আমীর হামজা, হবিগঞ্জ:

২৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:১৬

সংঘাতের শঙ্কা নিয়ে হবিগঞ্জের ২০ ইউপিতে ভোট আজ

রাত পোহালেই হবিগঞ্জের লাখাই ও বানিয়াচং উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

রোববার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা চলবে ভোটগ্রহণ। ইতিমধ্যে নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক আনসার, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব। দুই উপজেলার চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১০২ জন। এর মধ্যে লাখাইয়ে ৩৩ জন ও বানিয়াচংয়ে ৬৯ জন প্রার্থী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে অনেকটা কোনঠাসা অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ইতিমধ্যে লাখাইয়ে ১৪ জন ও বানিয়াচংয়ে ১৭ জন নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। গত ১৫ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু জাহির এমপি ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক পত্রে তাদের বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়।

নির্বাচন ঘিরে উৎকন্ঠায় ভোটাররা

লাখাই ও বানিয়াচং উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বিরাজ করছে। ইতিমধ্যে লাখাইয়ে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া নির্বাচনের দিন সহিংসতা এড়াতে বানিয়াচংয়ে বিভিন্ন গ্রাম থেকে দেশিও অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।

এই দুই উপজেলার মধ্যে বানিয়াচং দাঙ্গা প্রবণ এলাকা। ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনকে নিয়ে অনেকটা শঙ্কা কাজ করছে। তবে যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের কড়া নজরদারি রয়েছে।

নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাতের শঙ্কা রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। কারণ, প্রচারণার-প্রচারণার সময় প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ও একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমিয়েছেন। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে একাধিক স্থানে। নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন গ্রামে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়েছে।

তবে পুলিশ বলছে, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে কঠোর প্রশাসন। নির্বাচনে সব ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নেওয়া হয়েছে ব্যপক প্রস্তুতি। এরই অংশ হিসেবে গ্রামে গ্রামে অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার অভিযান ও বিট পুলিশিং সভা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে প্রার্থীদের সাথে মতবিনিময় সভা করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্যমতে ইতিমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অভিযান চালিয়ে ২ হাজার ৭০০ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে টেঁটা, ফিকল, ঢাল, রাম দা, ছুরি। শুধুমাত্র চলতি মাসেই বিপুল পরিমাণের এই অস্ত্র উদ্ধার করা হেয়ছে। এর মধ্যে গত ২১ ডিসেম্বর মুরাদপুর ইউনিয়নের তালেবপুর, রহমতপুর, শাহাজালাল পুর ও মুরাদপুর গ্রাম থেকে ৫০০ অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। ২০ ডিসেম্বর মক্রমপুর ইউনিয়নের পুরান পাথারিয়া ও সাকিনে অভিযান চালিয়ে ৫০০ টেঁটা, ফিকল, লাঠি উদ্ধার করা হয়। এর আগে, গত ১৩ ডিসেম্বর পৈলারকান্দি ইউনিয়নের শুধুমাত্র পৈলারকান্দি গ্রাম থেকেই প্রায় ১ হাজার ৫০০ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

অন্যদিকে গত ১১ ডিসেম্বর রাধাপুর, মনপুর, বড়কান্দি গ্রাম থেকে উদ্ধার হয় ২ শতাধিক অস্ত্র। দুর্গম এলাকা হওয়ায় মক্রমপুর, সুজাতপুর, মন্দরী ও পৈলারকান্দি ইউনিয়ন অত্যন্ত ঝুঁকিপর্ণ। এই ইউনিয়নগুলোর প্রতিটি ঘরেই রয়েছে দেশীয় অস্ত্র। প্রতি বছরই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যেখানে ব্যবহার হয় এই দেশীয় অস্ত্রগুলো।

চারটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ গ্রামগুলো থেকে অস্ত্র উদ্ধার করলেও এখনও বিভিন্ন বাড়িতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র। অবশ্যই পুলিশ প্রশাসনও সেই বিষয়টি অস্বীকার করেনি। যে কারণে এই ইউনিয়নগুলোর প্রতিটি কেন্দ্রকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।

বানিয়াচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এমরান হোসেন বলেন, ‘মক্রমপুর, সুজাতপুর, মন্দরী ও পৈলারকান্দি ইউনিয়ন অত্যন্ত দুর্গম এলাকা। এখানের যাতায়াত ব্যবস্থা একদম ভালো না। যে কারণে ইউনিয়নগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউনিয়নগুলোর গ্রামের গ্রামে অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ওই ইউনিয়নগুলোর প্রতিটি কেন্দ্রেই বিপুল পরিমাণ আনসার, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।’

গত ২২ ডিসেম্বর রাতে লাখাই উপজেলার মোড়াকড়ি ইউনিয়নে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক লোকজন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ১৫০ রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। সংঘর্ষের সময় বাড়ি ঘরে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

জেলা পুলিশ জানিয়েছে, লাখাইয়ের ৬ ইউপিতে ৫৫ ও বানিয়াচংয়ের ১৪টিতে ১৩১ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। কেন্দ্রগুলোর প্রায় ৫০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। দুই উপজেলায় ১৮৬ কেন্দ্রে ১ হাজার ২০৮ জন পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে তিন স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে ১৬ জন করে আনসার ভিডিপি সদস্য দায়েত্ব পালন করবেন। এ বাহিনীর ২ হাজার ৯৭৬ সদস্য দুই উপজেলায় নিযুক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া বানিয়াচংয়ে ৩ প্লাটুন ও লাখাইয়ে ২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, লাখাই উপজেলায় ৪ জন ও বানিয়াচংয়ে ১১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে থাকবেন। এছাড়া দায়িত্বে রয়েছেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও।

নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, লাখাই উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৭৭ জন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৩৫৫ প্রার্থী। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৩৩, সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য ৮৩ ও সাধারণ ওয়ার্ড সদস্যের পদে ২৩৯ জন। বানিয়াচং উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ। ৩০ হাজার ১৪৬ জন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৮৩১ প্রার্থী। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৬৯, সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য ১৮৪ ও সাধারণ ওয়ার্ড সদস্যের পদে ৫৭৮ জন।

এ বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সাদেকুল ইসলাম বলেন, ‘সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবধরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে নিরাপত্তা বেষ্টনী। প্রতিটি কেন্দ্রে পুলিশ থাকার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকছে। এই তিন স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরেও পুলিশ কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করবেন।’

নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন।

বানিয়াচং সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) পলাশ রঞ্জন দে বলেন, ‘উপজেলার সকল ইউনিয়নে বিট পুলিশিং সভা করা হয়েছে। এসব সভায় নির্বাচনী আচরণবিধি বিষয়ে সচেতনতা তৈরী, গুজব-অপপ্রচার বন্ধসহ অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রার্থীদের যত অভিযোগ-অনুযোগ ছিল সবকিছুই নিষ্পত্তি করা হয়েছে। নির্বাচনে যেন তারা সংঘাত-সংঘর্ষে না জড়ান সে জন্য তাদের সাথে আলোচনা হয়েছে।’

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার এসএম মুরাদ আলী বলেন, ‘নির্বাচনে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেওয়া হয়েছে। কোনো অনিয়ম করতে দেওয়া হবে না। অনিয়ম করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, ‘ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারবে। নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। কোনো অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। ব্যালেট পেপারে দিকে কেউ হাত দিলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত