনি জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ৩টি ম্যাচ খেলেছেন, যা ছিল গত মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে। সেখানে তিনি মাঠে ছিলেন মাত্র ১১৩ মিনিট। প্রথম দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নামার পর তৃতীয় ম্যাচে পার্থে একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন। আজ মালদ্বীপের বিপক্ষে কোচ পিটার বাটলার নিয়মিত স্ট্রাইকার তহুরা খাতুনকে বেঞ্চে রেখে নয় নম্বর জার্সিতে আনিকাকে স্ট্রাইকার হিসেবে নামিয়ে দেন। কোচের সেই আস্থার প্রতিদান দিতে আনিকা সময় নেন মাত্র ১১ সেকেন্ড।
রেকর্ড গড়ে শুরু করলেও ম্যাচের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আক্রমণভাগ কিছুটা তালগোল পাকিয়ে ফেলে, যার ফলে দ্বিতীয় গোলটি আসছিল না। প্রথম গোল খাওয়ার পর হতচকিত হয়ে পড়া মালদ্বীপের গোলকিপার ফাতহিমাত সাওসান অবশ্য বেশ কিছু ভালো সেভ করেছেন। অবশেষে ম্যাচের ৩৪ মিনিটে ব্যবধান ২-০ করেন উমেলাহ মারমা। তবে প্রথমার্ধের শেষ দিকে অসাবধানতাবশত একটি গোল খেয়ে বসে বাংলাদেশ। গোলকিপার মিলি কিছুটা সামনে এগিয়ে থাকায় তাঁর মাথার ওপর দিয়ে বল জালে চলে যায়। প্রথমার্ধে এটিই ছিল বাংলাদেশের পোস্টে মালদ্বীপের প্রথম শট, যেখানে গোলকিপার মিলির দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
গত ২৫ মে টুর্নামেন্টের প্রথম দিনে মালদ্বীপকে ১১-০ গোলে উড়িয়ে মিশন শুরু করেছে স্বাগতিক ভারত। সেই ভারতকে টপকে গ্রুপ সেরা হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকতে বাংলাদেশের দরকার ছিল আরও বড় ব্যবধানের জয়। যদিও ম্যাচের আগের দিন কোচ পিটার বাটলার বলেছিলেন, গোলের ব্যবধান বাড়ানোর দিকে ছুটবে না বাংলাদেশ। তবে সেটি যে কেবলই মুখের কথা ছিল, তা মাঠের খেলাই প্রমাণ করেছে; বাস্তবে গোল তো বেশি বেশিই চেয়েছে বাংলাদেশ। খেলাও বলতে গেলে পুরোটা সময় মালদ্বীপের সীমানাতেই হয়েছে, কিন্তু অ্যাটাকিং থার্ডে গিয়ে ঠিকঠাক আক্রমণ গুছিয়ে উঠতে পারছিলেন না মেয়েরা। বাঁ প্রান্ত থেকে ঋতুপর্ণা অনবরত চেষ্টা করলেও বেশির ভাগ সময় তাঁর পরিকল্পনাগুলো মাঠে সফল হচ্ছিল না। মালদ্বীপ বেশ পরিকল্পনা করেই মাঠে নেমেছিল। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ হওয়া এবং প্রতিপক্ষ মালদ্বীপের ১১ জন খেলোয়াড় নিচে নেমে একদম রক্ষণাত্মক খেলার কারণেই হয়তো বাংলাদেশের খেলায় এই ছন্দহীনতা দেখা গেছে। পুরো ম্যাচে বাংলাদেশকে খুব একটা গোছানো মনে হয়নি।
জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের ১৯ হাজার ধারণক্ষমতার গ্যালারিতে খেলা দেখার সুযোগ ছিল সম্পূর্ণ টিকিট ছাড়াই। তা সত্ত্বেও গ্যালারি ছিল পুরো ফাঁকা। তবে শূন্য গ্যালারিতেও নজর কেড়েছেন বাংলাদেশ থেকে আসা একমাত্র ফুটবল সমর্থক খোরশেদ মাতবর আলমগীর। এছাড়া ভিআইপি বক্সে ছিলেন জনা ছয়েক রুশ নাগরিক। লাভ চিহ্ন আঁকা ‘বাংলাদেশ’ লেখা একটি ব্যানার নিয়ে তাঁরা মেয়েদের সমর্থন জোগাতে এসেছিলেন, যা ছিল গ্যালারির অন্যতম সুন্দর এক দৃশ্য।
দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ গোলের ব্যবধান বাড়াবে কি, উল্টো ডিফেন্ডার আফঈদার দুর্বল ডিফেন্ডিংয়ের খেসারত দিয়ে আরও একটি গোল খেয়ে বসে। বল সহজে জালে প্লেসিং করেন মালদ্বীপের আমিনাত ফাজলা। স্কোরলাইন তখন অবিশ্বাস্যভাবে ২-২! এই গোলের পর মালদ্বীপের খেলোয়াড়দের উল্লাস ছিল দেখার মতো। যে দলকে বরাবর হেসেখেলে হারিয়ে এসেছে বাংলাদেশ, সেই দলের বিপক্ষে ড্রয়ের শঙ্কায় পড়ে যায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। এর আগে দ্বিতীয়ার্ধে শামসুন্নাহার জুনিয়রকে তুলে নিয়ে সাগরিকাকে নামানো হয়েছিল। জুনিয়রের একটি শট অবশ্য ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে, তবে পুরো ম্যাচে তাঁকে চেনা ছন্দে দেখা যায়নি। ২-২ গোল হওয়ার পর কোচ বাটলার দ্রুত ব্যবস্থা নেন। আনিকাকে তুলে মাঠে নামান তহুরা খাতুনকে।
কোচের এই কৌশলী পরিবর্তনে গোল পেতে বেশি দেরি হয়নি। ম্যাচের ৬৪ মিনিটে ঋতুপর্ণার নিখুঁত এক ক্রস থেকে দুর্দান্ত গোল করে দলের স্বস্তির জয় এনে দেন বদলি হিসেবে নামা সুরভী আকন্দ প্রীতি। ম্যাচের শেষ বাঁশির ঠিক আগে বাংলাদেশ পায় আরও একটি গোল, যার ফলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-২।
আপনার মন্তব্য