১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ২০:০৭
বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রের ছায়ায় পরিচালিত অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির উত্থান—সবকিছু মিলিয়ে সন্ত্রাসবাদ আজ নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাম গণহত্যা এই অমানবিক প্রবণতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ, যা কেবল একটি অঞ্চলের নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
পহেলগামে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিরীহ মানুষকে আলাদা করে হত্যা করা হয়, যা সভ্যতার সকল মানদণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করে। এই ঘটনায় একজন বিদেশি নাগরিকসহ ২৬ জন পর্যটকের নির্মম মৃত্যু ঘটে। এই হামলার দায় স্বীকার করে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (TRF), যা মূলত পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার একটি শাখা। উল্লেখযোগ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই এই সংগঠনকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে এটির কার্যক্রম কেবল আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই হামলার সময়টি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জম্মু ও কাশ্মীর তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, নির্বাচন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন একটি সময়ে এই ধরনের হামলা স্পষ্টতই সাধারণ মানুষের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করার জন্য পরিকল্পিত। এটি গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত, যা উন্নয়নের গতিকে থামিয়ে দিতে চায়।
পহেলগাম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের ২৮শে জুলাই শ্রীনগরের উপকণ্ঠে অভিযানে জড়িত তিন পাকিস্তানি সন্ত্রাসীকে নির্মূল করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা পরিচয়পত্রে দেখা যায়, মূল পরিকল্পনাকারী হাবিব তাহির পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের বাসিন্দা। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সীমান্তের ওপারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত রয়েছে।
তবে সন্ত্রাসবাদের রূপ আজ আর আগের মতো সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন প্রযুক্তিনির্ভর, সংগঠিত এবং অনেক বেশি জটিল। ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থায়ন ও সমন্বয় করা হচ্ছে, যা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার প্রচলিত কৌশলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
উগ্রবাদের বিস্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পাকিস্তানে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন নতুন নামে এবং নতুন কৌশলে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠছে। জৈশ-ই-মোহাম্মদ নারী সদস্য সংগ্রহের জন্য ‘জামায়াত-উল-মুমিনাত’ নামে আলাদা শাখা গঠন করেছে, যা সমাজের একটি নতুন স্তরে উগ্রবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, লস্কর-ই-তৈবা সমুদ্রপথে হামলার জন্য ‘ওয়াটার উইং’ তৈরি করেছে, যা সন্ত্রাসবাদের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতির প্রতিফলন স্পষ্ট। ২০২৬ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে পাকিস্তানকে এখনও সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছর মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান বহু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে। এই তথ্যগুলো আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে আরও জোরালো করে তোলে।
এছাড়া, পাকিস্তান থেকে ছড়িয়ে পড়া সন্ত্রাসবাদের প্রভাব এখন বিশ্বজুড়ে দেখা যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক হত্যার ষড়যন্ত্র, নিউইয়র্কে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার চেষ্টা এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় জঙ্গি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গ্রেপ্তার—এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসবাদ এখন সীমান্ত মানে না। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে ক্রমাগত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে, বিশ্ব সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সর্বোপরি একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ঐক্য। পাশাপাশি, উগ্রবাদ প্রতিরোধে শিক্ষা, সচেতনতা এবং সামাজিক উদ্যোগেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, সন্ত্রাসবাদ আজ মানবসভ্যতার অন্যতম বড় শত্রু। এটি শুধু প্রাণহানি ঘটায় না, বরং সমাজের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং শান্তিকে ধ্বংস করে দেয়। পহেলগামের মতো ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। নইলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনিশ্চিত পৃথিবী রেখে যাবে।
আকাশ চৌধুরী : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।
আপনার মন্তব্য