১৪ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:৩০
সিলেটে বাংলা বর্ষবরণের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। প্রতিবছরই প্রাণের উচ্ছ্বাসে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে থাকে নানামাত্রিক আয়োজন। সেই পাকিস্তান আমল থেকেই সিলেটে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে নানা আয়োজন চলে আসছে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হালখাতা, ঘরে ঘরে নববর্ষ পালনের রীতি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায়। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্রায় তিন দশক ধরে সিলেটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৈশাখী মেলাও। কয়েক বছর ধরে সর্বজনীন এই উৎসবের ব্যাপকতা বেড়ে চলেছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে সিলেটে বাংলা নববর্ষ পালন ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। যতটুকু জানা যায়, পাকিস্তান আমলে ১৯৬৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন সিলেটে বাংলা নববর্ষ পালন শুরু করে।
সে সময় বর্ষবরণ উদযাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, তাঁদের আয়োজনে নববর্ষের রঙিন ব্যাজ তৈরি করে সেগুলো বিক্রি, আলোচনা সভা ও গানের আয়োজন থাকত। তখন নগরের মীরাবাজার এলাকায় অধ্যক্ষ গিরীন্দ্র দত্তের বাসার সামনের মাঠে আয়োজন করা হতো বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের।
খোলা মাঠে শতরঞ্জি বিছিয়ে চলত আলোচনা সভা ও গানের আসর। সঙ্গে থাকত মিষ্টি ও পিঠা।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে সিলেটে উদীচী নববর্ষের প্রভাতি অনুষ্ঠান শুরু করে। শহরের বিভিন্ন স্থানে এই অনুষ্ঠান হতো। পঁচাত্তরে উদীচীর অফিস সরকার বন্ধ করে দিলে দুই বছর কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। ১৯৭৭ সাল থেকে নয়াসড়ক এলাকায় উদীচীর অফিস চালু হলে অফিস প্রাঙ্গণে আবার নববর্ষ পালন শুরু হয়। আয়োজকরা নিজেদের বাড়ি থেকে মিষ্টি ও পিঠা নিয়ে আসতেন এবং গানবাজনাসহ নানা আয়োজনে বছরের প্রথম দিন পালন করতেন। এসব অনুষ্ঠানে কবি বেলাল মোহাম্মদ ও ডা. অরবিন্দ বড়ুয়ার মতো গুণীরাও অংশ নিতেন।
বৈশাখী মেলা : বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে সিলেটে বৈশাখী মেলার আয়োজন শুরু হয় বাংলা ১৩৯০ সন (১৯৮৩ সাল) থেকে। খেলাঘর ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্যোগে নগরের মীরাবাজারে মডেল হাই স্কুল প্রাঙ্গণে প্রথম বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দুই বছর যৌথভাবে বৈশাখী মেলা করার পর উদীচী এককভাবে মেলা আয়োজন করতে থাকে। তখন পর্যন্ত এটাই ছিল সিলেটের একমাত্র বৈশাখী মেলা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও পিঠা থেকে শুরু করে হরেক রকম পণ্যের স্টল থাকত মেলায়। এমনকি বইয়ের স্টলও থাকত। মডেল স্কুলে বাংলা ১৪০১ সন (১৯৯৪ সাল) পর্যন্ত বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় একই সময়ে বাংলা ১৩৯৩ সন (১৯৮৬ সাল) থেকে সিলেটের চারটি নাট্য সংগঠন কথাকলি, সন্ধানী নাট্যচক্র, লিটল থিয়েটার ও সুরমা থিয়েটার নগরের রিকাবীবাজার এলাকার প্রান্তিক চত্বরে বৈশাখী মেলার আয়োজন শুরু করে। পরে নাট্য সংগঠনগুলোর অভিভাবক সংগঠন সম্মিলিত নাট্য পরিষদের ব্যানারে প্রতিবছর এই বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। একপর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমিও এই মেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। এই মেলায় থাকে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্টল, কুটির শিল্পের স্টল, কারুপণ্যের প্রদর্শনী, বানর নাচ, সাপের খেলা, চরকিসহ নানা আয়োজন। এখানে বাংলা ১৪০৯ সন (২০০২ সাল) পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর একটানা বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর স্থানাভাবে প্রান্তিক চত্বরের বৈশাখী মেলা বন্ধ হয়ে যায়। তবে বৈশাখী মেলা না হলেও বৈশাখ উদ্যাপনের নানা আয়োজন চলতে থাকে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে।
প্রায় তিন বছর সিলেটে কোনো বৈশাখী মেলা হয়নি। বাংলা ১৪১২ সনে (২০০৫ সাল) সিলেট সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান আবার মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেন। ওই বছর থেকেই নতুন করে বৈশাখী মেলা শুরু হয়। প্রথম দিকে সংস্কৃতিকর্মীদের সহযোগিতায় সিটি করপোরেশন মেলার আয়োজন করলেও পরে এককভাবে সিটি করপোরেশন মেলা করে আসছে। প্রতিবছর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কিন ব্রিজের কাছে সুরমা নদীর তীরে সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলা বসে। এবার এই মেলার এক দশক পূর্ণ হবে। বর্ষবরণের এই কর্মসূচির মধ্যে বৈশাখী মেলা ছাড়াও আনন্দ শোভাযাত্রা, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাউল গান ও পিঠা উৎসব রয়েছে। এ ছাড়া সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শ্রুতি ২০০৯ খিস্টাব্দ থেকে ব্লু বার্ড স্কুলে বৈশাখী মেলা ও বর্ষবরণ উৎসব আয়োজন করে আসছে। বড় পরিসরে দিনব্যাপী এই মেলায় প্রভাতি সংগীত ছাড়াও দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে।
বর্ষবরণের নানা উদ্যোগ : ঢাকায় যেমন ছায়ানটের উদ্যোগে প্রভাতি সংগীত দিয়ে বর্ষবরণের নানা আয়োজন শুরু হয় তেমনি সিলেটেও অনেক সংগঠন বর্ষবরণ উৎসব পালন করে। সংগীত সংগঠন আনন্দলোক বাংলা ১৪০১ সন থেকে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করে আসছে। সিলেট শহীদ মিনারে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু হলেও পরের বছর থেকে নগরের মীরের ময়দানে সংস্কৃত কলেজে নিয়মিত অনুষ্ঠান করছে আনন্দলোক। বর্তমানে প্রত্যুষে বর্ষবরণের প্রভাতি আয়োজনে আনন্দলোকের অনুষ্ঠানটিই প্রধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ছাড়া জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সাংস্কৃতিক সংগঠন সোপান, সম্মিলিত নাট্য পরিষদসহ বিভিন্ন নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আলাদাভাবে বর্ষবরণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে প্রভাতি সংগীত, শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বাউল গান।
সিলেটে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সবচেয়ে বর্ধিত কলেবরে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজে। ১৯৯৫ সালে ‘উচ্ছ্বাস’ নামে একটি সংগঠন প্রথমবারের মতো এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে বর্ষবরণ শুরু করে। এর পর থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রতিবছর বর্ষবরণ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পহেলা বৈশাখে কলেজ ক্যাম্পাসে থাকে তারুণ্যের উপচে পড়া ভিড়।
সিলেটে বর্ষবরণের আয়োজনে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনও বর্ণাঢ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের উদ্যোগে শোভাযাত্রা ছাড়াও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সাংস্কৃতিক সংগঠন শিকড়, মাভৈঃ আবৃত্তি সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি, মিউজিক্যাল সংগঠন রিম, নোঙরসহ বিভিন্ন সংগঠন বর্ষবরণের নিজস্ব কর্মসূচি পালন করে আসছে।
আপনার মন্তব্য