১৮ মার্চ, ২০২৬ ১৩:০৭
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিকে সামনে রেখে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন জেলা মৌলভীবাজার। বিশেষ করে চায়ের দেশখ্যাত শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে পর্যটকদের আগমন।
ঈদ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন পাঁচ তারকা মানের হোটেল-রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউসগুলোতে ঘোষণা করা হয়েছে নানা আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদের ছুটিতে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে দেশজুড়ে ভ্রমণপ্রেমীদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ। ইতিমধ্যে শহরের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে আগাম বুকিংয়ের চাপ লক্ষ করা যাচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল শহরের বাইরে রাধানগর গ্রাম এলাকায় অবস্থিত প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজে ঈদের ছুটির ২২ থেকে ২৪ তারিখ- এই তিন দিনের জন্য প্রায় ৯০ শতাংশ বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা এই সময়টিকে ঈদ ভ্রমণের ‘পিক টাইম’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
তাদের আশা, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বুকিং বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সব কক্ষই পূর্ণ হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, শহরের ভেতরের হোটেলগুলোতেও পর্যটকরা বুকিং করে রাখছেন। বেশিরভাগ হোটেলে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বুকিং হয়েছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘এখন অনেক পর্যটক শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে চান।
এ কারণে শহরের হোটেলের পরিবর্তে শহরের বাইরে অবস্থিত রিসোর্ট ও কটেজে থাকার প্রবণতা বাড়ছে।’
ঈদকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যটন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন। শ্রীমঙ্গলে বর্তমানে পাঁচতারকা মানের রিসোর্টসহ শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ, হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন সহস্রাধিক পর্যটক রাতযাপন করতে পারেন।
ঈদ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফেও নতুন সাজে সজ্জিত। পর্যটকদের জন্য খাবার তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে বাংলা, চাইনিজ ও থাই খাবারের পাশাপাশি স্থানীয় আদিবাসী খাবারও।
জেলার কমলগঞ্জ টিলাগাঁও ইকো ভিলেজ-এর ব্যবস্থাপক মো. সোহেল আহমেদ বলেন, ‘টুরিস্টের কথা সবসময় চিন্তা করে আমরা ইকো ভিলেজটা সাজাই। পবিত্র ঈদুল ফিতর আমাদের এখানে রয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ, যা ইট ও ছন দিয়ে দৃষ্টিনন্দন করার জন্য আমরা ব্যতিক্রম করে ঘরে তুলেছি। এটা বাংলাদেশের অন্যান্য ইকো ভিলেজের চেয়ে পুরোটাই ব্যতিক্রম।’
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ২২ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ৯৫ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি এবার পর্যটক সংখ্যা আরো বাড়বে।’
শ্রীমঙ্গল চামুং রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ইকো ক্যাফের স্বত্বাধিকারী তাপস দাশ বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে যারা শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে আসবেন, তাদের জন্য আমরা স্থানীয় ও আদিবাসী খাবারের বিশেষ আয়োজন রেখেছি। এতে পর্যটকেরা এ অঞ্চলের স্বাদ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন।’
বালিশিরা রিসোর্টের পরিচালক জাহানারা আক্তার বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে আমাদের রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ২১ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি এবার পর্যটক সংখ্যা আরো বাড়বে।’
গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, ‘ঈদের সময় সাধারণত বিদেশি পর্যটক কম থাকে। তবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক পর্যটক আসেন। এবারও আমাদের বুকিং প্রায় শতভাগ পূর্ণ হয়ে গেছে।’
হাওর, পাহাড় ও টিলাবেষ্টিত মৌলভীবাজার প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি। জেলার সবচেয়ে বেশি পর্যটক সমাগম ঘটে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায়। সবুজে মোড়া উঁচুনিচু চা বাগান, মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমৃদ্ধ জীব বৈচিত্র্যের কারণে এই অঞ্চল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
জেলার শ্রীমঙ্গলে ঘুরে দেখার মতো অসংখ্য পর্যটন স্পট রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চা বাগান, হাইল হাওর, বাইক্কার বিল, চা কন্যার ভাস্কর্য, সাত রঙের চা, বধ্যভূমি ’৭১, বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র, রাবার বাগান, গোলটিলা, হাজমটিলা, সীতেশ বাবুর বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র, খাসিয়া পুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, গারোপল্লী, ভাড়াউড়া লেক ও শংকর টিলা।
এছাড়া কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হামহাম জলপ্রপাত, শমশেরনগর বিমানবন্ধর, সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, ললিতকলা একাডেমি, ক্যামেলিয়া লেক,গল্ফ মাঠ, মনিপুরীপাড়া, খাসিয়াপুঞ্জি এবং মাধবপুর লেকও ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় থাকে।
ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনও নিয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে বিভিন্ন পর্যটন স্পটে আমাদের টহল ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জেলা পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথভাবে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।’
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সে বিষয়েই সর্বোচ্চ নজর রাখা হচ্ছে বলে ওসি জানান।
আপনার মন্তব্য