১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:৪৯
ছবি: সংগৃহীত
অস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে তুমুল বিতর্কের মুখে পড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জোর গুঞ্জন উঠেছে। সরকার ও দলীয় উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গতকাল রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে দপ্তরে ডেকে নিয়ে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
এদিকে, পদত্যাগের নির্দেশের সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নিজের অবস্থান ও পোস্টের ধরন বারবার পরিবর্তন করেছেন ইশরাক হোসেন।
রোববার দিবাগত রাত (সোমবার) ১২টা ৩৫ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ইশরাক লেখেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে মন্ত্রিপরিষদের যে কোনো সদস্যের প্রতি পদত্যাগ অথবা অন্য যে কোনো নির্দেশ আসার সাথে সাথে সেটি কার্যকর করা প্রথাগতভাবে বাধ্যতামূলক অথবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা কার্যকর হয়ে যায়। অতএব এই সংক্রান্ত কোনো তথ্য তৃতীয়, চতুর্থ, অথবা আরো দূরবর্তী কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে যাচাই করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় অথবা আমার ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়া মাত্রই দ্রুততম সময়ে সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে বিস্তারিত জানানো হবে ইনশাআল্লাহ।”
এর ঠিক আড়াই ঘণ্টা আগে, রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে প্রতিমন্ত্রীর প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা স্বাক্ষরিত এক প্রতিবাদলিপি পোস্ট করা হয়। সেখানে পদত্যাগের নির্দেশনার খবরকে সম্পূর্ণ ‘অসত্য, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট’ দাবি করে বলা হয়, প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। একটি মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে।
তবে তারও আগে, রাত ৮টা ১৪ মিনিটে দেওয়া অপর এক ক্ষুব্ধ পোস্টে গণমাধ্যমগুলোর সমালোচনা করে ইশরাক লেখেন, কিছু গণমাধ্যম মাদকের আস্তানার অর্থায়নে পরিচালিত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বন্য পশুর মতো আচরণ করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখন থেকে বাশের লাঠি নিয়ে মাদকের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে এবং লাইসেন্সকৃত অস্ত্রের বদলে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার সূচনা হয় গত শনিবার বিকেলে। রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ইশরাক হোসেন। ওই সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে প্রতিমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে চিৎকার করতে এবং তাঁর সঙ্গীদের একজনকে মারধর করতে দেখা যায়।
একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও অভিযানে নামার আইনি এখতিয়ার নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। যদিও ইশরাক দাবি করেছেন, স্থানীয় পুলিশ ও নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে আত্মরক্ষার্থেই তিনি লাইসেন্সকৃত অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। তবে ওয়ারী বিভাগের পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, এই অভিযানের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী পুলিশকে আগে থেকে কিছুই জানাননি। ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তদন্ত শুরু করেছে।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীতে আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে সরকারের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার পরপরই বিকেলে ইশরাকের এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে সরকার ও দলের শীর্ষ পর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়।
দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই প্রধানমন্ত্রী এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এর আগে গত ১ অক্টোবর মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নাম আসায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করেছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। মিষ্টির পদত্যাগের আড়াই সপ্তাহের মাথায় ইশরাক হোসেনকে ঘিরে নতুন এই বিতর্কে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে ক্ষমতাসীন দল ও সরকার।
আপনার মন্তব্য