নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:৪৪

সিলেটে প্রকাশ্যেই বিক্রি হয় ‘ভয়ঙ্কর’ পটকা মাছ, নেই সতর্কতা

সিলেটের বাজারগুলোতেই প্রকাশ্যেই কেনাবেছা হয় পটকা মাছ। গ্রামাঞ্চলে এই মাছ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। দামে কম ও সুস্বাদু হওয়ায় এই মাছ কিনে নিয়ে যান অনেকে। সচেতনার অভাবে তা খাওয়া হয় হরহামেশাই। পটকা মাছ সিলেটে ফুটকনা নামে পরিচিত।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন পটকা মাছে রয়েছে প্রাণঘাতী বিষ। একটি পূর্ণাঙ্গ পটকার বিষে ত্রিশজন মানুষেরও মৃত্যু হতে পারে। এই মাছ বিক্রি নিষিদ্ধেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে সিলেটে প্রকাশ্যে পটকা মাছ বিক্রি হলেও নেই কোনো বিধিনিষেধ। পটকার ক্ষতিকারক দাক সম্পর্কেও নেই কোনো প্রচারণা বা সচেতনা সৃষ্টির উদ্যোগ। ফলে অজ্ঞাননতা থেকে এই মাছ খেয়ে বিপদে পড়ছেন অনেকে।

পটকা মাছ থেখে গত মঙ্গল ও বুধবার সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ৬ জন মারা গেছেন। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন আরো প্রায় ২০ জন।

পটকা মাছ খেয়ে  অসুস্থ অবস্থায় সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা জৈন্তাপুর উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নের উত্তমাইল গ্রামের জয়নাল আবেদীন (৪০) বলেন, ‘আমরা তো ছোটবেলা থেকেই পটকা মাছ খাই। কখনো হাওর বা বিল থেকে ধরে আনি কখনো বা বাজার থেকে কিনে আনি। কিন্তু আগে কোনোদিন পটকা মাছ খেয়ে কেউ অসুস্থ হয়নি। মারা যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। এই প্রথম পটকা খেয়ে মানুষ মারা যাওয়ার কথা জানলাম।’

কেবল জয়নাল আবেদীনের পরিবার বা জৈন্তাপুরের বসিন্দাই নয়, সিলেটের প্রায় সকল এলাকার গ্রামগঞ্জে পটকা মাছ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। বাজারে হরহামেশাই বিক্রি হয় এ মাছ।

তবে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদের মতে, বাংলাদেশের মানুষ অজ্ঞানতাবশত পটকা মাছ খেয়ে থাকেন, এই মাছ খাওয়ার ফলে মানবদেহে বিষ প্রবেশ করে। এই বিষ খুব সহজে মানবদেহের নার্ভাস সিস্টেম ও হৃৎপিন্ড নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। যার ফলে মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

তিনি বলেন, পটকা মাছের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ হলো এর লিভার। মাছটির লিভারে যে বিষ রয়েছে তা প্রাণঘাতী পটাসিয়াম সায়ানাইডের তুলনায় এক হাজার গুণ বিষাক্ত। আর এ কারণে মাছটির লিভারের সামান্য অংশও যদি মাছটিতে থেকে যায় তাহলে তা বিষাক্ত হয়ে পড়ে এবং মানুষ মারা যায়।’

আর সিলেট ওসমানী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এনায়েত হোসেন বলেন, ‘পটকা মাছে টেট্রাটডক্সিন নামে এক ধরনের বিষ থাকে যা কোন ওষুধে উপশম হয় না। এ ধরনের বিষক্রিয়ায় আক্রান্তরা শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে দ্রুত মারা যায়।’

এমন প্রাণঘাতি যে মাছ তা সিলেটের গ্রামগঞ্জে বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। বিক্রিতে নেই কোনো বিধিনিষেধ। এই মাছের বিষের ব্যাপারেও নেই কোনো প্রচারণা। ফলে অজ্ঞনতা থেকে পটকা মাছ খেয়ে থাকেন গ্রামের লোকজন।

এই মাছ খেয়ে মঙ্গলবার জৈন্তাপুরের ৫ জন মারা যান। বুধবার মারা যান আরেকজন। তাঁর নাম ছফাতুন্নেছা (৬৫)। তিনি একই উপজেলার চারিকাটা ইউনিয়নের থুবাং গ্রামের আব্দুল মতলিবের স্ত্রী। মঙ্গলবার ভোরের দিকে নগরীরর একটি বেসরকারী হাসপাতাল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান তিনি।

বুধবার সকালে জৈন্তাপুরের চিকনাগুল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ঝুড়িতে করে এক কিশোর পটকা মাছ বিক্রি করছে। ঝুড়িসহ মাছের মূল্য ৩শ’ টাকা হাঁকছে সে। ছয়জনের মৃত্যুর পরও পটকা মাছ বিক্রির বিষয়ে সাহেদ নামের ওই কিশোর জানায়, এই মাছ খেয়ে মৃত্যুর বিষয়টি তার জানা নেই। মাছ বিক্রিতে কেউ বাঁধাও দেয় নি।

মারা যাওয়া ও অসুস্থ হওয়াদের প্রায় সকলেই জৈন্তাপুরের দরবস্ত ইউনিয়নের বাসিন্দা। কথা হয় এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাহারুল আলমের সাথে। তিনি বলেন, এই উপজেলার হাওর ও বিলগুলোতে অনেক পটকা মাছ পাওয়া যায়। কখনো তা ছোটমাছের সাথে মিশিয়ে আবার কখনো আলাদাভাবে এগুলো বিক্রি করে মৎস্যজীবীরা। অপেক্ষাকৃত স্বল্পমূল্যে পাওয়া যাওয়ায় গরীব মানুষেরা পটকা মাছ কিনে নেন।

পটকা মাছের বিষে মানুষ মরে যেতে পারে এমন কথা আগে কখনো শোনেননি জানিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, অনেক সময় ছোট মাছ কিনে আনলে ২/৪টা পটকা মাছ পাওয়া যায়। এগুলো ফেলে না দিয়ে অন্য মাছের সাথে রান্না করা হয়। বাড়ির নারীরাই বেশিরভাগক্ষেত্রে পটকা মাছ খেয়ে থাকেন বলে জানান তিনি।

অসুস্থ ও মৃত্যুর পর বুধবার জৈন্তাপুর উপজেলায় যান বিভাগীয় কমিশনার জামাল উদ্দিন আহমদ, পরিচালক (স্বাস্থ্য) গৌরমনি সিনহা, জেলা সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমানসহ প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা। এসময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সামনেই স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা প্রায়ই পটকা মাছ খেয়ে থাকেন। বাজারে প্রকাশ্যেও বিক্রি হয় পটকা মাছ। এই মাছ বিক্রিতে বা খেতে কেউ কখনো মানা করেনি। এর ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, স্থান, কাল, সময়ভেদে এই মাছ বিষাক্ত নাও হতে পারে। প্রজাতি ভেদেও এই মাছ বিষমুক্ত হতে পারে। তবে এই মাছ বাংলাদেশে খাদ্যতালিকা থেকে সম্পূর্ণরূপে বাদ  দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে এই মাছের বিষাক্ততার ব্যাপারে সচেতন করে তোলার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের আহবান জানান তিনি।

মঙ্গলবার সিলেটের সিভির সার্জন জানিয়েছিলেন পটকা কোনো মাছ নয়, একটি জলজ প্রাণী। তবে এর সাথে ভিন্নমত পোষণ করে জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, টেট্রাওডোনটাইড পরিবারের এ মাছের ইংরেজি নাম পাফার ফিশ। বাংলাদেশে সাধারণত সাদ পানির ও লোনাপানির- এই দুই ধরনের পটকা মাছ পাওয়া যায়।

এই অফিস সূত্র জানা যায়, পটকা মাছ খাওয়া ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই সতর্কতা জারি আছে। মৎস্য অধিদপ্তর এ মাছের বিষাক্ততা সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনও প্রচার করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তদর, সিলেটের পরিচালক গৌরমনি সিনহা বলেন, অজ্ঞনতার অভাবে গ্রামের অনেকেই পটকা মাছ খেয়ে থাকে। পটকার ভয়ঙ্কর দিক তোলে ধরে জোর প্রচারণা চালানো দরকার। এছাড়া এই মাছের বিক্রিও বন্ধ করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সিলেট বিভাগের প্রতিটি জেলায় পটকা মাছ বিক্রিতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত