সিলেটটুডে ডেস্ক

২৩ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০১:৪৯

জফির সেতুর জন্মদিনে আনন্দ-আড্ডা

‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা/এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা/ যেথা আমি যাই নাকো/     তুমি প্রকাশিত থাকো/ আকুল নয়নজলে ঢালো গো কিরণধারা’ কেনো সাহিত্যিকের জন্মদিন পালন হবে আর সেখানে রবী ঠাকুরের কোনো কবিতা কিংবা গান থাকবে না, তাকি হয়? ব্যতয় ঘটেনি। কবি, শিক্ষক ডক্টর জফির সেতুর জন্মদিনে কবিতা এবং গান দুটোই ছিলো। রবী ঠাকুরের উল্লিখিত গানটি খালি গলায় অত্যন্ত আবেগমথিত সুরে গেয়ে সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করেন তারই ছাত্রী হালিমা-তুস সাদিয়া।

গানটি গাইবার পূর্বে তিনি উল্লেখ করলেন, ‘রবী ঠাকুর কাকে উদ্দেশ্য করে এই গান লিখেছিলেন আমি জানি না, তবে আমি আমার শিক্ষক সেতু স্যারকেই আমার জীবনের ধ্রুবতারা মনে করি। তিনিই পাল্টে দিয়েছেন আমার চলার পথ।’ শুধু সাদিয়া নয়, উপস্থিত প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী, তাদের ক্লাস রুমের এই শিক্ষক সম্পর্কে প্রায় একই ধরনের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করলেন। এদের অনেকেই এখন স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অধিকাংশই শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। নিজের শিক্ষক সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন অনুষ্ঠানকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।  

২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর একটি রেস্তুরায় কবি, গবেষক, শিক্ষক ডক্টর জফির সেতুর ৪৫ তম জন্মদিন উপলক্ষে ব্যতিক্রমী আনন্দ-আড্ডার আয়োজন করা হয়। জফির সেতুর ক্লাস রুমের শিক্ষার্থীদের এই আয়োজনের নেতৃত্বে ছিলেন মঈন উদ্দিন আদর্শ মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আজির হাসিব, সিলেট কমার্স কলেজের শিক্ষক নেসার শহিদ, সিলেট ক্যান্টনমেন্ট কলেজের বাংলার শিক্ষক আব্দুর নূর বাবুল ও জৈন্তা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক আলাউর রহমান।

জন্মদিনের অনুষ্ঠান হলেও তাতে ছিলনা প্রচলিত ‘ক্যাক কাটা’। অনুষ্ঠানও ছিলো ব্যতিক্রমে ভরপুর।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ্, সিলেট শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর সামছুল আলম, মুক্তিযুদ্ধের তরুণ গবেষক এবং যুগভেরী পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক অপূর্ব শর্মা, কবি ও লেখক মালেকুল হক, শাবিপ্রবি বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কবি ও গল্পকার মাসুদ পারভেজ, মেট্রোপলিটন বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক কবি জয়নুল ইসলাম, কবি ও শিক্ষক হেনা নূরজাহান।

আলোচনার এক ফাকে কবি জফির সেতুর ‘ ইয়েস ইউ ব্লাডি-বাস্টার্ড’ কাব্যগ্রন্থ থেকে আবৃত্তি করেন কবি হেনা নূর-জাহান। অনুষ্ঠানে ‘জফির সেতু-র ৪৫তম জন্মবার্ষিক উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি’ হিসেবে প্রকাশিত ‘জ্ঞান যেথা মুক্ত’ সম্মাননা গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেনÑ আমন্ত্রিত অতিথিরা। মোড়ক উন্মোচন শেষে ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেনÑ‘অন্তর্ভেদী রেখার উন্মোচন হলো। যা জফির সেতুর প্রাপ্য ছিল। কারণ যে আলোক তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এরই ধারাবাহিকতার উত্তরাধিকার এই প্রকাশনা।’

ডক্টর আবুল ফতেও ফাত্তাহ্ জফির সেতুর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে বলেন- ‘এই আড্ডা জ্ঞানের শক্তিকে বৃদ্ধি করবে। এই প্রাপ্তি জফির সেতুর। মদনমোহন কলেজের শিক্ষক থাকাকালে জফির ক্লাশে গেলে আমি নিশ্চিন্ত থাকতাম। এই আলোকধারার নাম জফির সেতু। যারা এই সৃজনশীল আড্ডার আয়োজক তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

সিলেট শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর সামছুল আলম বলেন-‘ জফির সেতু লাইট হাউস। এখান থেকেই আলো বিচ্ছুরণ হয়েছে এবং হচ্ছে। সেটা একজন শিক্ষকের বড় প্রাপ্তি।’

গবেষক অপূর্ব শর্মা বলেন-‘এই সমাজে গুণিদের কদর খুব কম হয়। তারা এই আয়োজন করে একটি মাইলফলক সৃষ্টি করেছেন। এখান থেকেই শুরু হউক গুণিজনদের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা জানানোর অধ্যায়।’

জফির সেতুর জীবনযুদ্ধের সঙ্গিনী সিলেট ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজের প্রভাষক সাহেদা শিমুল উপস্থিত শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে বলেন ‘ জফির সেতুর নিকট আসা প্রতিটি শিক্ষার্থীর আসার মুহূর্তটি এখনো আমাকে ভাবায়।’

সবশেষে বক্তব্য রাখেন অনুষ্ঠানের মধ্যমনি ড. জফির সেতু। আবেগাপ্লুত এই মানুষ গড়ার কারিগর বলেন- ‘চারদিকে ভালো মানুষের বড় অভাব। ভালো মানুষ তৈরি করার দায়িত্ব শিক্ষক-সমাজ নিলে এ অভাব শব্দটি মুছে যাবে।’ তিনি তার শিক্ষার্থীদের বন্ধু, সখা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষক হয়েছি তাই আমরা খুব ভাগ্যবান। সেটা কাজে লাগাতে হবে।’

অনুষ্ঠানে শিক্ষক জফির সেতুর শিক্ষাভাবনা, সাহিত্যচিন্তা-সমাজচেতনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তাসনিম তনয়া, সিরাজুম মনিরা, মণি তালুদার, লাকি বেগম, নেসার শহিদ, আলমগীর হোসেন, প্রশান্তকুমার দাশ পলাশ, অপূর্ব পাল, ম. শিব্বির, আলাউর রহমান, তাহের খোকন, আব্দুর নূর বাবুল, মুনশি আলীম, আহমেদ স্বপন প্রমুখ শিক্ষার্থী।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত