০৪ এপ্রিল, ২০১৬ ১৯:৪৯
'মুক্তিযুদ্ধের সময় চিত্রনায়িকা কবরী গেছেন ভারতে। শরণার্থী হিসেবে উঠেছেন আগরতলার একটি হোটেলে। সেসময় তিনি সেখানেও তুমুল জনপ্রিয়। কবরীকে দেখতে হোটেলে ভিড় লেগে গেছে। হোটেল মালিক দেখলেন, তার ব্যবসা লাটে উঠার দশা। ফলে তিনি উদ্যোগী হয়ে কবরীকে একটি বাসায় রেখে আসেন। সেই বাসার লোকজন এক কাপড়ে যাওয়া কবরীকে আশ্রয় দেন। এভাবে ত্রিপুরায় তখন এদেশের ১৮ লক্ষ মানুষ আশ্রয় পেয়েছিলেন'
- মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অবদান নিয়ে এই গল্প শোনালেন ফজলুল বারী। তিনিও আগরতলার সেই সময়ের এক প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে গল্পটা শুনেছেন।
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারী সম্প্রতি সংক্ষিপ্ত সফরে দেশে এসেছেন। তারচেয়েও সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এসেছেন সিলেটে। সোমবার সকালে তাকে ঘিরে আড্ডার আয়োজন করে সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর।
নগরীর জিন্দাবাজারে সিলেটটুডে কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই জম্পেশ আড্ডায় মুক্তিযুদ্ধ থেকে ক্রিকেট, উগ্রবাদ থেকে উন্নয়ন, রাজনীতি থেকে অর্থনীতি কিংবা সাংবাদিকতা, ভ্রমণ- এমন নানা বিষয়ে কথা হয়।
আড্ডা বলতে ফজলুল বারীই বক্তা। বাকি সকলেই শ্রোতা। নিজের সাংবাদিকতা জীবনের গল্প, পায়ে হেঁটে ১৮ মাসে দেশের ৩৬৫ উপজেলায় দেশভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীর বিচার, শহিদ জননী জাহানারা ইমামের স্মৃতিসহ নানা বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন বারী।
আড্ডায় সিলেটটুডে পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি বাপ্পা ঘোষ চৌধুরী দেশকে কেমন দেখছেন জানতে চাইলে ফজলুল বারী বলেন, 'বিদেশে গিয়ে লোকজন কেবল দেশের বদনাম করে। কিন্তু আমি তো দেশে এসে দেখি অনেক উন্নতি। গর্ব করার মতো অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অনেককিছু বদলে গেছে।'
তিনি বলেন, "এখনকার তরুণরা এখন অনেক স্মার্ট। তারা অনেক কৌতূহলী। সব বিষয়েই তারা প্রশ্ন করে। জানতে চায়। আমরা এতটা স্মার্ট ছিলাম না। এখানকার তরুণরা একটা স্মার্টফোন দিয়েই অনেক বড় বড় কাজ করে ফেলছে।"
সমকালের সিলেট ব্যুরো প্রধান চয়ন চৌধুরী বর্তমান সাংবাদিকতার মান বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমাদের সমস্যা হচ্ছে এখন আমরা পড়াশোনা কম করি। সকল পেশার মানুষের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। সাংবাদিক থেকে রাজনীতিক, আমলা থেকে শিক্ষক- কেউ তেমন পড়াশোনা করি না। নিজের অবস্থান নিয়েই যেনে আমরা সকলে সন্তুষ্ট। এই সন্তুষ্টিটা উন্নতির জন্য ক্ষতিকর। মানুষ নিজের অবস্থানে সন্তুষ্ট হয়ে পড়লে সে আর এগোতে পারবে না।"
তরুণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'এখন সাংবাদিকতা আর পার্টটাইম পেশা না। তাই এই পেশায় টিকতে হলে যোগ্যতা দিয়েই টিকতে হবে। এজন্য প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। নিজেকে সবসময় আরও উন্নত করার প্রচেষ্টা থাকতে হবে।'
সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সংগ্রাম সিংহ দেশভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে জানতে চাইলে ফজলুল বারী বলেন, 'আমি পর্যটক হতে চেয়েছিলাম। দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে সাংবাদিক হয়ে গেছি।'
পায়ে হেঁটে সারাদেশ ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বারী বলেন, "একবার শান্তিবাহিনী আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলে। আমার চোখ, হাত-পা বেঁধে গহীন জঙ্গলে আটকে রেখেছিলে। কিন্তু পর্যটক বুঝতে পেরে কয়েক ঘণ্টা পরে তারা আমাদের ছেড়ে দেয়।"
সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরের প্রধান সম্পাদক কবির য়াহমদ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মৌলবাদি অবস্থা নিয়ে প্রসঙ্গ তুললে তিনি বলেন, "আমরা যখন যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে লেখালেখি করতাম, কথা বলতাম, তখন লোকজন আমাদের নিয়ে হাসতো। বাস্তবতা বিবর্জিত বলতো। আমরাও আশা করতাম, একদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে, কিন্তু মন থেকে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু আজকে তো বিচার হচ্ছে। কয়েকজনের দণ্ডও কার্যকর হয়েছে।"
মৌলবাদ ও উগ্রবাদীদের বিস্তার সম্পর্ক তিনি বলেন, "৪৭-এর দেশবিভাগ থেকেই এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের ভিত্তিতেই সমস্যা ছিল। এর কুফল আমরা ভোগ করছি।"
তিনি বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠার রাষ্ট্র ভেঙে আমরা নতুন দেশ গড়লেও মুক্তিযুদ্ধের আগে ধর্মনিরেপক্ষতার বিষয়টি ছিলে না। আমরা এটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছিলাম। কিন্তু '৭৫-এর পট পরিবর্তনের কারণে সেই অর্জনটাও ধরে রাখতে পারিনি।
আড্ডায় আরও উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথপুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তাদির আহমদ মুক্তা, কালের কণ্ঠের স্টাফ রিপোর্টার ইয়াহইয়া ফজল, সমকালের ফটো সাংবাদিক ইউসুফ আলী, যুগভেরীর ফটো সাংবাদিক রণজিৎ সিংহ, ডেইলি স্টারের সিলেট প্রতিনিধি দ্বোহা চৌধুরীসহ সিলেটটুডে পরিবারের সদস্যরা।
আপনার মন্তব্য