১৯ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১৫:২৪
বিয়ানীবাজারে শীত জেকে আসার আগেই দেশীয় জাতের কমলা বাজারে উঠতে শুরু করেছে। দেশি প্রজাতির এ কমলা প্রায় দু’মাস আগে থেকেই বাজারে দেখা যাচ্ছে। কাঁচা-পাকা এসব কমলা বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। মৌসুমের প্রথম ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বলে অনেকের কাছে এর কদর রয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি হালি কমলা ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিয়ানীবাজারের কমলার খ্যাতি বহুকাল আগে থেকেই। মৌসুমের প্রথমদিকে কমলা স্থানীয় চাহিদা মেটায়। পরে ভারতের আসাম ও মেঘালয় থেকে কমলা আমদানি হয়ে আসে। সেখানকার কমলায় চলে পুরো মৌসুম। অথচ উপজেলার বিভিন্ন টিলা ভূমিতে ব্যাপকভাবে কমলা চাষ করলে প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। আসাম ও মেঘালয়ের মাটির যে গুণাগুণ, তা এখানকার টিলা ভূমিতে রয়েছে বলে জানান স্থানীয় কমলা চাষীরা।
কমলা চাষীরা জানান, এবার বিয়ানীবাজারের কমলা বাগানগুলোতে প্রচুর ফলন হয়েছে। যদিও কমলার আকৃতি ছোট। গত বছর আবহাওয়াজনিত কারণে উপজেলায় কমলা ভালো পাওয়া যায়নি। তবে এবার ভালো ফলন পেয়েছেন তারা।
তারা জানান, এখানকার কমলা স্বাদে-গন্ধে খুবই চমৎকার। আদিকাল থেকে পাহাড়ি অঞ্চল বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, জৈন্তা, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়ারাবাজার, মৌলভীবাজারের জুড়ি, কুলাউড়া, শ্রীমঙ্গলে কমলা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিপণন হত। একসময় অনেকেই বাড়ীর আঙ্গিনায় সখ করে কমলা গাছ রোপণ করতেন।
বিয়ানীবাজারের কমলা এখনও প্রতি মৌসুমে বাজারে আসে। কমলাচাষীরা বলেছেন, বাগানগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। বিয়ানীবাজারে জলঢুপ, মৌলভীবাজারের জুড়ির কমলার খ্যাতি রয়েছে। সরকারি সূত্রমতে, জুড়িতে ৮৩ হাজার হেক্টর জমিতে দেশি জাতের কমলা আবাদ হয়ে থাকে। এসব বাগানে একশ’ থেকে এক হাজার গাছ রয়েছে। তবে বিয়ানীবাজারে ৪ হাজার গাছের মালিকও রয়েছেন। চাষীরা বলছেন, সেচ সুবিধাসহ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কমলা উৎ্পাদন বাড়বে।
সিলেট অঞ্চলে কমলা উৎপাদনের ব্যাপক সুযোগ ও আগ্রহ লক্ষ্য করে সরকার বৃহত্তর সিলেটে কমলা, আনারসসহ সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প এর আওতায় ২০০১-২০০২ অর্থ বছরে ৩ বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প চালু করে। প্রকল্পের আওতায় সিলেট বিভাগের চারটি জেলার তিনটি করে উপজেলায় ব্লক প্রদর্শনী করা হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিনামূল্যে চারা বিতরণ করা হয়। একই সময় ১৩ হাজার বসত বাড়িতে ১০টি করে বিনামূল্যে চারা দেয়া হয়। তখন চাষীদের মধ্যে কমলা নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দেয়। কিন্তু প্রকল্পটির ফলাফল না দেখেই তা গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। এর কঠোর সমালোচনা করেছেন চাষীরা।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাজী আব্দুল ওয়াহিদের সঙ্গে কথা হয় বিয়ানীবাজারের জলুঢপ মৌজায় তার বাড়িতে। পাকাবাড়ির ছাদের উপর ঝুলে আছে থরে থরে হলুদ কমলা। সামনে-পেছনের গাছেও ঝুলছে আধা পাকা কমলা। তিনি জানান, এবার কমলার সাইজ ছোট বিধায় ভালো দাম পাওয়া যাবে না। গত বছর ৬০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গবেষকরা বলতে পারবেন এবার কমলার সাইজ ছোট কেন।
জলঢুপ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাড়িয়াবহর গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে রয়েছে বিশাল সব কমলা বাগান। বিয়ানীবাজর উপজেলার এ গ্রামের আকাশটা যেন ঢেকে আছে বনজ ও ফলদ গাছ-গাছালিসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজিতে। এখানেই এক টিলার উপর ডা. নিশিকান্ত ভট্টাচার্যের বাড়ি। বাড়িতো নয়, যেন বিশাল বাগান । চারদিকে নাম জানা-অজানা কত রকমের গাছ-গাছালি। এখানে প্রায় চার হাজার কমলা লেবুর গাছ রয়েছে। ডা. নিশিকান্ত ভট্টাচার্য মারা যাওয়ায় বর্তমানে তার ৬ ছেলে বিশাল ১৫ একরের বাড়িটির মালিক। তাদেরই একজন নিখিলেশ ভট্টাচার্য।
সিলেটে কমলা উৎপাদন সম্পর্কে নিখিলেশ বলেন, এই কমলা আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। যেখানেই থাকি না কেন, বাড়ির কমলার কথা ভুলতে পারি না। এই বাড়িতে আমাদের সাত পুরুষের বাস। আমরা ছোটবেলা দেখেছি কমলা ক্রয়ের জন্য খাঁচা হাতে লোকের ভিড়। এখন অবশ্য সে রকম নেই। তবে এবার কমলার ফলন ভালো হলেও আকারে ছোট।
কমলা চাষের জন্য তার বড় ভাই বিষ্ণুপদ ভটাচার্য বঙ্গবন্ধু জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছেন বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে বিয়ানীবাজার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পরেশ চন্দ্র দাস জানান, বিয়ানীবাজারে এবার ১শ হেক্টর জমিতে কমলা চাষ হয়েছে। উন্নত প্রজাতির চারা লাগাতে গবেষণা চলছে।
আপনার মন্তব্য