২৪ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১৬:৪৪
ফেসবুকে আবদুল করিম কিমের নাম ব্যবহার করে অপপ্রচারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ। সংবাদ সম্মেলনে কিমের বিরুদ্ধে অপপ্রচারকারীদের শাস্তি ও সাইবার ক্রাইম বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
শনিবার (২৪ ডিসেম্বর) সকাল ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি সাগর-রুনি মিলনায়তনে 'সাইবার ক্রাইম বিষয়ক নাগরিক উদ্বেগ: বাপা সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিমকে নিষ্ক্রিয় ও হত্যা করার ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে' এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
বাপার সহসভাপতি এড. সুলতানা কামাল এর সভাপতিত্বে এ বিষয়ে মুল বক্তব্য তুলে ধরেন বাপার সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আব্দুল মতিন। এতে আরো বক্তব্য রাখেন বাপার সহসভাপতি রাশেদা কে চৌধুরী, পুলিশের সাবেক এআইজি সৈয়দ বজলুল করিম বিপিএম, নদী কমিশনের সদস্য শারমীন মুরশিদ, সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী তবারক হোসেন, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল ও ভুক্তভোগী আব্দুল করিম কিম।
মুল বক্তব্যে ড. মো. আব্দুল মতিন বলেন, “আমাদের দেশে পরিবেশ আন্দোলন ক্রমান্বয়ে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মনে হয়, আন্দোলনের আন্তরিক সংগঠকদের চাপে রেখে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বাপা সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক ‘আব্দুল করিম কিম’ ভয়াবহ এক সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছেন। যাতে তার নিজের ও পরিবারের জীবননাশের আশংকা দেখা দিয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, ১৪ই ডিসেম্বর মধ্যরাতে কয়েক গাড়ি সশস্ত্র পুলিশ জনাব কিমকে অগ্রহণযোগ্য ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার নামে সিলেট কোতয়ালী থানায় নিয়ে যায় এবং ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননাকর একটি মন্তব্য নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। তাঁকে নিয়ে যাওয়ার চৌদ্দ ঘণ্টা পর এ বিষয়ে তাঁর সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ কারণে আমরা বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগকে আমাদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য যে, আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে তার ছবি ও নাম ব্যবহার করে এ ধরণের উদ্দেশ্যমূলক প্রচারের কারণ ও উৎস উন্মোচিত না হওয়ায় কিম সিলেটের বিমানবন্দর থানায় আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭(২) ধারায় মামলা দায়ের করেছেন, এই মামলার সংখ্যা-০৫ ,তারিখ ১৫/১২/২০১৬।
তিনি জানান, আব্দুল করিম কিম সিলেটের সর্বজন পরিচিত একজন নাগরিক আন্দোলনের সংগঠক। ১৯৯৬ সাল থেকে বিভিন্ন স্থানীয় আন্দোলন ও জাতীয় ইস্যুতে তিনি নাগরিক আন্দোলনের সাথে জড়িত। আব্দুল করিম কিমের নিরলস প্রচেষ্টায় সিলেটের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে বাপার অনবদ্য ও নেতৃত্ব মূলক ভূমিকা তৈরি হয়েছে। এই সময়ে তিনি শুধু সিলেট জেলাই নয়, সিলেট বিভাগের সর্বত্র পরিবেশ রক্ষার ভ্যানগার্ডে পরিণত হন। স্থানীয় বা জাতীয় গণমাধ্যমে সিলেটের পরিবেশগত বিষয়ে কিমের মন্তব্য, বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হয়। তিনি বৃহত্তর সিলেটে নদী ও জলাশয় পাহাড় ও টিলা বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রতিবাদে দীর্ঘ দিন যাবত সোচ্চার সামাজিক আন্দোলন পরিচালনা করে আসছেন। যার ফলে, জাফলং ও ভোলাগঞ্জে অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলন, বেপরোয়া পাহাড় ও বনধ্বংস, সুরমা নদী দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনাসহ নানা অপতৎপরতা পরিচালনাকারীদের কাছে জনাব কিম একজন শক্তিশালী বাধা। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ নানা প্রকার সুন্দরবন বিধ্বংসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে পরিচালিত জাতীয় আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্থানীয় আন্দোলনেও তার অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। বাপা সংগঠক হিসেবে টিপাইমুখ ড্যাম বিরোধী আন্দোলনেও তিনি স্থানীয় পর্যায়ে আন্তরিক ভূমিকা পালন করেছেন। জনাব কিম বাপার অন্যতম প্রজ্ঞাবান ও সক্রিয় নেতা। আন্তর্জাতিক ওয়াটার কিপারস এলায়েন্সের সদস্য এবং সুরমা বিভাগ ওয়াটারকিপার হিসাবে ২০১৪ সালে নদী রক্ষার আন্দোলনের স্বীকৃতি লাভ করেন। এছাড়াও পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনের বাইরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি ও সংখ্যালঘু নির্যাতন বিরোধী আন্দোলনে তার সাহসী অংশগ্রহণ ছিল। সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের উপর মানবাধিকার লংঘনের বিভিন্ন ঘটনায় কিম একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
ভুক্তভোগী আব্দুল করিম কিম বলেন, আমি সাইবার ক্রাইমের শিকার। যে ঘটনাটিকে নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাকে হেনস্থা করা হয়েছে, সেটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। এই হীন প্রচেষ্টা করা হয়েছে আমাকে সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় করার জন্য। আমাকে প্রতিনিয়ত ফেইসবুক ইনবক্সে অচেনা বিভিন্ন আইডি থেকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
সুলতানা কামাল বলেন, কিমের উপর যে কাজটি করা হয়েছে, এ ধরণের ঘটনার শিকার যে কোন নাগরিকই হতে পারেন। কিম একজন সমাজ সচেতন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তি। কিমের সাহসী ভূমিকায় যারা আজ ক্ষতিগ্রস্ত সেই মহলই কিমকে হেনস্থা করার এই অভিনব ষড়যন্ত্র করেছে। নাসিরনগর, হোমনা, ভূঞাপুরে সাইবার ক্রাইমের মাধ্যমেই নিরীহ মানুষদের উপর হামলার উস্কানি দেওয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ব্যক্তি, যারা দেশের পরিবেশ মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে সোচ্চার তাদেরকে এভাবে সাইবার ক্রাইমের শিকার করা হতে পারে। অতীতে দেখেছি অনেক নিরপরাধ ব্যক্তি সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাই এই ধরণের অপরাধ ঠেকাতে প্রযুক্তিকে আরোও আধুনিকায়ন করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কিমের মতো নিরপরাধ কেউ এ ধরণের হয়রানির শিকার না হয়।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আইসিটি ব্যবহার করে যে ভাবে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে তা শুভবোধ সম্পন্ন মানুষের জন্য দুশ্চিন্তা। আজকে কেউই নিরাপদ নই। সম্মান নিয়ে, নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে চাই। প্রকৃত ঘটনা যাচাই বাচাই ব্যতীত কিমকে যে ভাবে দ্রুত থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ বা হয়রানি করা হয়েছে, আমরা চাই সেই গতিতে যেন মূল অপরাধীদের খুঁজে বের করা হয়।
সৈয়দ বজলুল করিম বিপিএম বলেন, স্বাধীনতা বিরোধীরা দেশে এখনো তৎপর। সাইবার ক্রাইম বর্তমানে একটি আধুনিক ক্রাইম। ভবিষ্যতে এটি আরো জটিল হতে পারে। নিয়ন্ত্রণহীন সাইবার ক্রাইম ঘটতে থাকলে সমাজে অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তাই 'আব্দুল করিম কিম'-এর সাথে সংগঠিত সাইবার ক্রাইমের নেপথ্য অপরাধীকে অবিলম্বে শনাক্ত করা প্রয়োজন । পাশাপাশি সাইবার ক্রাইম বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি সহায়তা নিয়ে করা ফটোশপ জালিয়াতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে ধারনা দিতে হবে।
শারমীন মুরশিদ বলেন, আইসিটি ব্যবহার করে একটি কুচক্রী মহল কিমকে নিয়ে হীন চক্রান্ত শুরু করেছেন। স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্যই হলো কিমের মত সামাজিক আন্দোলনকারীদের যে কোনভাবে থামিয়ে দেয়া। তাই এদের দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে।
তবারক হোসেন বলেন, কিমকে আমি শৈশব থেকে চিনি। সিলেটের দল-মত-নির্বিশেষে সকল মহলের প্রিয় ও আস্থার সমাজকর্মী সে। তার বিরুদ্ধে করা এই ঘৃণ্য সাইবার ক্রাইম ও ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি উদ্বেগজনক।
শরীফ জামিল বলেন, অবিলম্বে এই ঘটনার নেপথ্যে জড়িতদের চিহ্নিত করে জনসম্মুখে উপস্থিত না করা পর্যন্ত একদিকে যেমন তার উপর আক্রমণ ও জীবননাশের হুমকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে ফটোশপ বা প্রযুক্তিগত সুবিধা নিয়ে পরিবেশ ও মানবাধিকার কর্মীসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলমান ষড়যন্ত্র বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ৪টি দাবি উত্থাপন করা হয়। এগুলো হল- যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আব্দুল করিম কিমের নামে পরিচালিত এই অপরাধমূলক ফেসবুক অপপ্রচার তথা সাইবার অপরাধ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তির বা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের নাম পরিচয় জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। এই ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের জরুরী বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সাইবার ক্রাইম দমনে আরও তড়িৎ ও সংবেদনশীল সরকারি ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।”
আপনার মন্তব্য