০৯ এপ্রিল, ২০১৬ ১৬:০৮
রাজ্যে নেই কোনও রাজা, তাই জৈন্তা রাজ্যের এমন বেহাল দশা। সিলেট থেকে জাফলং যাবার পথে জৈন্তাপুর বাজারের পাশেই বিস্তৃত জায়গা জুড়ে খন্ড খন্ড অংশ জুড়ে রয়েছে জৈন্তা রাজবাড়ির নিদর্শন। বিশ্বের ইতিহাসের প্রথম নারী রাজ্য ও ভারত উপমহাদেশের শেষ স্বাধীন রাজ্য ছিল জৈন্তাপুর। কৃষক রাজ বংশ, পৌরহিত রাজ বংশ, খাসিয়া রাজ বংশের রাজারা বিভিন্ন মেয়াদে এই রাজ্যে রাজত্ব করেন। এক সময়ের রাজা, রানী, দাস-দাসী, প্রজায় ভরপুর জৈন্তা রাজ্য বর্তমানে সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলা। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ছড়িয়ে আছে জৈন্তা রাজ্যে ঐতিহাসিক সব স্থাপনা।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদাসীনতা ও স্থানীয় প্রভাবশালী দখলে ধ্বংসের পথে জৈন্তা রাজ্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহ। জৈন্তারাজ্যের রাজ দরবারে এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মিটিং সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক বেনার, ফেস্টুনে ছেয়ে আছে জৈন্তা রাজদরবার। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দখল হচ্ছে এ ঐতিহাসিক স্থান। ঐতিহাসিক এ রাজ্য যে হারে দখল হচ্ছে, অতিসত্বর সরকার তা সংস্কার ও সংরক্ষণে না করলে কিছুদিন পর জৈন্তা রাজ্যের কোনও স্মৃতি চিহ্ন থাকবে না জৈন্তাপুর উপজেলায়।
জানা যায়, প্রায় পঁচিশ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে কিছু লোকজন এসে সীমানা চিহ্নিত করে স্থাপনা গুলোর আশেপাশে তার কাটার বেড়া দিয়ে যায়। প্রায় দশ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে একজন পরিচারক নিয়োগ দেয়া হয় ঐ স্থানটি সংরক্ষণের জন্য। এলাকাবাসীর অভিযোগ আছে, সে কোনও কাজ না করে সংরক্ষণের নামে প্রতি মাসে দশার টাকা নিচ্ছে সরকার থেকে। তার নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে জৈন্তাপুর রাজবাড়ি আরও ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
জৈন্তাপুরে গিয়ে দেখা গেছে, স্থাপনাগুলোর আশপাশের বেশিরভাগ জায়গা এখন প্রভাবশালীদের দখলে। এমনকি দখল করে নিজেদের প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে স্থাপনার বিভিন্ন অংশ বিশেষ ভেঙ্গে ফেলছে দখলদাররা। সরজমিনে দেখা গেছে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজ দরবারের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মূল্যবান মেগালিথিক পাথর। ঐতিহাসিক এ জায়গায় গড়ে উঠেছে সরকারী, বেসরকারি বিভিন্ন স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। যেকোনো সাধারণ মানুষ জৈন্তাপুর গিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে প্রভাবশালীরা কিভাবে বিভিন্ন নামে বেনামে জৈন্তা রাজ্য দখল করেছে।
১৮৩৫ সালের ১৬ মার্চ জৈন্তারাজ্য দখল করেছিল বৃটিশ শাসকরা। বৃটিশরা চলে গেলেও এখন পর্যন্ত দখলমুক্ত হয়নি জৈন্তা রাজ্য। প্রতিনিয়তই বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এক শ্রেণীর ভূমি খেকোরা জৈন্তা রাজ্যের অবশিষ্ট পুরাতন নিদর্শনগুলো নষ্ট করছে ও তার আশেপাশের জায়গা নিজেদের আওতাভুক্ত করে নিচ্ছে।
ইমরান আহমদ মহিলা ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক শাহীদ আহমদ বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ জৈন্তারাজ্যের অবশিষ্ট স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করতে এলাকাবাসীকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনেরও শক্ত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। প্রশাসন এগিয়ে আসলে সচেতন এলাকাবাসীরাও এগিয়ে আসবে এই স্থানটি সংরক্ষণে। বিশ্বের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নিদর্শনের মত ইতিহাসে জৈন্তারাজ্যের ও মূল্যায়ন ছিল। তাই এ পুরাকীর্তি আমাদের তথা সিলেট বিভাগের জন্য অনেক মূল্যবান সম্পদ। এই পুরাকীর্তি সংরক্ষণে অতি জরুরী ভিত্তিতে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসনসহ সবাইকে নিয়ে সরকারের একটি সঠিক উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, এই জৈন্তা রাজ্যের বিস্তৃতি রয়েছে সাড়া জৈন্তা উপজেলা জুড়ে। একজন কেয়ার টেকার দিয়ে এ স্থাপনা গুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা কোনও ভাবে সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে সরকার যদি এই স্থানটি সংরক্ষণের জন্য অধিক জনবল নিয়ে কোনও প্রজেক্ট আকারে কাজ করেন তাহলে এ জৈন্তা রাজ্য সংরক্ষনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।
তিনি আরো জানান, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সিলেটে কোনো বিভাগীয় অফিস নেই। চট্টগ্রাম ডিভিশনাল অফিস কুমিল্লায়। এখন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যদি এটা দেখাশুনা করে তাহলে পর্যাপ্ত জনবল নিয়ে তাদের একটি বিভাগীয় অফিস করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র জৈন্তাপুরের জন্য নয় সাড়া সিলেট বিভাগের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন পুরাকীর্তি সংরক্ষনের জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সিলেট বিভাগীয় অফিস থাকা খুব প্রয়োজন।
আসামপাড়া আর্দশগ্রাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও লেখক মোঃ ফয়জুল হক বলেন, ঐতিহাসিক এ জৈন্তা রাজ্য এখন দুরবৃত্ত্বদের দখলে চলে গেছে। অচিরেই এ স্থাপনাগুলো দখলমুক্ত না করলে জৈন্তা রাজ্যেও স্মৃতি চিহ্নগুলো বিলীন হয়ে যাবে। তিনি বলেন এ স্থাপনাগুলো সংরক্ষন করা কোনো লাভজনক কাজ না তাই সকলকে সংগঠিত করা যাচ্ছে না। প্রশাসন সহযোগিতা করলে অনেক সচেতন এলাকাবাসী জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস সংরক্ষনে এগিয়ে আসবে বলে মনে করি।
ওয়াল্ড আইটি ফাউন্ডেশনের জৈন্তাপুর শাখার পরিচালক ও সাংবাদিক মোঃ রেজোয়ান করিম সাব্বির বলেন, যদি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করে তাহলে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত দর্শনার্থী, পর্যটকরা জৈন্তাপুরের ইতিহাস সর্ম্পকে জানতে পারবে। কতিপয় ভুইফুড়ে সংগঠন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাম নিয়ে পুরাকীর্তি সংগঠনের নামে তাদের ফায়দা হাসিল করে চলে যায় কিন্তু পুরাকীর্তি সঠিক ভাবে সংরক্ষন হয়না। বরং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সদস্যরা দখল করে নিচ্ছে মূল্যবান এই স্থাপনাগুলো।
তিনি আরও জানান, এলাকার ১০% লোক আছেন যারা এই ঐতিহাসিক সম্পদ সংরক্ষন করতে চান কিন্তু রাজনৈতিক হয়রানি, কম জনবল ও বিভিন্ন কারণ বশত আগ্রহিরা কাজ করতে মনোবল পান না। এখন সরকার যদি সহযোগিতা করে তাহলে আগ্রহী সংগঠনগুলো কাজ করতে পারবে এবং সংরক্ষনের জন্য শ্রম দিবে।
জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ খালেদুর রহমান সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান জানান, উপজেলা প্রশাসন থেকে আমরা যতটুকু পারি এই ঐতিহাসিক জায়গাগুলো দেখাশুনা করার চেষ্টা করছি। তবে এটা দেখা শুনা করার মূল দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের।
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে রাজবাড়ির জায়গা দখল মুক্তকরার জন্য তাড়কাটা দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছি। রাতে যাতে মাদকসেবীদের আড্ডা না হতে পারে সেজন্য আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। রাজবাড়ি এলাকায় মাদকসেবনের জন্য আমরা বেশ কয়েকজনকে জরিমানাও করেছি।
আপনার মন্তব্য