শাকিলা ববি

১৭ নভেম্বর, ২০২৪ ১৬:৫৯

সিলেটে ‘পিপিকে টাকা দিতে হয় না’!

সিলেট আদালতে পিপির দরজার সামনে নোটিশ

সিলেটের আদালত এলাকায় পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) দাপ্তরিক কক্ষের দরজা। প্রথম দৃষ্টি যেখানে পড়ে, ঠিক সেখানেই লেখা, ‘পিপিকে টাকা দিতে হয় না।’

দপ্তরে ঢোকার মুখে এমন সতর্কীকরণের কী কারণ? এ বিষয়টি প্রত্যক্ষ করে এ প্রশ্নে আশপাশ তাকাতেই দেখা মেলে কয়েকজনের। তারা আইনি সেবা প্রত্যাশী। মুখে অনুযোগ ভরা কথাবার্তা। বলছিলেন একে অপরকে। আগে নাকি কোনো মামলার আসামির জামিন আবেদনেও পিপিকে টাকা দিতে হতো। মামলার সাক্ষী হাজির হবে, পিপিকে টাকা দিতে হয়েছে। মামলা সংক্রান্ত যেকোনো কাজেই বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষর কাছ থেকে টাকা নেন পিপি। এতে করে প্রতিটি মানুষই জানতেন পিপিকে টাকা দেওয়া নিয়ম। অথচ বাদী-বিবাদী কোনো পক্ষ থেকেই পিপিকে টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই।

বিগত সময়ে দায়িত্বরত পিপিরা টাকা গ্রহণ করলেও নিজেকে মুক্ত রাখতে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আশিক উদ্দিন আশুক ব্যতিক্রমী এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। আদালতে তার চেম্বারের মূল দরজায় সাইনবোর্ডের মতো করে লিখে রেখেছেন, ‘পিপিকে টাকা দিতে হয় না’।

মো. আশিক উদ্দিন সিলেটে একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী । আইনপেশার পাশাপাশি তিনি জেলা বিএনপির সহসভাপতি পদে আছেন। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। গত ৩ নভেম্বর তিনি পিপি হিসেবে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে নিযুক্ত হন। আদালতে পিপির চেম্বারে বসে দায়িত্ব পালনের কিছু দিন পরই দরজায় সাঁটিয়ে দেন ‘পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) কে টাকা দিতে হয় না। দয়া করে পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) নামে কাহারো নিকট টাকা দিবেন না।’ পিপির দরজায় এ কথা লেখা দেখে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি আগের পিপিরা নিয়ম বহির্ভূতভাবে টাকা নিতেন?

জানা গেছে, প্রতিটি জিআর মামলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বাদী। এবং এসব মামলার প্রতিনিধিত্ব করেন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি)। এর জন্য সরকার পাবলিক প্রসিকিউটরকে সম্মানি দেয়। এর বাইরে বাদী বিবাদী কারো কাছ থেকেই পিপির টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে মানা হয়নি এই নিয়ম। তাই সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নতুন পিপির এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন আদালতে সেবা নিতে আসা মানুষজন ও আইনজীবীরা।

নতুন পিপির এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন আইনজীবীরা। সরাসরি তাকে অভিনন্দিত করছেন অনেকে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দরজার লেখা ছবি দিয়ে সাধুবাদ জানিয়েছেন আইনজীবীসহ বিভিন্ন সংস্থা। সিলেট বারের আইনজীবী রেজাউল করিম খান তার ফেসবুকে ‘লইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ.কম’নামের একটি সংস্থার প্রকাশ করা পিপির দরজার ছবি পোস্ট করেন। সংস্থার আইডিতে গিয়ে দেখা গেছে, ‘সব জেলায় একই ঘোষণা চাই’এমন মন্তব্য করেছেন অধিকাংশ। ঘন্টাখানেক সময়ের মধ্যে পোস্টটি শেয়ার হয়েছে শতাধিক।  

আদালতপাড়ায় কথা হয় সিলেট জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ সাঈদ আহমদের সঙ্গে। এ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কিন্তু খুব ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন করেছেন তিনি (পিপি)। আমার ১৩ বছরের আইনজীবী ক্যারিয়ারে এরকম কখনো দেখিনি যে কোনো পিপির দরজায় লেখা আছে টাকা লাগবে না বা টাকা নেন না। যারা আইনি সেবা নিতে আসেন তাদেরকে জানানো যে পাবলিক প্রসিকিউটর রয়েছেন তারা ই-লিগ্যাল কোনো কিছু গ্রহণ করেন না। একজন পিপির এই নীতিতে অটল থাকা অবশ্যই আমাদের আইনি সেবা প্রত্যাশীদের জন্য যেমন ভালো, আইন পেশার জন্যও ভালো।’

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রায় এক দশক একটানা পিপির দায়িত্বে ছিলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। এরপর পিপির দায়িত্ব পালন করেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নিজাম উদ্দিন। টানা দায়িত্ব পালনকালে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের সময় রয়েছে নানা অভিযোগ। এ সময়কে এড়িয়ে যেতেই পিপির দরজায় এই সতর্কীকরণ বলে জানিয়েছেন আইন পেশায় থাকা বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা।

পিপির দরজায় লেখা না থাকলে কী হতো? এমন প্রশ্নে আইনি সেবা নিতে আসা আছনাত উদ্দিন জাহিন বলেন, ‘পিপি সাহেবকে যে টাকা দেওয়া লাগে না, সেটা আগে মানুষ জানত না। দরজায় নোটিশ লাগানোর কারণে সবাই জানতে পারছে।  আমি সিলেটের সাধারণ মানুষ হিসেবে মনে করি পিপি সাহেবের এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সিলেটসহ সারা দেশে এরকম উদ্যোগ কখনো কেউ নেয়নি।  আমরা এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।’

সরকারি কৌঁসুলির দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে মো. আশিক উদ্দিনের। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সিলেট নারী নির্যাতন আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে সিলেট এডিএম কোর্টের অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর ছিলেন। পিপির চেম্বারে বসে কথা হয় তার সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকার পতনের পরই আমি পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হয়েছি। শত শত তরুণ , শিশু এই আন্দোলনের সময় শহিদ হয়েছে। এই শহিদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সিলেটের পিপি হয়ে আমি কি এই নির্যাতিত মানুষের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করব?। এই টাকা গ্রহণ করার জন্য কি সরকার আমাকে নিয়োগ দিয়েছে? সিলেটের আইনজীবীরা যারা আমাকে আন্দোলন করে এই পদে বসিয়েছেন সেই আন্দোলনকে মূল্যায়ন করার জন্য ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শহিদদের প্রতি কর্মের মাধ্যমে যথাযথ সম্মান জানাতে আমার অবস্থান থেকে ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।’
 
উল্লেখ্য, গত ১৬ অক্টোবর নতুন করে সিলেটের সব আদালতে ১০৩ জন পাবলিক প্রসিকিউটর, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয় আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি করা হয় সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এটিএম ফয়েজকে। এ নিয়োগ বাতিলের দাবিতে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ব্যানারে সিলেট বারের আইনজীবীরাও ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। বিগত দিনে বেনিফিশারিদের অপসারণ দাবি করে তারা বিক্ষোভ করেন। পিপির কক্ষে তালাও ঝুলিয়ে দেন। এ অবস্থায় আন্দোলনের মুখে ওই নিয়োগ বাতিল নতুন পিপি হিসেবে মো. আশিক উদ্দিনকে নিযুক্ত করা হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত