সিলেটটুডে ডেস্ক

১৪ মে, ২০২৬ ০৮:৩৭

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমার আশঙ্কা করছে ফিচ রেটিংস

আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস জানিয়েছে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। সংস্থাটি এ কারণে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ডিফল্ট (আইডিআর) রেটিংয়ের আউটলুক বা ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি ‘ঋণাত্মক’ অনুমান করেছে। এতদিন বাংলাদেশের আউটলুক ‘স্থিতিশীল’ ছিল।

বুধবার (১৩ মে) হংকং থেকে বাংলাদেশের রেটিং নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফিচ।

ফিচ অবশ্য বাংলাদেশের রেটিং কমায়নি, বর্তমানের ‘বি প্লাস’ অপরিবর্তিত রেখেছে। ‘বি প্লাস’ রেটিং মানে বাংলাদেশ এখনও ঋণ পরিশোধে সক্ষম। তবে অর্থনীতি বাহ্যিক চাপের প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত ও নীতিগত দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ডিফল্ট রেটিং হলো কোনো দেশ, সরকার, ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতার মূল্যায়ন। আর রেটিংয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ‘ঋণাত্মক’ ধারণার মানে অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক ঝুঁকি বাড়লে বর্তমানের রেটিং কমার আশঙ্কা রয়েছে। রেটিং কমে গেলে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের খরচ বাড়তে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর আস্থা কমতে পারে।

রেটিং কমে যাওয়ার আশঙ্কার মূল কারণ হিসেবে ফিচ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়ন ও সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি বেড়েছে। এছাড়া নীতি কাঠামো, সরকারি অর্থায়ন ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটাতে সংস্কারের ধীরগতি এবং দীর্ঘস্থায়ী দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক শাসন ধাক্কা সামাল দিতে দেশের সক্ষমতাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করছে।

ফিচ বলেছে, বাংলাদেশের সরকারি ঋণের অংক তুলনামূলক মাঝারি এবং এখানে স্বল্পসুদে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। তবে বৈদেশিক তারল্য এখনও দুর্বল। তাছাড়া, শাসনব্যবস্থা সমমানের দেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কাঠামোগত সূচকগুলোও তুলনামূলক দুর্বল। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাব, অভ্যন্তরীণ সংস্কার বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা, দুর্বল ব্যাংক খাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি ইত্যাদি বাংলাদেশের রেটিংকে প্রভাবিত করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই ঝুঁকি বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। একই সময়ে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ বা ১০ বিলিয়ন ডলার এসেছে ওই অঞ্চল থেকে।

২০২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক অর্থনীতি কিছুটা সহায়তা পাচ্ছে। তবে সংঘাত কতদিন চলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

ফিচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় চার মাসের বৈদেশিক পরিশোধ ব্যয় মেটানোর সমান। এটি ‘বি’ ক্যাটাগরির দেশের মধ্যমমানের নিচে। ক্রলিং পেগ বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ধারাবাহিক অর্থায়ন রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমিয়েছে।

তবে চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচি অব্যাহত থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে মুদ্রা ও রিজার্ভ আবারও চাপে পড়তে পারে বলে মনে করে ফিচ।

ফিচের মতে, নতুন প্রশাসনের সংস্কার বাস্তবায়নের আগ্রহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ব্যাংক খাতের সুশাসন জোরদার ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বাড়ানোর মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সংস্কার পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া গণভোট-সমর্থিত সাংবিধানিক সংস্কার স্থবির হয়ে আছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদারের মতো বিষয় রয়েছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের কম্পোজিট গভর্ন্যান্স সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ‘বি’ ক্যাটাগরির দেশের গড় মানের চেয়েও কম।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত