শাকিলা ববি, হবিগঞ্জ

২১ এপ্রিল, ২০১৬ ১৯:১৮

হবিগঞ্জে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ফসল

অতি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। অনেক স্থানে ধানে পঁচনও ধরেছে। ফলে অধ্যাপক ও কাঁচা ধান কেটে আনছেন কৃষকরা। এছাড়া অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবছর ধানের দামও সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। প্রতি মন ধান বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা মন দরে। শ্রমিকের খরচ জোগানো এবং সার কিনতে ধারদেনা পরিশোধ করতে এ দামেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। গোলায় তোলার আগেই তারা ফরিয়াদের কাছে তা বিক্রি করে দিচ্ছেন। এ অবস্থায় কৃষকদের মাঝে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বানিয়াচং উপজেলার কালারডুবা থেকে শুরু করে নিচু এলাকার অধিকাংশ জমিই পানিতে তলিয়ে গেছে। অব্যাহতভাবে পানি বৃদ্ধির কারণে উজানের কিছু জমির ধানও পানির নিচে চলে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বানিয়াচং, আজমিরিগঞ্জ, লাখাই, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ সদর ও বাহুবল উপজেলার ৪৫৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। অব্যাহতভাবে বাড়ছে নদীগুলোর পানিও। এ অবস্থায় কৃষকরা কাঁচা, আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। জমিতে থেকে পঁচনের থেকে নিজের গোলায় তোলার আশায় তারা এসব ধান কাটছেন । এছাড়া ধান কাটার শ্রমিকেরও রয়েছে মারাত্মক সংকট। অন্যান্য বছরের তুলনায় অধিক মূল্য দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের। তাও মিলছেনা শ্রমিক। তাই নিজেরাই কষ্ট করে এসব ধান কাটছেন । নিজেদের পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যদেরও নিচ্ছেন ধান কাটতে। কৃষকরা জানান, একদিকে কম মূল্যে শ্রমিক পাওয়া যায়না। অন্যদিকে অনেক শ্রমিক ভয়ে ধান কাটতে যায়না। জেলায় ইতিমধ্যে অন্তত ১০ জন বজ্রপাতে মারা গেছে। এমন আতংক থেকেই শ্রমিকরা হাওরে ধান কাটতে রাজি হয়না।

বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের কবিরপুর গ্রামের কয়েকজন কৃষক জানান, কোন রকম কষ্ট করে ধান কাটছেন তারা। যে শ্রমিক পেয়েছেন তাদেরকেও দিতে হচ্ছে অনেক বেশি খরচ। কিন্তু সে তুলনায় ধানের দাম একেবারেই কম। এ অবস্থায়ও কোন উপায় না পেয়ে প্রতি মন ধান ৩ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। যদি ধান বিক্রি না করেন তবে শ্রমিকের খরচ, সার আনতে করা ধার পরিশোধ করা কোন ভাবেই সম্ভব হবেনা। তাদের বাঁচাতে ধানের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করে সরকারিভাবে তা সংগ্রহের দাবি জানান কৃষকরা। অন্যথায় ভবিষ্যতে মানুষ ধান উৎপাদনে আগ্রহ হারাবে বলে তারা জানান।

জেলা কৃষি অফিসের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা বশির আহম্মদ সরকার জানান, জেলায় এ বছর ১ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মাঝে এখনও পর্যন্ত নিম্নাঞ্চলে মাত্র ৩৫ শতাংশ এবং সমতল ভূমির মাত্র ৮ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধান দ্রুত কাটতে তারা কৃষকদের মাঝে প্রচারণা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি শ্রমিক সংকটের কথা মাথায় রেখে তাদেরকে ধান কাটার যন্ত্র দিয়েও সহযোগিতা করছেন। এখনও পর্যন্ত খুব বেশি ধান নষ্ট হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, যদি বৃষ্টি অব্যাহত থাকে তবে শুধু ভাটি নয়, উজান এলাকার ধানেরও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সব্যসাচী চৌধুরী জানান, এ বছর চৈত্র মাস থেকেই হবিগঞ্জ জেলায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। উজানে ভারতের মেঘালয়েও বৃষ্টির পরিমাণ অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। আর এমন আকস্মিক বৃষ্টির কারণে নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। নদীর পানি ইতিমধ্যে হাওরে প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে জেলার আজমিরিগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ, বাহুবল ও হবিগঞ্জ সদর উপজেলার নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় জেলায় আগাম বন্যার আশংকার কথা জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদেরকে চিঠি দিয়েছে। এর প্রেক্ষিতে তারা প্রত্যেক উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছেন। যেন কৃষকরা দ্রুত ধান কেটে নিয়ে আসতে পারেন।

জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলায় বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিকটন। ফলনও অত্যন্ত ভাল হয়েছিল। যদি কৃষকরা ঠিকমতো ধান গোলায় তুলতে পারেন তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এখনও পর্যন্ত ৪৫৫ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেলেও তা তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। যদি কৃষকরা দ্রুত এসব ধান কাটতে না পারেন তবে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। তবে বাস্তবে পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত