নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:১৮

বাগানের জমিতে বিদ্যালয়, তবু ‘উপেক্ষিত’ চা শ্রমিকদের সন্তানরা

২০১৩ সালে সিলেট নগরীর উপকণ্ঠের লাক্কাতুরা চা বাগানের জমিতে উচ্চ বিদ্যলয় নির্মানের উদ্যোগ নেয় সরকার। চলতি বছরে এই বিদ্যালয়ের নির্মান কাজ শেষ হয়। আগামী বছর থেকে শুরু হবে ‘সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’ নামের নতুন এই বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম।

প্রায় ১১৩ বছর পর সিলেটে নতুন আরেকটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনে চা বাগানের জমি বেছে নেওয়া প্রসঙ্গে সে সময় সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শহিদুল ইসলম চৌধুরী বলেছিলেন, চা শ্রমিকরারা হচ্ছে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠি। তাদের সন্তানেরাও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। চা শ্রমিক সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতেই বাগান এলাকায় সরকারী বিদ্যালয় নির্মান করা হচ্ছে।

তবে বিদ্যালয় নির্মান কাজ শেষ হওয়ার পর নিজেদের বক্তব্য থেকে সরে এসেছে প্রশাসন। চলতি মাসে এই বিদ্যালয়ে ভর্তিবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে নেই চা শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কোনোসুবিধা। ফলে চা শ্রমিকদের সন্তানেরা ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে বলে মনে করছেন শ্রমিকরা। এই বিদ্যালয়ের ভর্তিতে চা শ্রমিক সন্তানদের জন্য বিশেষ কোটার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন তাঁরা।

আন্দোলনকারী শ্রমিকরা জানান, বিদ্যালয়ের জন্য বাগানের জমি অধিগ্রহণকালে জানানো হয়েছিলো, সরকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির জন্য এই বিদ্যালয় নির্মাণ করছে। লাক্কাতুরাসহ আশপাশের ৯ টি চা বাগানের শ্রমিকদের সন্তানদেরকে এই বিদ্যালয়ে ভর্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে নেই চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য কোনো কোটা।

এই বিদ্যালয়ের ভর্তিতে চা শ্রমিক সন্তানদের জন্য বিশেষ কোটার দাবিতে সম্প্রতি জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি পেশ করে ‘চা বাগান শিক্ষা অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ’। একই দাবিতে শনিবার আম্বারখানা-বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে চা শ্রমিকরা।

‘চা বাগান শিক্ষা অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক অধির বাউড়ি বলেন, চা শ্রমিকদের সন্তানেরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাগানের জমিতে একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত হলে এই এলাকার নয়টি বাগানের শ্রমিকরা আশ্বস্থ হয়েছিলো। নির্মানের সময় চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য বিশেষ কোটা রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে তেমন কিছু রাখা হয়নি। বিজ্ঞপ্তিতে চা শ্রমিক সন্তানদের উপেক্ষা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সঙ্গতকারণেই নগরীর সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুদের সাথে চা শ্রমিকদের সন্তানেরা প্রতিযোগীতায় টিকতে পারবে না। তাদের প্রতিযোগীতার উপযোগী গড়ে তোলার আগেই একটি অসম প্রতিযোগীতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এই বিদ্যালয়ে চা শ্রমিকের সন্তানেরা ভর্তি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। এ জন্য তিনি চা শ্রমিক সন্তানদের জন্য বিশেস কোটার দাবি জানান।

চা শ্রমিকদের এই দাবিকে মানবিক বলছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীনও। তিনি বলেন, দেশের সকল সরকারী বিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ীই এই বিদ্যালয়ের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এটি পরিবর্তন করার এখতিয়ার আমাদের নেই। শিক্ষা মন্ত্রনালয় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমরা শীঘ্রই বৈঠকে বসে মন্ত্রনালয়ের সাথে আলাপ করবো।

সিলেট শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে শুরু হয়ে চলতি বছরে ‘সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় লাক্কাতুরা’-এর নির্মান কাজ শেষ হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। গত ২৩ নভেম্বর সিলেট সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তীত সফরসূচীর কারণে তা উদ্বোধন করেননি। কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই চলছে বিদ্যালয়টিতে ভর্তি কার্যক্রম। নতুন এই বিদ্যালয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে এক হাজার শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাবে। এই বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব, ল্যাবরেটরীসহ অত্যাধুনিক সকল সুযোগ সুবিধা থাকবে।

সিলেট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মহানগরে মাত্র দুটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। ১৮৩৬ সালে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯০৩ সালে সিলেট সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে সিলেটে আর কোন সরকারি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রায় ১১৩ বছর পর সিলেটে নতুন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করা হলো।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সিলেট জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল হাকিম বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় সিলেট নগরীর প্রবেশ দ্বার লাক্কাতুরায় মনোরম পরিবেশে সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় লাক্কাতুরা নির্মাণ  করা হয়েছে। বিদ্যালয়টির ভূমির পরিমাণ প্রায় ২ একর। ৬ তলা ফাউন্ডেশনের এ ভবনের চার তলার নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। ভবনটিতে সবমিলিয়ে ২৪টি ক্লাস রুম রয়েছে। প্রতিটি ক্লাস রুমে এক সাথে ৫০ জন শিক্ষার্থী বসতে পারবে। এর মধ্যে ১০টি স্মার্ট ক্লাস রুম রয়েছে। এসব ক্লাস রুমে কম্পিউটার এবং প্রজেক্টরেরও ব্যবস্থা রয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত