নিরঞ্জন দে

২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:০৫

নারীর প্রতীকী ব্যঞ্জনা, নারী দেবী ও নারী পূজার প্রাসঙ্গিক ভাবনা এবং নারীর অধিকার

পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় নানা রূপের নারীকে দেবী হিসেবে পূজা করা একটি হাস্যরসের বিষয় অনেকের কাছে। মুর্খদের কথা নাইবা বললাম, অনেক শিক্ষিত লোকও ধর্মের এই দার্শনিক ও রূপক বিষয়গুলো বুঝেন না বা বুঝতেই চান না।

নর-নারী তত্ব নিয়ে গভীর অনুধ্যান সবার থাকার কথা নয়। তবে কিছু প্রাকৃতিক ও সাধারণ বিষয় বুঝতে শুধু আগ্রহ, শ্রদ্ধা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকলেই হয়। এই বৃহৎ বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন বহু আলোকিত মানুষ শুধু নিজের জানার আগ্রহ, পড়াশোনা, সাধুসঙ্গ ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার বলে সমাজকে অমূল্য ধন দিয়ে গেছেন এবং অমর হয়ে আছেন মানুষের মনে। তাই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, অহংকার আর মুর্খতাকে ঝেড়ে ফেলে মানবসংস্কৃতির সমুদয় সৃষ্টিকে জানতে হবে। এই বিবর্তনের ধারাতেই জগৎসংসার এগিয়ে চলেছে।

তাই সনাতনী হিন্দু শাস্ত্রে নারীর বিরুদ্ধে প্রবিষ্ট নানা কু-প্রথা ও কুসংস্কারের পাশাপাশি নারীকে 'মাতা' 'দেবী' এবং শক্তির আধার হিসেবে পূজা বা শ্রদ্ধা করার বিষয়টিও সকলের জানা কর্তব্য।

প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা, হিন্দু ধর্মশাস্ত্র, দর্শন, পুরাণ, তন্ত্রসাধনা এবং আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে নারীকে কেবল সন্তানধারণকারী বা পারিবারিক জীবনের কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়নি; বরং তাঁকে সৃষ্টি, শক্তি, জ্ঞান, পুষ্টি, সমৃদ্ধি, প্রকৃতি ও মহাজাগতিক অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় এবং আরও নানা স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারে এসকল চিহ্ন ও নিদর্শন পাওয়া গেছে। আজও হিন্দুদের পূজাপার্বণে যে ঘট স্থাপন করা হয় সেখানে যে নারীর চিহ্নটি আঁকা হয় তাকে লজ্জাগৌরী বসুধারা বলা হয়ে থাকে। যা সৃষ্টি, উর্বরতা, আদিশক্তি ও অভয় আশ্রয়ের প্রতীক।

বৈদিক যুগ থেকেই ধারাবাহিক ভাবে নারী কখনো অদিতি, কখনো উষা, কখনো সরস্বতী, লক্ষ্মী, দুর্গা বা কালী; আবার কখনো পৃথিবী মাতা, ভূমি মাতা, নদী মাতা কিংবা দেশ মাতা হয়ে পূজিতা হয়েছেন। নদী আমার মা, আমার জন্মভূমি আমার মা, তারা নারী! এই বহুমাত্রিক মাতৃভাবনার মধ্যে মানুষের জীবন, প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক, সৃষ্টির রহস্য এবং সামাজিক পরিচয় সম্পর্কে আমাদের পূর্ব নারী-পুরুষদের গভীর উপলব্ধি প্রকাশিত হয়েছে।

নারীকে দেবী হিসেবে পূজা করার ধারণা তাই নিছক ধর্মীয় আচার নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অধিবিদ্যা, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, পরিবেশচেতনা এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাস। তবে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা জরুরি—নারীকে দেবী হিসেবে পূজা করা এবং বাস্তব জীবনে নারীকে সমান অধিকার ও মর্যাদা দেওয়া এক বিষয় নয়। নারীও রক্তমাংসের মানুষ। আমাদের প্রাচীণ ঐতিহ্যে নারীশক্তির উচ্চ দার্শনিক স্বীকৃতি যেমন রয়েছে, তেমনি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর স্বাধীনতা ও সামাজিক অধিকারের ওপর বিধিনিষেধও দেখা যায়। কোথাও কোথাও নারীকে চরম অবজ্ঞা করা হয়েছে। চরম বর্ণবাদী সমাজে কখনো মানুষকে মানুষের মর্যাদায় দেখা হয়নি। তাই বিষয়টিকে বুঝতে হলে ধর্মীয় প্রতীক, দার্শনিক তত্ত্ব এবং বাস্তব সামাজিক ইতিহাসকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বৈদিক সাহিত্য ও উপনিষদে নারীর মর্যাদা ছিল উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর সর্বপ্রাচীণ জ্ঞান-গ্রন্থ বেদ। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য বেদে নারীকে মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় । ঋগ্বেদের অদিতি অসীমতা ও বিশ্বজননীর প্রতীক; উষা নতুন আলোর আবির্ভাব ও জীবনের নবজাগরণকে প্রকাশ করেন; বাগদেবী ভাষা, জ্ঞান ও সৃষ্টিশীল শক্তির প্রতীক। এসব দেবী-ভাবনায় নারী জ্ঞান ও জীবনের বহুমাত্রিক শক্তির প্রতীক।

বৈদিক সাহিত্যে লোপামুদ্রা, ঘোষা, অপালা, বিশ্ববারা প্রমুখ নারী ঋষির নামও পাওয়া যায়। তাঁদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান-ঐতিহ্যের কিছু ধারায় নারীরা স্তোত্র রচনা, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও জ্ঞানচর্চায় অংশ নিয়েছিলেন। তবে বৈদিক সমাজের সব নারী সমানভাবে শিক্ষা ও ধর্মীয় অধিকার লাভ করতেন কি না এটা হয়তো আরও গবেষণার দাবি রাখে। তবে, উপনিষদীয় দর্শনে গার্গী ও মৈত্রেয়ী নামক দু'জন নারীর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ভারতীয় দর্শনের সাংখ্য ধারায় পুরুষ ও প্রকৃতির ধারণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পুরুষ চৈতন্য বা সাক্ষীস্বরূপ সত্তা, আর প্রকৃতি জগতের বিকাশ ও বিবর্তনের মূল নীতি। প্রকৃতি থেকে বুদ্ধি, অহংকার, মন, ইন্দ্রিয় এবং জগতের নানা উপাদানের বিকাশ ব্যাখ্যা করা হয়। প্রকৃতিকে নারীত্বের সঙ্গে প্রতীকীভাবে তুলনা করা হলেও এই দার্শনিক ধারণাকে সরাসরি সামাজিক নারী-পুরুষের সম্পর্কের সমতুল্য মনে করা উচিত নয়।

অদ্বৈত বেদান্তে ব্রহ্মকে চূড়ান্ত অদ্বিতীয় সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আত্মা ও ব্রহ্মের ঐক্যের উপলব্ধিই মুক্তির কেন্দ্র। এই দৃষ্টিতে মানুষের গভীরতম সত্তাকে দেহগত লিঙ্গ বা সামাজিক পরিচয়ের সীমায় আবদ্ধ করা যায় না।

নারীকে মহাশক্তি হিসেবে দেখার সবচেয়ে সুস্পষ্ট দার্শনিক প্রকাশ শাক্তধর্মে। শাক্ত দর্শনের বহু ধারায় দেবী কেবল কোনো পুরুষ দেবতার সহায়ক নন; তিনি স্বয়ং সৃষ্টির উৎস, বিশ্বধারক এবং পরম শক্তির প্রকাশ। দেবীমাহাত্ম্য-এ দুর্গার মহিষাসুর ও অন্যান্য অসুরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অন্যায়, বিশৃঙ্খলা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। কালী সময়, মৃত্যু, ধ্বংস ও রূপান্তরের শক্তিকে প্রকাশ করেন। লক্ষ্মী সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রতীক, সরস্বতী জ্ঞান ও শিল্পের, আর অন্নপূর্ণা খাদ্য ও পুষ্টির প্রতীক।

তন্ত্রদর্শনের বিভিন্ন ধারায় শিব ও শক্তিকে চেতনা ও তার প্রকাশ ক্ষমতার পরস্পরসম্পর্কিত নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শক্তি ছাড়া শিবের সৃষ্টিক্ষমতা অসম্পূর্ণ—এই ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং এক বৃহত্তর ঐক্যের ও অখণ্ড সত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব ধারণায় নারীত্বকে সৃষ্টির একটি মৌলিক বিষয় হিসেবে দার্শনিক ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও বাস্তবে সামাজিক সমতায় নারী আজও বৈষম্যের শিকার।

হিন্দু বা সনাতনীদের পুরাণ ও মহাকাব্যে নারীর মহিমা প্রকাশিত হয়েছে। শক্তি, মর্যাদা ও প্রতিবাদের ক্ষেত্রে ভারতীয় মহাকাব্যে নারীচরিত্রের বহুমাত্রিকতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। রামায়ণের সীতা সহিষ্ণুতা, সাহসিকতা, সততা, নৈতিক দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নকে সামনে আনেন। মহাভারতের দ্রৌপদী কৌরবসভায় বস্ত্রহরণ কাণ্ডে অপমানের মুখে যে প্রশ্ন তোলেন, তা ক্ষমতা, ন্যায়বিচার ও নারীর অধিকার সম্পর্কে গভীর নৈতিক সংকট প্রকাশ করে। তাঁর প্রতিবাদ দেখায়, নারী কেবল পুরুষের সিদ্ধান্তের পুতুল নন; তিনি অন্যায়ের বৈধতাকে প্রশ্ন করতে পারেন।

এই চরিত্রগুলোকে একমাত্রিক আদর্শে সীমাবদ্ধ করলে তাঁদের তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ভারতীয় মহাকাব্যে নারী চরিত্রের আদর্শায়নের পাশাপাশি তাঁর প্রতি সামাজিক অন্যায়, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রতিবাদের বিষয়টিও পরিলক্ষিত হয়। ফলে নারীর মর্যাদা সম্পর্কে প্রাচীণ ভারতীয় ঐতিহ্য কোনো একক ও অপরিবর্তনীয় বক্তব্য দেয় না।

পৃথিবী মাতা, ভূমি মাতা ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিশ্ববোধে নারীর অবস্থান সুস্পষ্ট। নারী ও মাতৃসত্তার ধারণা শুধু দেবী-উপাসনায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃতির সঙ্গেও তা গভীরভাবে যুক্ত। অথর্ববেদের দ্বাদশ কাণ্ডের ভূমিসূক্তে বলা হয়েছে—
মাতা ভূমিঃ পুত্রোহং পৃথিব্যাঃ।
অর্থাৎ, “পৃথিবী আমার মাতা, আমি পৃথিবীর সন্তান।”

এই পঙ্‌ক্তিতে পৃথিবীকে নারীর সঙ্গে তুলনা করে জীবনধারণের আশ্রয় ও পুষ্টিদাত্রী সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। মানুষ পৃথিবী থেকে খাদ্য, জল, বায়ু, বাসস্থান ও জীবনের উপকরণ পায়; তাই পৃথিবীকে মাতৃরূপে দেখার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ধারণা নিহিত রয়েছে।

ভূমি মাতা মানুষের খাদ্য, জীবিকা, বসতি, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। নদী মাতা জীবনপ্রবাহ, উর্বরতা, কৃষি, পানীয় জল ও জনপদের ধারাবাহিকতাকে প্রকাশ করেন।

পৃথিবী, ভূমি, নদী বা অরণ্যকে মা বা নারী হিসেবে কল্পনা করা আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের বিষয় নয় এটি ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক প্রতীক। কিন্তু এই প্রতীক পরিবেশ সংরক্ষণ, সম্পদের সংযত ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগাতে পারে। বিশেষত নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী, হাওর, বিল, জলাভূমি ও কৃষিজমি মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি ও স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এখানে শুধু ধর্মীয় অনুভূতি নয়, জীবনরক্ষার বাস্তব প্রয়োজনও।

বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও আদিবাসী সমাজে মাতৃসত্তা, প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যে ভূমি, বন, পাহাড়, নদী ও জলাশয়কে আত্মীয়, পবিত্র সত্তা কিংবা পূর্বপুরুষের স্মৃতিবাহী স্থান হিসেবে দেখার দৃষ্টান্ত রয়েছে। নদী পূজা, নদীতে ফুল দিয়ে অর্ঘ্য দেয়া, প্রদীপ ভাসানো আদিবাসী সমাজ থেকে এখন সমগ্র সনাতনী সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও নদী নারী হিসেবে বা মা হিসেবে পূজিতা হন। আদিবাসী সমাজ এখনো মাতৃতান্ত্রিক।

নারী ও মাতৃসত্তা নিয়ে আলোচনায় মাতৃতন্ত্র, মাতৃবংশীয় ব্যবস্থা এবং মাতৃকেন্দ্রিক পরিবারের পার্থক্য বোঝা জরুরি। মাতৃতন্ত্র বলতে সাধারণত এমন সামাজিক বা রাজনৈতিক কাঠামো বোঝানো হয়, যেখানে নারীরা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান কর্তৃত্ব রাখেন। মাতৃবংশীয় ব্যবস্থায় বংশপরিচয় বা উত্তরাধিকারের ধারা মায়ের বংশ ধরে নির্ধারিত হয়। আর মাতৃকেন্দ্রিক পরিবারে মা বা মাতৃপরিবার পারিবারিক জীবনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এই তিনটি ধারণা এক নয়। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল ও ভারতের মেঘালয়ের খাসি সমাজে মাতৃবংশীয় বংশপরিচয় প্রচলিত। ঐতিহ্যগত ব্যবস্থায় বংশপরিচয় মায়ের দিক দিয়ে নির্ধারিত হয় এবং কনিষ্ঠ কন্যা অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বা পূর্বপুরুষের সম্পত্তির প্রধান উত্তরাধিকারী ও তত্ত্বাবধায়ক হন। গারো সমাজেও মাতৃবংশীয় পরিচয় ও উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তবে খাসি বা গারো সমাজকে সরলভাবে নারীর শাসিত সমাজ বলা ঠিক নয়। মাতৃবংশীয় উত্তরাধিকার থাকা সত্ত্বেও সম্পত্তির বাস্তব নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নৃতত্ত্বের এই আলোচনায় একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট: বংশপরিচয়, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা এক বিষয় নয়। তাই মাতৃবংশীয় সমাজের গুরুত্ব হলো, মানবসমাজে পরিবার, সম্পত্তি ও পরিচয় সংগঠিত করার বিকল্প কাঠামোও রয়েছে।
তবে, নরীর গুরুত্ব, মহিমা ও দশভুজা শক্তি এই সমাজে প্রতিফলিত হয়।

মাতৃসত্তার ধারণা যখন প্রকৃতি ও স্থানীয় সমাজের সীমা ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর ভূখণ্ডের সম্মিলিত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন দেশ মাতা বা মাতৃভূমির প্রতীক গড়ে ওঠে। দেশ এখানে শুধু মানচিত্রের সীমানা নয়; ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, স্মৃতি, সংগ্রাম ও মানুষের সম্মিলিত পরিচয়ের প্রতীক।

নারীকে দেবী হিসেবে সম্মান করা হলে সমাজে নারীর স্বাধীনতা সব সময় নিশ্চিত হয়েছে কি না—এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই দ্বন্দ্বের কারণেই দেবী-উপাসনাকে নারীর সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। নারীকে শুধুই দেবী বানিয়ে মাটি, কাঠ,পাথর আর ধাতুর প্রতিমা গড়ে পূজো করলেই হবে না। ঘরে ঘরে জীবন্ত নারীকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে হবে, অধিকারের ও কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। নারী নির্যাতন ও নারীর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন বন্ধ করতেই হবে।

আধুনিক নারীবাদী দৃষ্টিতে নারীর মর্যাদা তাঁর মাতৃত্ব, সৌন্দর্য, ত্যাগ বা ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। একজন নারী স্বাধীন মানুষ হিসেবে নিজের জীবন, শিক্ষা, পেশা, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন। দেবী-ভাবনার সাংস্কৃতিক শক্তি তখনই বাস্তব অর্থ পায়, যখন তা নারীর নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, সমানাধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। নারী পুরুষের সেবক নয়, নয় সামান্যা, দুর্বল। তার আপন ভাগ্য তাকেই রচনা করতে দিতে হবে কারন সে দেবী, সে শক্তির আধার।

নারী—মাতৃসত্তা শুধু উপাসনার প্রতীক নয়; এটি জীবনকে ধারণকারী শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সেই জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতার আহ্বান। পৃথিবী মাতা হলে পৃথিবীকে ধ্বংস করা আত্মবিনাশের পথ; নদী মাতা হলে নদীকে দূষিত করা জীবনধারাকে বিপন্ন করা; ভূমি মাতা হলে ভূমির সঙ্গে যুক্ত মানুষের অধিকার ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা সেই ধারণার বিরোধিতা। আর নারীকে দেবী বলে সম্মান করলে বাস্তব নারীর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার ও সমমর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি।

মাতৃসত্তার ধারণাকে তাই তিনটি স্তরে উপলব্ধি করা যায়—ধর্মীয় স্তরে এটি উপাসনা, দার্শনিক স্তরে এটি সৃষ্টি ও অস্তিত্বের ব্যাখ্যা, আর নৈতিক স্তরে এটি যত্ন, ন্যায়, সংযম ও দায়বদ্ধতার আহ্বান। এই তিনটি স্তর যখন বাস্তব জীবনে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন নারীকে দেবী হিসেবে পূজা করার ঐতিহ্য নিছক আচার বা পৌরাণিক কল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে আরও মানবিক, ন্যায়সংগত ও দায়িত্বশীল করে তোলার সাংস্কৃতিক সম্পদ হয়ে ওঠে।

প্রাচীণ ইতিহাসে প্রবল পরাক্রমশালী নারী অপ্রতিরোধ্য ক্ষিপ্রতায় যুূ্দ্ধের ময়দানে শত্রু সংহারে সফল হয়েছেন, যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন, রাজ্য ও জনগণকে রক্ষা করেছেন - এমন নাম তো বিরল নয়। সুতরাং মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা, কালী, বিমলা, রণচণ্ডী এরা অবাস্তব নন। অসুর সর্বত্র তাই দুর্গার সংখ্যাও বাড়ছে বৈকি!

মানবসভ্যতার সবচেয়ে সৃজনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হলো প্রতীক বা রূপক সৃষ্টি। কোনো জাতি, কোনো দেশ, কোনো সমাজ, কোনো ধর্ম প্রতীক বর্জিত নয়। মানুষ যখন ভাষা সৃষ্টি করেছে যোগাযোগ ও মনের ভাব প্রকাশের জন্য - সেটাও ছিল প্রতীক নির্ভর। সুতরাং নারী বা দেবী আরাধনার তাৎপর্য বুঝতে হলে এর দর্শনটি জানতে হবে ও বুঝতে হবে। তাহলেই বুঝবেন, "যে রাধা সে-ই কৃষ্ণ, সে-ই দুর্গা, কালী, শিব"
মূলে সবই এক ও অখণ্ড।
একমেবাদ্বিতীয়ম্, একং সদ্ বহুদা বদন্তি।

নিরঞ্জন দে: লেখক, প্রামাণ্যকার ও সংগঠক

আপনার মন্তব্য

আলোচিত