১৯ মার্চ, ২০২৬ ২২:১৫
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের সাত কর্মদিবসের মধ্যে এবং ঈদ বোনাস ১২ মার্চের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশনা ছিল। অথচ শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত আট শিল্প এলাকার ৩২ দশমিক ৩৪ শতাংশ কারখানায় শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারির বেতন এবং ৬৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ কারখানায় ঈদের বোনাস পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন মালিকপক্ষ। এমনকি গতকাল পর্যন্ত গাজীপুরের শিল্পকারখানার প্রায় ৫ শতাংশ শ্রমিক ফেব্রুয়ারির বেতন এবং ৯ শতাংশ শ্রমিক ঈদ বোনাস পাননি। অর্থাৎ, কয়েক লাখ শ্রমিক এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আমাদের শ্রমিকদের প্রতি এরকম অমানবিক আচরণ কোনোভাবেই একটি স্বাভাবিক চর্চা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন - এনপিএ ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি সকল শ্রমিকের বকেয়া বেতন এবং ঈদ বোনাস সঠিক সময়ে পরিশোধে এই বিশৃঙ্খলা, অনাগ্রহ ও চরম গাফিলতির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে । একই সাথে এখনো যেসকল শ্রমিক বেতন ও ঈদ বোনাস পাননি, তাদের বকেয়া বেতন ও বোনাস অনতিবিলম্বে পরিশোধের জন্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের মালিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছে।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আরএমজি খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর এবং নারী ক্ষমতায়নের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। তবে, বিশেষ করে ঈদের আগে বেতন বকেয়া থাকার যে পৌনঃপুনিক সংকট এই ধারাটি এখন বন্ধ হওয়া উচিত। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, নীতিগত প্রতিশ্রুতি এসেছে, শ্রম কমিশন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সুপারিশও দিয়েছে কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশের আরএমজি খাত বিশ্বব্যাপী যে সুখ্যাতি অর্জন করেছে তা কেবল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় নয়, বরং বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক ও বলিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। গত চার দশক ধরে এই খাত নিম্নলিখিত সুবিধাসমূহ ভোগ করে আসছে:
১. আর্থিক প্রণোদনা: সরাসরি নগদ সুবিধা (ক্যাশ বেনিফিট)-সহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা।
২. পরিচালন সুবিধা: ডিউটি ড্র-ব্যাক এবং স্পেশাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার।
৩. আর্থিক সুরক্ষা: ট্যাক্স হলিডে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ লিকুইডিটি সাপোর্ট, যেমন এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (EDF) এবং সাম্প্রতিক মজুরি-সহায়তা রিফাইনান্স স্কিম।
দশকের পর দশক ধরে শিশু শিল্প হিসেবে সুরক্ষা এবং পরিপক্ক পর্যায়ে ভর্তুকি পাওয়া সত্ত্বেও, এই খাতটি ক্রমাগত প্রকৃত মজুরি কমিয়ে রেখেছে। গত দশ বছরে শ্রমিক প্রতি উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়লেও, এই সমৃদ্ধিতে শ্রমিকের অংশ কমেছে। উৎসবের দিন আসার অনেক আগেই যদি একজন শ্রমিক তার পরিবারের জন্য খাবার বা নতুন পোশাক কিনতে না পারেন, তবে সেই ঈদের সার্থকতা কোথায়? শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেতন আটকে রাখার এই সংস্কৃতি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং মানবিক মর্যাদার ওপর চরম আঘাত। আমরা সেই অল্পসংখ্যক ভালো কারখানাগুলোকে স্বীকৃতি দিই যারা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, কিন্তু যে শিল্পের এখন পর্যন্ত একটি আদর্শ ও নৈতিক পেমেন্ট সাইকেল থাকা উচিত ছিল তা এখনও রাষ্ট্র তৈরী করতে পারেনি।
নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে:
প্রথমত, সকল বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস অবিলম্বে পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের প্রাপ্যকে বিলম্বিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয়ত, শ্রম কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে সরকারকে স্পষ্ট জবাব দিতে হবে। সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পরও যদি সমাধান বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে সেটি জবাবদিহিতার ব্যর্থতা।
তৃতীয়ত, নির্ধারিত সময়ে বেতন ও বোনাস পরিশোধে ব্যর্থ কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে কার্যকর এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে একই ধরনের লঙ্ঘন বারবার ঘটতে না পারে এবং দায়বদ্ধতার একটি বাস্তব কাঠামো তৈরি হয়।
চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তাকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে তা শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়। যারা নিয়মিতভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে, তাদের উৎসাহিত করা এবং যারা করছে না, তাদের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা এই দুইটি দিকই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি অর্থনৈতিক চাপ থাকতে পারে, কিন্তু সেই চাপ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে শ্রমিকদের ওপর স্থানান্তর করা যাবে না। একটি দায়িত্বশীল শিল্প ব্যবস্থার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় এই প্রশ্নে সংকটের সময় সে তার শ্রমিকদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারে।
এনপিএ মনে করে, এই প্রশ্নে এখন আর সাধারণ আহ্বান যথেষ্ট নয়। এই সংকটের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হলে স্পষ্ট নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দৃশ্যমান জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
আপনার মন্তব্য