১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২১:২৪
সিলেট নগরীর ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি । নগরীতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমন্বয়ে একটি বড় আকারের স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করা হবে। পুরাতন স্বেচ্ছাসেবক টিম পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় রয়েছে সেসব ভবন ভেঙে ফেলতে হবে।
বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
সিলেটে ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও আমাদের প্রস্তুতি শীর্ষক উক্ত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ও এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুশতাক আহমদ। মূল প্রবন্ধে ড. মুশতাক বলেন, সিলেট অঞ্চল, বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্প-প্রবণ এলাকায় অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে ১৮৬৯ সালের কাছাড় ভূমিকম্প, ১৮৯৭ সালের গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্প ইত্যাদি সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। নয় মাত্রার একটা ভূমিকম্প হলে সিলেটের অর্ধেকের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে উল্লেখযোগ্য প্রাণ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে সিলেট শহরের পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কগুলো ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, সিলেটের অধিকাংশ ভবন নিম্ন থেকে মধ্যম উচ্চতার এবং অনেক ভবন বিল্ডিং কোড প্রণয়নের আগের বা প্রকৌশল নকশাবিহীন। কাঠামোগত অনিয়ম এবং অপর্যাপ্ত ভূমিকম্প নকশা ভবনগুলোর সাধারণ দুর্বলতা। বাংলাদেশের অতীত ভবন ধসের ঘটনাগুলো অপরিকল্পিত নির্মাণের ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরে।
বাপা সিলেটের সভাপতি জামিল আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা'র সঞ্চালনায় উক্ত সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর। সেমিনারে সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাপা সিলেটের সহ-সভাপতি আইনজীবী এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদ্মাসন সিংহ। বক্তব্য রাখেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর আবুল কাশেম, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রযুক্তির অনুষদের ডিন মুক্তারুন ইসলাম, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকরামুল কবির, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বাপা সিলেটের সহ-সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, বাপা সিলেটের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ ভাস্কর রঞ্জন দাস, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রুহুল আলম খান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আবু জাফর, আইএবি এর সাধারণ সম্পাদক ও বাপা সিলেটের সহ-সাধারণ সম্পাদক স্থপতি রাজন দাস, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের , সিভিল ও এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এইচ এম এ মাহফুজ,স্থাপত্য বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুব্রত দাশ , ফায়ার সার্ভিস সিলেটের উপ সহকারি পরিচালক মোঃ কুতুব উদ্দিন, পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক বনানী দাস, তথ্য অধিদপ্তরের তথ্য কর্মকর্তা আকিকুর রেজা, সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ ফাহিমা জুন্নুরাইন, আম্বরখানা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ জমির উদ্দিন, সিলেট ভয়েসের প্রকাশক সেলিনা চৌধুরী, সুনামগঞ্জ সমিতি সিলেট এর সহ-সভাপতি অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বাবর ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পিযুষ পুরকায়স্থ টিটু, বাপা সিলেটের কোষাধ্যক্ষ জাফর সাদেক শাকিল, সহ-সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডক্টর নাসরীন সুলতানা লাকী ও ফয়জুর রহমান, কার্যকরী কমিটির সদস্য সাংবাদিক ফারুক আহমেদ, কবি আয়েশা মুন্নি, অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান , লেখক মোঃ আব্দুল হক, গোলাম সারওয়ার, সহকারী অধ্যাপক দিলশাদ মিয়া, অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।
সেমিনারে আলোচকরা সিলেট শহরের ভূমিকম্প ঝুঁকি ও প্রস্তুতি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বিভিন্ন পরামর্শ তুলে ধরেন। গবেষকরা জানান আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী সিলেটের বহু আরসিসি ও নন-ইঞ্জিনিয়ার্ড ভবন মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার ভঙ্গুরতার মধ্যে পড়ে। বিদ্যালয় ভবনগুলোর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি বিদ্যমান, যেখানে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভবন মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। গবেষণায় বড় আঞ্চলিক ভূমিকম্প, স্থানীয় ফল্টজনিত ভূমিকম্প এবং শহরের নিচে সংঘটিত অগভীর ভূমিকম্প বিবেচনা করা হয়েছে। বলা হয় দুর্বল মাটি, অগভীর ভূগর্ভস্থ পানি এবং তরলীকরণের সম্ভাবনা ভূকম্পনকে আরও তীব্র করে তোলে।
মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া , সঠিক মাটি পরীক্ষা, ভিত্তি নকশা, উন্নত নির্মাণ উপকরণ ও বিশেষ ভূমিকম্প ডিটেইলিং অপরিহার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশেষে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নগর পর্যায়ের প্রস্তুতি পরিকল্পনা, বিদ্যমান ভবনের ভঙ্গুরতা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রেট্রোফিটিং বা ভাঙনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ভূমিকম্প ক্ষতি হ্রাসের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আপনার মন্তব্য