নিজস্ব প্রতিবেদক

২১ ফেব্রুয়ারি , ২০২৫ ১৯:৪৩

যেথা ‘বিশ্বমায়ের আসন পাতা’

শহীদ মিনারে ৫২ ভাষায় ‘মা’

ভাষা তো মাতৃস্বরূপই। ভাষাকে মায়ের রূপে দেখা হয় বলেই বলা হয়- মাতৃভাষা। মা, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি- এসব তো একই সূত্রেই গাঁথা। এমন ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সিলেটে নির্মিত একটি শহীদ মিনারে। এই শহীদ মিনারে স্থান পেয়েছে বাংলাসহ বিশ্বের ৫২ ভাষায় লেখা ‘মা’। এ যেনো এক মিনারেই ‘বিশ্বমায়ের আসন পাতা’।

‘মা : অবাক আলোর লিপি’- এমন ভাবনায় এই শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছে সিলেটের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটিতে। নির্মাণের পর থেকেই ব্যতিক্রমী ও অনন্য এই শহীদ মিনারটি সবার নজড় কেড়েছে।  

পৃথিবীর সকল সন্তানের কাছেই মা’য়ের আবেদন এক ও অভিন্ন। ‘মা’ ধ্বনিতেই কথা বলার শুরু, আর এই শব্দকে ঘিরেই মানবিকতার বিকাশ। তাই নানান ভাষারি মা শব্দকে উপজিব্য করেই গড়ে তোলা হয়েছে এই শহীদ মিনার। মায়ের সম্মেলনের এই শহীদ মিনারটির মধ্যভাগে বড় করে বাংলায় লেখা হয়েছে ‘মা’। বাংলাদেশের বুকে বাঙালি ভিন্ন অন্য নৃ-গোষ্ঠীদের নিজস্ব বর্ণমালায় ‘মা’ ধ্বনিটি এই মিনারের খাঁজে খাঁজে খচিত রয়েছে।  ইতিহাসের পথের বাঁকে বাংলা ভাষা যেসব ভাষার সাক্ষাৎ পেয়েছে, স্পর্শ পেয়েছে, সেসব ভাষারও  মা শব্দটি এই মিনারের শরীরে অলংকার হয়ে আছে। সব মিলিয়ে বাহান্নটি ভাষার নিজস্ব বর্ণমালায় ‘মা’ শব্দের অংশগ্রহণ রয়েছে এখানে।

শহিদ মিনারটির স্থাপত্য আঙ্গিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, এটি ৩৯ ফুট উচ্চতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কনক্রিটের একটি চতুষ্কোণ ছককাটা চটের তৈরি আসনের মতো, যা আমাদের বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাড়া দেয়ালের ছককাটা চতুষ্কোণ ঘরগুলোতে বিভিন্ন ভাষার নিজস্ব হরফের ‘মা’ শব্দটি স্থাপিত এবং কিছু কিছু ঘরে রয়েছে মা-কে নিয়ে লেখা বাংলা সাহিত্যের মহৎ কবিদের পংক্তিমালা। রয়েছে কবির সুমনের গানের কলি- ‘আমি চাই সাঁওতাল তার ভাষায় বলবে রাষ্ট্রপুঞ্জে’। অবশিষ্ট কিছু ফাঁকা ঘরে শোভা পাচ্ছে দেশীয় ইটের বুনন-কারুকাজ যেখানে সিলেটের বিখ্যাত শীতলপাটির প্রভাব স্পষ্ট। সম্মুখের চওড়া বেদিতেও ইটের এই কারুকাজ লক্ষনীয়।

এই শহীদ মিনারের স্থপতি লিডিং ইউনিভাসিটির স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক রাজন দাশ। তিনি বলেন, ‘মা এবং মাতৃভাষা এই শহীদ মিনারের প্রধান উপজীব্য বিষয়। পৃথিবীতে মাত্র দু’-চারটি ভাষা ছাড়া সব ভাষাতে ‘মা’ শব্দটির শুরু ‘ম ধরণের’ বর্ণ দিয়ে। এটা একটা অদ্ভ’ত ব্যাপার। এই জায়গা থেকে ভাষার আসলে কোন শত্রু নেই, ভাষার কোন বাধা হয় না। এটাই আমাদের মূল চেতনার জায়গা। তাই মাতৃভাষার আন্তর্জাতিকতাবোধের জায়গা থেকে বাংলাভাষা ছাড়াও আমাদের দেশে যেসব নৃগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের ভাষাসহ ৫২টি ভাষায় লেখা ‘মা’ শব্দটি এই শহীদ মিনারে বসানো হয়েছে।’
 
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কামাল বাজারে লিডিং ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। এর প্রধান ফটকের পাশে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন এই শহীদ মিনার। ১৫ শতক জায়গা নিয়ে নির্মিত এই শহীদ মিনার ৩৮ ফুট উঁচু ও ৬০ ফুট চওড়া।

এই শহীদ মিনারে বাংলা ছাড়াও চাকমা, মারমা, ম্রো, মগ, ত্রিপুরা, রাখাইন, মনিপুরী, সিলেটি নাগরী, অহমিয়া, মিজো, পাত্র, খাসিয়া, সাঁওতালদের ভাষায় লেখা ‘মা’ শব্দটি বসানো রয়েছে। অন্যান্য ভাষার মধ্যে সংস্কৃত, আরবী, উর্দু, ফার্সি, পশতু, গ্রিক, রোমান, হায়ারোগ্লাফিক, রেড ইন্ডিয়ানদের ভাষার ‘মা’ও আছে এখানে। একইসঙ্গে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, ডাচ, তামিল, গুজরাটি, বার্মিজ, জার্মান ভাষায় লেখা ‘মা’ও রয়েছে। রয়েছে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় মায়ের উচ্চারণ ‘মাইজিও’ও।

গত মঙ্গলবার সিলেট শহর থেকে এই শহীদ মিনার দেখতে গিয়েছিলেন একদল তরুণ। বাইসাকেল চালিয়ে তারা শহীদ মিনারটি দেখতে যান। তাদের একজন বেসরকারি চাকুরীজীবী সুমিত হাসান বলেন, ভাবনা ও নির্মাণশৈলীর দিক থেকে এটি একটি অনন্য শহীদ মিনার। শহীদ মিনার বলতে আমাদের চোখের সামনে যে স্থাপনা ভেসে উঠে বা যেরকম শহীদ মিনার দেখে আমরা অভ্যস্ত এটি সেরকম নয়। তবে এটির অন্যরকম একটি আবেদন রয়েছে।

তিনি বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি এখন শুধু বাঙালির নয়, সমস্ত বিশ্বের। এই শহীদ মিনারেও আন্তর্জাতিকতাবাদের বিষয়টি উঠে এসেছে। সব ভাষার প্রতি ও সব মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। পৃথিবী থেকে কোন ভাষা যেনো বিলুপ্ত হয়ে না যায়  সে সম্পর্কে সচেতন করার একটি প্রয়াস রয়েছে এই মিনারে।

শহীদ মিনারটির স্থপতি রাজন দাস বলেন, ‘পৃথিবীতে সাত হাজার ভাষা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার বিলুপ্ত হওয়ার পথে। সেই জায়গা থেকে চিন্তা করলে আমাদের দেশেও অনেক ভাষা ঝুঁকির মধ্যে। বড় ভাষা ছোট ভাষাকে খেয়ে ফেলছে। এই মিনার এই ভাষার রাজনীতির বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে থাকা এক প্রতিবাদের সূচনামাত্র। সব ভাষা বেঁচে থাকুক সেই অঙ্গীকারের চিন্তা আছে এই শহীদ মিনারে। । সব মায়ের বুলি স্থান পাক শহীদ মিনারে।’

রাজন দাস সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার ‘সূর্যালোকে বর্ণমালা’ এবং মদনমোহন কলেজের রিকাবীবাজার ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারের স্থপতিও। তার এই দুটি কাজও প্রশংসা কুড়িয়েছে।   

আপনার মন্তব্য

আলোচিত