শাকিলা ববি

০৮ মার্চ, ২০২৫ ১৫:০৭

‘পুরুষদের ব্যবসায়’ সিলেটে এক নারীর সাফল্য

আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৫

সাধারণত ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট ফার্ম বা ভিসা এজেন্সি জাতীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুরুষরাই করে থাকেন। অনেকে এটাকে পুরুষদের ব্যবসাও বলে থাকেন। এই অঙ্গনে রাজধানীতেও নারীদের বিচরণ খুবই অল্প। তার ওপর রক্ষণশীল এলাকা সিলেট। তাই তার এই কনসালট্যান্সি ফার্ম ব্যবসা শুরু করা খুব সহজ ছিল না। পরিবার থেকে পুরো সমর্থন পেলেও এই ব্যবসায় নামার প্রধান অন্তরায় ছিল তিনি নারী ও তার অল্প বয়স। তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্য পেয়েছেন তিনি।

বলছি তাহিয়া তলিবিয়া মিম-এর কথা। তিনি সিলেটের অন্যতম ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্সি ফার্ম স্কাইলার্ক ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার ও সিইও। প্রতিষ্ঠানটি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়াসহ নানা ধরনের সহযোগিতা করে।

প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার পেছনে রয়েছে তাহিয়ার অক্লান্ত পরিশ্রম। বর্তমান পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাহিয়া।

ছোটবেলাতেই ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন তাহিয়া তালবিয়া। ২০১৭ সালে তার নেতৃত্বে সিলেট ইংলিশ অলিম্পিয়াড ব্যাপক সফলতা লাভ করে। এই সাফল্য তাকে শিক্ষা ও অভিবাসন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশ নেন।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে আইইএলটিএস কনসালটেশন প্রোগ্রামেও কাজ করেন। এসব করতে গিয়ে তিনি তার প্রকৃত সক্ষমতা উপলব্ধি করেন। এরপর ২০১৯ সালে তিনি স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান স্কাইলার্ক ইন্টারন্যাশনালের যাত্রা শুরু করেন। এখন পর্যন্ত তার এই প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪ হাজার শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে সহযোগিতা করেছে।

খুব অল্প বয়সেই তাহিয়া তার পেশাগত জীবন শুরু করেন। এ লেভেল পাস করার পর তিনি সিলেটের একটি স্বনামধন্য বিদ্যালয় সিলেট গ্রামার স্কুলে ইংরেজি ভাষার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। একই সময়ে, তিনি ইউনির্ভাসিটি অব লন্ডনের অধীনে ব্রিটিশ ল’তে এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের জন্য পড়াশোনা শুরু করেন। নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান গড়তে নিজেকে দক্ষ করতে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। আইইএলটিএসে ৮.৫ স্কোর করেন। এই কার্যক্রমগুলো তাকে নেতৃত্ব, নেটওয়ার্কিং, অভিবাসন শিক্ষা পরামর্শদানের ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে সহায়তা করে।

তাহিয়া বলেন, আমি শুরুর দিকে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছিলাম। প্রথমত, আশপাশের অনেক মানুষ বলতেন তোমার আইইএলটিএসে স্কোর ভালো, বিদেশে চলে যাও। মেয়ে মানুষ এত অল্প বয়সে এসব ব্যবসা দিয়ে কিছু করতে পারবে না। মানুষের এসব পরামর্শের নামে নিরুৎসাহিত করার প্রবণতাকে উপেক্ষা করাই ছিল আমার প্রথম চ্যালেঞ্জ।

এরপর যখন স্কাইলার্ক ইন্টারন্যাশনালের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলাম তখন আরও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সামনে আসতে লাগল। একদিন সকালে এসে দেখি আমার প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডই নেই। কে বা কারা খুলে নিয়ে গেছে। আমার অফিসে অন্যান্য এজেন্সির মানুষজন স্পাই পাঠাতেন। তবে এসব কিছুতে আমি কখনো নিরুৎসাহিত হইনি। সবকিছুর মুখোমুখি হয়ে আমার কাজ আমি করে গেছি।

বর্তমানে তাহিয়া স্কাইলার্ক ইন্টারন্যাশনালকে সিলেটের একটি বিশ্বস্ত শিক্ষা পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে সহায়তা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ করে আইইএলটিএস, পিটিই, ডুয়োলিঙ্গো এবং ওআইইটিসির মতো ভাষা প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে।

যেখানে ইউকে স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে ১০০ ভাগ সাফল্যের হার রয়েছে। শুধু শিক্ষা পরামর্শদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাহিয়া স্কাইলার্ক একাডেমি ও স্কাইএজ সলিউশন নামে দুটি প্রতিষ্ঠান করে তরুণদের প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছেন।

তাহিয়ার লক্ষ্য ছিল নিজের পরিচয় তৈরি করা। নিজের একটি ব্র্যান্ড সৃষ্টি করা। তিনি মনে করেন প্রতিটি নারীরই নিজস্ব পরিচিতি থাকা দরকার। তাই তিনি নারীদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তার প্রতিষ্ঠানে তিনি নারীদের অগ্রাধিকার দেন। তাহিয়া বলেন, আমি বিশ্বাস করি, আমাদের নিজেকে সফল করার পাশাপাশি অন্যদেরও সহায়তা করতে হবে। কারণ, আমরা তখনই সত্যিকারের সফল হব, যখন অন্যদের এগিয়ে দিতে পারব। আমাদের স্বপ্ন দেখা উচিত শুধু নিজের জন্য নয়, বরং সমাজ ও বিশ্বের জন্যও।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত