নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০০:৩৪

‘কারেন্টে যে ছাতানি দের!’

সিলেটজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র লোডশেডিং। দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। সন্ধ্যার মধ্যে দোকানপাট বন্ধসহ সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও কমানো যাচ্ছে না লোডশেডিং।

গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বেড়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।

সিলেটে বৃহস্পতিবার থেকে হঠাৎ করে তীব্র লোডশেডিংয় শুরু হয়েছে। প্রতি ১ ঘন্টা পরপর লোডশেডিংয় করার ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়ায় সিলেটে বৃহস্পতিবার ৪০ শতাংশ লোডশেডিং করা হয়েছে।

তবে শুক্রবার স্কুল কলেজ, অফিস-আদালতসহ সব বন্ধ থাকায় লোডশেডিং কম হয়েছে বলে দাবি বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। যদিও গ্রাহকদের অভিযোগ, শুক্রবার গরম বাড়ায় লোডশেডিং আরও বেড়েছে।

এদিকে সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্তৃপক্ষ বলছেন, সারা দেশজুড়েই এই সমস্যা হচ্ছে। সিস্টেম টিকিয়ে রাখতে এই লোডশেডিং করা হচ্ছে।

অপরদিকে এই তীব্র গরমে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের বাসা-বাড়ি থেকে শুরু করে অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রভাব পড়েছে। গরম আর লোডশেডিংয়ে সিলেটের মানুষজনকে দুর্ভোগে পোহাতে হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রেস্তোরা , কফিশপ, ফাস্টফুডসহ বিভিন্ন খাবার দোকানের ব্যবসায়ীরা।

জিন্দাবাজারের ব্যবসায়ী জুনেদ আহমদ জানান, কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের এই লুকোচুরিতে তার ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব আব্দুর রহমান রিপন জানান, সরকারের নির্দেশনা মেনে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট বন্ধ রাখা হলেও দিনের বেলায় লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

শিবগঞ্জ এলাকার গৃহিনী সামিয়া বেগম বলেন, ‘কারেন্টে ডেয ছাতানিরেদর। একটু পরে পরে যায়গি। কয়দিন পরে পুয়ার মেট্টিক পরীক্ষা। লোডশেডিং আর গরমের লাগি পড়্ই পারের না।’

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তথ্যমতে, সিলেটে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৪৭৭ মেগাওয়াট। তারমধ্যে পিডিবির গ্রাহকদের চাহিদা রয়েছে ১৭০ মেগাওয়াট ও পল্লী বিদ্যুতের ৩০৭ মেগাওয়াট। সে তুলনায় জাতীয় গ্রীড থেকে পিডিবিকে সরবরাহ প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট ও পল্লী বিদ্যুতকে সরবরাহ করা হচ্ছে ১৬৭ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিডিবিতে ঘাটতি রয়েছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং পল্লী বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে ৪৯ শতাংশ। দুই প্রতিষ্ঠানের গড়ে ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সিলেটে তিনটি কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। যার কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

সিলেটের কুমারপাড়া, নয়াসড়ক, জিন্দাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার খাবার ব্যবসায়ীদের জানান, একদিকে ৭টার ভিতরে সব কিছু বন্ধ হওয়ার কারণে খাবারের দোকানে ক্রেতা অনেক কম। তারমধ্যে স্বল্প সংখ্যক ক্রেতারা রেস্তোরায় আসলেও তাদের অর্ডার ঠিকমত দেওয়া যায় না বিদ্যুৎ না থাকার ফলে। কারণ ভালমানের রেস্তোরাগুলোতে খাবার তৈরি হয় বিদ্যুৎ চালিত মেশিনারিজ দিয়ে। দেখা যায় গ্রাহক অর্ডার করেছেন আর বিদ্যুৎ চলে যায়। ১ থেকে দেড় ঘণ্টার লোডশেডিং হয় তাই গ্রাহকরা অর্ডার করেও চলে যায়।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৭টায় সিলেটে পিডিবির চার জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২২৫ মেগাওয়াট। সাপ্লাই ছিল ১৮৫ মেঘাওয়াট। এবং লোডশেডিং ছিল ৪০ শতাংশ। প্রতি ঘন্টায় আমরা এই ডাটা পাই। এছাড়া লোডশেডিং কত ঘণ্টা হবে এটা আগে ঠিক করা যায় না। কারণ যদি পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ থাকে বা কিছু সমস্যা হয় তখন লোডশেডিং দেওয়া লাগে। আবার চাহিদার চেয়ে সাপ্লাই কম থাকলেতো লোডশেডিং করতেই হয়। কারণ আমাদেরকে সিস্টেম টিকিয়ে রাখতে হয় তা না হলে কান্ট্রিওয়াইজ ব্ল্যাক আউট হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, এখন কি পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে আর কি পরিমাণ ঘাটতি আছে সেটা আমার জানার সুযোগ নেই। আমি প্রতি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীদের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে যেহেতু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে এলএনজি ব্যবহার করা হয় এবং সেটাও বাইরে থেকে কিনতে হয়। জ্বালানি তেল আসতেও পারছে না। এসব ক্রাইসিসের কারণে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেজন্য আমাদের লোডশেডিং কিছু করতে হচ্ছে। এবং এই লোড ম্যানেজমেন্ট আমাকে করতে হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত