আনু মুহাম্মদ

০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:২৯

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর: উন্নয়নের নামে নব্য উপনিবেশায়ন

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের চরিত্র দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নের মুখে। বিশেষ করে সামরিক তো বটেই অর্থনীতি ও অবকাঠামো খাতে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও গোপনীয়তা, তড়িঘড়ি, অস্বচ্ছতা আর বলপ্রয়োগ দেখা যায়। সেই পুরনো প্রবণতার সর্বশেষ বড় দৃষ্টান্ত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে সরকারের তৎপরতা। প্রশ্ন ওঠে- এ কোন দায় বা তাগিদ, যার জন্য সকল যুক্তি তথ্য অগ্রাহ্য করে নির্বাচিত সরকার এইরকম জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি করতে উদ্যত হয়? তাড়াহুড়োই বা কীসের?

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং টার্মিনাল ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ নামে আবুধাবির একটি রাষ্ট্রীয় কোম্পানিকে দরপত্র ছাড়া ইজারা দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার আমলে। অন্তর্বর্তী সরকার রীতিমত জোরজবরদস্তি করেছে এই চুক্তি সম্পাদনের জন্য। তখন চুক্তি সম্পাদন না হলেও এই কোম্পানির কর্মকর্তারা বন্দরে আসা-যাওয়া শুরু করেছে ইউনূস আমল থেকেই। এই সময়েই, লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও, বন্দরের সবরকম মাশুল অনেক বাড়ানো হয়েছে। আগে থেকেই বিদেশি কোম্পানির উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করা ছাড়া এর আর কোনো যুক্তি নেই। বন্দরের যেসব সমস্যার যুক্তি টানা হয়েছে সেগুলোর কারণ সমুদ্র গভীরতা, কাস্টমস ও আমলাতন্ত্র। এগুলোর সমাধান সরকারের হাতে, বিদেশি কোম্পানির হাতে নয়। উন্নয়নের জন্য, সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এভাবে গোপন তৎপরতায় বিদেশি কোম্পানি লাগবে, মাশুল বৃদ্ধি করতে হবে– এ যুক্তি তাই মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। ইউনূস সরকার তাদের উদ্যোগের বিরোধীদের প্রতিহত করার আহবান জানিয়ে অন্য দুটো টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়। শ্রমিকদের শক্তিশালী প্রতিরোধের কারণে ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর সাথে চুক্তি করতে তখন তারা সক্ষম হয়নি।

আর বর্তমান নির্বাচিত সরকার জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে প্রমাণ করছে তারা জনগণের ভোটের চাইতে দেশি-বিদেশি মাফিয়া গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছেই বেশি দায়বদ্ধ। কোনো দরপত্র না ডেকে, সরকার নিজেদের সিদ্ধান্ত দিয়ে এই চুক্তি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার পথে যায়নি। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বড় সিদ্ধান্ত হলেও জনগণ জানে না চুক্তির শর্ত কী, বাংলাদেশের লাভ কী দায় কী, কোন আইন অনুসরণ করে চুক্তি হচ্ছে, এবং দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, রাজস্ব, শ্রমবাজার বা নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব কী হবে। সমাজে উঠা প্রশ্ন/আলোচনা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কোনো উন্মুক্ত শুনানি নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতামত নেওয়া হয়নি, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও অন্ধকারে রাখা হয়েছে। সাধারণভাবে বললে- যে জনগণের নামে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তাদের কাছ থেকেই রাষ্ট্র সব তথ্য গোপন রাখতে যেন বদ্ধপরিকর।

সরকার বলছে- এগুলো ‘কনসেশন’, মালিকানা থাকবে বাংলাদেশের- এ যুক্তি প্রতারণামূলক। মালিকানা কাগজে থাকলেই মালিকানা বাস্তবে থাকে না; নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ক্ষমতাই প্রকৃত মালিকানা। তাই ১৫ বছরের জন্য নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা হস্তান্তর মানে ওই স্থাপনাটির ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ হারানো। বিশ্বের কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্র তার প্রধান বন্দরকে এভাবে বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না। সিঙ্গাপুরের পিএসএ, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস, এমনকি আবুধাবির ডিপি ওয়ার্ল্ড- এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিজেদের সক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়ে আজ বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান হয়েছে। আর আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবসময়ই কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। তাদের সক্ষমতা বাড়াতে রাষ্ট্র কোনো উদ্যোগ নেয়নি; বরং কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থে নিজেদের অক্ষমতার সংস্কৃতিকে স্থায়ী করে তোলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। দেশের মোট আউটবাউন্ড ও ইনবাউন্ড বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এখান দিয়ে প্রবাহিত হয়। কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রায় ৯৮ শতাংশ। বিশেষত একটি প্রান্তস্থ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ক্ষমতা আজকের বিশ্বে অনেকটাই নির্ভর করে তার বন্দর ব্যবস্থাপনার ওপর। বিশেষত তা যখন প্রধান বা প্রায় একমাত্র বন্দর হয়। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়- এটি জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত ভূরাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দু। এমন অবস্থায় এই বন্দরকেই বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার যে কাজ সরকারের, সেটি নিছক উন্নয়ন বা বাণিজ্যগত সিদ্ধান্ত নয়- এটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। দেশকে ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে ছেড়ে দিয়ে ক্ষমতা রক্ষার চেষ্টা। সরকারের সাথে সাথে সংসদের ‘বিরোধী’ অন্য দলগুলোও মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি ও বন্দরচুক্তির এসব জাতীয় স্বার্থবিরোধী অপরাধের শরিক।

বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-চীন-জাপান প্রত্যেকেরই এই অঞ্চলে নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর মার্কিন পকেটের রাষ্ট্রের কোম্পানি বা বিদেশি নিয়ন্ত্রণ মানে এই দেশগুলোর প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে পড়া বা যুদ্ধজোটের তৎপরতার শিকার হওয়া। এটি কেবল বাণিজ্য বা শুল্কের প্রশ্ন নয়; এটি সামরিক, গোয়েন্দা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্নও। বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক রাষ্ট্রকে এসব স্ট্র্যাটেজিক খেলায় দায়িত্বহীনভাবে জড়িয়ে সরকার দেশের ভবিষ্যৎ আরও বিপন্ন হবার পথ খুলে দিচ্ছে।

  • আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও লেখক

আপনার মন্তব্য

আলোচিত