ছাতক প্রতিনিধি

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১৪:৫১

রাজাকারদের বিচার দেখে নিজের ভিটায় মরতে চান মুক্তিযোদ্ধা কানাই লাল

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছাতকের রণাঙ্গনের বীর সেনানী ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধা কানাই লাল দাস। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের মতো দেশের জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রাজাকারদেরও বিচার দেখে এবং নিজের ভিটেতে পরিবারের ঠাই করে মরতে চান তিনি।

যেসব রাজাকার, আলবদর-আলশামসরা বাংলার নিরীহ মানুষদের হত্যা, ধর্ষণ ও সম্পদ লুণ্ঠন করেছে তাদেরকে বিচারের আওতায় এনে তাদের ফাঁসীর দাবি করেন এ বীর সেনানী। এসব নরপশুরা এখনো দাপটের সাথে বাংলার বুকে বিচরণ করছে দেখে মুক্তিযোদ্ধা কানাই লাল দাসের ক্ষোভের সাথে তার যুদ্ধকালীন কিছু ভয়াবহ স্মৃতির কথা তুলে ধরেন।

১৯৭১ সালে কানাইলাল দাস এক টগবগে যুবক ও ছাতক সিমেন্ট কারখানার একজন নতুন শ্রমিক। ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হায়েনাদের বর্বোরচিত হত্যাযজ্ঞ তিনি বেতারে শুনেছেন এবং ২৭ ও ২৮ মার্চ ছাতকে হানাদার বাহিনীর নির্মম আক্রমণ দেখে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার দীপ্ত শপথ নেন। ২৮ মার্চ বিকেলে ভারতের চেলাবাজারে বাঙ্গালী শরণার্থী শিবিরে অন্যান্যদের সাথে যোগ দেন তিনি।

২৯ মার্চ ৭নং ব্যাচে ৬০ জনের একটি দল ট্রেনিং গ্রহণের জন্য বিএসএফের গাড়ি দিয়ে মেঘালয়ের জুরাইন নামক স্থানে পৌঁছেন। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং সেন্টার ইকু-ওয়ান-এ ২৮ দিন ট্রেনিং গ্রহণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন কানাই লাল দাস। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছাতকের এমএনএ আব্দুল হক, ডা. হারিছ আলী, কমরেড মানিক মিয়া, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে আসা ইউছুফ আলী, ফনী ভূষণ চৌধুরী, হেমেন্দ্র দাস পুরকায়স্থ, আমির আলী, সুনিল চক্রবর্তী, ডা. শুধাংশ দে, ডা. অশোক বিজয় দাশগুপ্ত, রবীন্দ্র নাথ মিন্টু, অরুণ চক্রবর্তী, স্বরাজ দাস, আলকাছ আলী, লিলু মিয়া, হোসেন আলীসহ অনেকেরই সাথে তার দেখা হয়।

পরে প্রয়োজনীয় আর্মস-এমোনিশন নিয়ে ক্যাপ্টেন হেলাল উদ্দিনের নির্দেশে ইউছুফ কোম্পানি ও শহীদ কোম্পানির অধীনে ৬০ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল পাক-বাহিনীর দখলে থাকা পাথরঘাটা, টেংরাটিলা, বেটিরগাঁও, হরিনাপাটি দখলে নিতে অপারেশনে যান। দু’দিন যুদ্ধ করে এসব গ্রাম মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আনা সম্ভব হয়। ওইদিন সুরমা নদী পথে আসা পাকবাহিনীর একটি খাদ্যভর্তি জাহাজ আটক করেন তারা। বেটিরগাঁওয়ের যুদ্ধে পাক সেনাদের হাতে ৩০ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

পরের দিন মুক্তিযোদ্ধারা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে কান্দাগাঁও ও মহব্বতপুর ডিফেন্স নিলে পাকসেনাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ৭ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং অল্পের জন্য বেঁচে যান ক্যাপ্টেন হেলাল। ভোরে ক্যাপ্টেন হেলালের নির্দেশে সেকশন কমান্ডার উজির মিয়ার সাথে তিনিসহ মুক্তিযোদ্ধা অজয় ঘোষ, অমরেন্দ্র কর, শ্যাম সুন্দর রায়, পরেশ চন্দ, মতিলালসহ কয়েকজন পাকসেনাদের বাঙ্কারে গ্রেনেড হামলা করে ১১ জন পাক সেনাকে হত্যা করতে সক্ষম হন।

এ সময় দোয়ারার কাঁকন বিবি তাদের খবরা-খবর এনে দিতেন। পরবর্তীতে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাকসেনাদের দখল থেকে কৈতক হাসপাতাল মুক্ত, ডাবর ফেরী ধ্বংস, শ্রীপুর ও লক্ষীপুর, গন্ধবপুর, আলমপুর, মৈশাপুর দখলে নেয়া হয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবর্ষণে ১২ জন রাজাকার নিহত হয়েছিল। পরদিন ঝাওয়া রেলওয়ে ও সড়ক ব্রীজ ধ্বংসে ইউসুফ আলীর নেতৃত্বে আব্দুল হালীম, আমীর হোসেন, উজির মিয়া, মজিদ মিয়া, মানিক লাল নাথ, মতিলাল, সিকান্দর আলী, অজয় ঘোষ, পরেশ চন্দ, অমরেন্দ্র কর, শ্যাম সুন্দুরসহ মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশনে অংশ নেন। পাকসেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর টানা যুদ্ধে ছাতক হানাদার মুক্ত করা সম্ভব হয়।

এ সময় দুর্বিণটিলা, হাদাটিলা ও সিমেন্ট কারখানায় পাকসেনাদের ফেলে যাওয়া গোলাবারুদ ও রসদ খুঁজতে গিয়ে প্রতিটি বাংকারে ২-৩ জন করে ধর্ষিতা নারী পাওয়া যায়। তাদের উলঙ্গ শরীরের সবস্থানেই নরপিচাশদের আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান তারা। এ ছাড়া পাকবাহিনীর সাথে তাদের বটের খালে ২ দিন, ভুরকীতে ৫ দিন টানা যুদ্ধ চলে। পরে কর্নেল এমএজি ওসমানীর নির্দেশে গ্রামে-গ্রামে তল্লাশি চালিয়ে, গোলাবারুদ, গ্রেনেড, বেয়নেট উদ্ধার করে বিশ্বনাথের রামসুন্দর স্কুল মাঠে এনে জমা করেন।

দেশ স্বাধীনের পর তার ব্যবহৃত এলএমজি-৫৭৮ অস্ত্রটি ক্যাপ্টেন হেলালের কাছে জমা দিয়ে পুনরায় ছাতক সিমেন্ট কারখানায় চাকুরীতে যোগ দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কানাইলাল দাস। মাস্টার টেকনিশিয়ান হয়ে ২০০৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধা একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন। রাজাকারদের বিচার দেখে মরতে চান রণাঙ্গনের এই সৈনিক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত