জাহাঙ্গীর আলম ভুঁইয়া, তাহিরপুর:

১৪ জুলাই, ২০২২ ২৩:১৯

টাংগুয়ায় ‘ডিজে পার্টি’, পানিতে ভাসছে প্লাস্টিক বর্জ্য

সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার কারণে হাওরাঞ্চলের মানুষের মনে কোরবানি ঈদের আনন্দ নেই। বেশিরভাগ দুর্গত মানুষ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তারা ক্ষতচিহ্ন বুকে নিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে ঈদকে সামনে রেখে পর্যটক ও স্থানীয় ভ্রমণপিপাসুরা নদ-নদী দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্সে গান বাজিয়ে নাচানাচি করে টাংগুয়ার হাওরে গিয়েও ঈদ আনন্দের নামে প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসে মেতেছে উঠেছেন।

খবর পেয়ে গত মঙ্গলবার বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টাংগুয়ার হাওর ও আশপাশের নদীতে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবিরের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ২২টি নৌযানকে ৩৮ হাজার টাকা জরিমানা ও সতর্ক করেছেন। কিন্তু এর পরও থামছে না আনন্দ উদযাপনের নামে হাওরের পরিবেশ বিধ্বংসী অপকর্ম।

এমন কার্যক্রমের কারণে পর্যটকরা হাওরের জন্য আশীর্বাদ, না অভিশাপ- এমন প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।

টাংগুয়ার হাওরপারের বাসিন্দা মাসুক মিয়া ও আলী আহমদ মুরাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন শব্দ দূষণের দায়ে জরিমানা ও সচেতন করল। তার পরও একইভাবে উচ্চ শব্দে আজ (বুধবার) সাউন্ড বাজিয়ে হাওরপারের অসহায় মানুষগুলোকে অতিষ্ঠ করার সাহস পায় কীভাবে।

এদিকে প্রচণ্ড গরমে শিশু, বৃদ্ধসহ অনেকেই জ্বর, সর্দি-কাশিতে ভুগছে নিজ নিজ বাড়িতে। উচ্চ শব্দে গান বাজানোর কারণে এসব রোগী ভুগছেন অস্বস্তিতে। এ ছাড়া নির্ধারিত রুট থাকলেও আনন্দ উদযাপন করতে আসা তরুণরা এলোমেলো রুটে নৌকা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পর্যটকদের সহনশীল আচরণ না থাকায় হাওরপারের দুর্গত মানুষ তাদের অভিশাপ হিসাবেই দেখছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঈদের দিন থেকে শত শত ইঞ্জিনচালিত অত্যাধুনিক নৌকা নিয়ে হাওর ভ্রমণ করছেন পর্যটকরা। এ সময় উচ্চ শব্দের সাউন্ড বক্স বাজিয়ে নাচানাচি করে নদীপথ দিয়ে হাওরে ছুটছেন তারা। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে প্লাস্টিকের পানির বোতল, তালা ও পলিথিনের ব্যাগসহ বিভিন্ন সামগ্রী। ব্যবহারের পর এগুলো তারা হাওরেই ফেলে দিচ্ছেন। সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় বিশ্ব ঐতিহ্য বা রামসার সাইট টাংগুয়ার হাওর। এ হাওরে রাত যাপনকারী পর্যটকরা তাদের উচ্ছিষ্ট খাবার, মলমূত্র, পানির বোতল, পলিথিন, নৌকার ডিজেলসহ সব কিছু হাওরের পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। এতে নষ্ট হচ্ছে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ও রুবেল মিয়া বলেন, আশঙ্কাজনক হারে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, ইঞ্জিন নৌকার ডিজেল হাওরে ফেলা এবং ইঞ্জিনের শব্দ দিন দিন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসী। এর মধ্যে সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে উচ্চ শব্দের সাউন্ড বক্স বাজিয়ে নদীপথ দিয়ে হাওরে যাওয়া বানভাসিদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

নদী পারের বাসিন্দা আরিফুর রহমান ও আজিজ মিয়া বলেন, ঈদ মানেই আনন্দ, কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত। সেই ক্ষতি কাটিয়ে এখনো উঠতে পারিনি। এমন সময় আনন্দ-ফুর্তির নামে নৌকা নিয়ে চলাচলের কারণে ঢেউয়ে নদী পারের বসতবাড়ি হুমকিতে পড়ছে। উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে নাচানাচি পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টাংগুয়ার হাওর পাড়ের জমিরউদ্দিন ও শফিক মিয়া জানান, বন্যায় সব শেষ। কোনো রকম জীবন নিয়ে বেঁচে আছেন। ঈদের আনন্দ নেই। আর পর্যটক ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন নৌকা নিয়ে হাওরে এসে আমাদের কষ্টের মধ্যে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে নাচানাচি করছে। আর আমরা জীবন-জীবিকার সন্ধান করছি। প্রচণ্ড শব্দের কারণে ঘরে টিকে থাকা এখন দায়। এ ছাড়া প্লাস্টিকের থালা, পানির বোতল ফেলে পরিবেশ ধ্বংসে মেতে উঠেছেন পর্যটক নামের তরুণরা।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির জানান, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্সে গান বাজিয়ে ও হাওরের ক্ষতি হয় এমন প্লাস্টিকের জিনিসপত্র ফেলে দেওয়ার কারণে ২২টি ইঞ্জিনচালিত নৌকাকে ৩৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সতর্কও করা হয়েছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। বন্যার কারণে হাওরে এখনো নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। এর পরও যারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাওরে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত