নিজস্ব প্রতিবেদক

২৩ নভেম্বর, ২০১৬ ২০:০৪

এবার উৎপলকে ডিভোর্স দিলেন ঐশী, ধর্ষণের অভিযোগ

নানা ঘটনার পর অবশেষে উৎপল সিংহকে ডিভোর্স দিয়েছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ঐশী হামোম। গত রোববার তিনি আদালতে এফিডেভিটের মাধ্যমে ডিভোর্স দেন।

দশদিন নিখোঁজ থাকার পর গত ১৭ নভেম্বর আদালতে হাজির উৎপলকে বিয়ে করেছেন বলে জানিয়েছিলেন ঐশী। যদিও ঐশীর পরিবার আগেই অপহরণ মামলা দায়ের করেছিলো উৎপলের বিরুদ্ধে।

ডিভোর্সের আবেদনে ঐশি লিখেছেন, ‘উৎপল সিংহ রনি আমাকে জোরপূর্বক অপহরণ করেছে। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাগজে দস্তগত নিয়েছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে ধর্ষণ করেছে।’

টানা ৪ দিন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে বাড়ি ফেরার পথে গত রোববার উৎপলকে ডিভোর্স দেন ঐশী।

এ ব্যাপারে ঐশী বলেন, ‘আমি যখন ওদের হাতে বন্দি তখন আমার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। টানা নির্যাতনে আমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আর ওই সময় তারা বলেছিল- আদালতে রনির পক্ষে বক্তব্য না দিলে তারা আমার বাবা-মা ও ভাইকে হত্যা করে ফেলবে। এ কারণে বাধ্য হয়ে আমি আদালতে তাদের শেখানো বুলি বলেছি।’

এখন ঐশী তাকে অপহরণ ও নির্যাতনের বিচার চান। এই দাবিতে রনির পরিবারের বিরুদ্ধে আদালতে লড়াই চালিয়ে যাবে ঐশীর পরিবার।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের শেষ বর্ষের ছাত্রী ঐশী হামোম। বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলেই থাকতেন তিনি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কোনাগাঁও গ্রামের সনাতন হামোমের মেয়ে ঐশী। আর উৎপল সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার শিবনগর গ্রামের উপেন্দ্র সিংহের ছেলে তিনি।

প্রায় ৩ বছর আগে রনির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে ঐশীর। তবে প্রায় দেড় বছর আগে তাদের সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় বলে জানান ঐশী।

ঐশী জানান, ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় রিকশা নিয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে ফিরছিলেন। বালুচরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গলির মুখে আসামাত্র একটি মাইক্রোবাস নিয়ে রনি তার পথ আটকান। নির্জন ওই স্থান থেকে অনেকটা জোরপূর্বক তাকে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে চলে যান রনি।

মাইক্রোবাসে ওঠানোর পর তাকে উৎপল সিংহ রনি প্রচণ্ড মারধর করার অভিযোগ করে ঐশী বলেন, আমার চোখ-মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।

ওই দিনই ঐশীকে নিয়ে শ্রীমঙ্গলে চলে যান রনি। সেখানে এক আত্মীয়ের বাসায় তাকে রাখেন। এসময় ঐশীর মোবাইল ফোন থেকে রনি বান্ধবীর কাছে মোবাইলে মেসেজ পাঠান। মেসেজে লিখা ছিল-‘আজ হলে ফিরবো না- মাসির বাড়ি যাচ্ছি।’

এশীকে নিয়ে যে ১০ দিন রনি ছিলেন ওই সময় তারা ৭টি স্থান বদল করেছে বলে জানান ঐশী। তিনি বলেন, শ্রীমঙ্গল থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের একটি বাগানে। সেখানে রনির মা সহ আত্মীয়স্বজনরা আসেন। ওই বাগানে রাখার সময় রনি তার ওপর নির্যাতন চালান। মাঝে মধ্যে মুখের বাঁধন খুলে দিলেও অধিকাংশ সময় মুখ বাঁধা থাকতো। অপহরণের তিন দিন পর রনি ও তার পরিবারের লোকজন ঐশীকে নিয়ে যান হবিগঞ্জের এক আইনজীবীর বাসায়। সেখানে নেয়ার আগে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। আইনজীবীর বাসায় নেয়ার পর তাকে কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলা হয়। কিন্তু ঐশী স্বাক্ষর দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে মারধর করা হয়। এতে বাধ্য হয়ে ঐশী ওই কাগজে স্বাক্ষর করেন বলে জানান।

তিনি বলেন, ‘রনির নির্যাতনের কারণে প্রায় সময় অচেতন থাকতাম। শেষদিকে শরীর প্রায় অবশ হয়ে গিয়েছিল। চলাফেরার শক্তিও হারাতে বসেছিলাম। অচেতন অবস্থায় আমার ওপর অনেক নির্যাতন হয়েছে।’ এসব নির্যাতনের কারণে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানান।

ওদিকে, ঐশী অপহরণের ঘটনায় সিলেটের শাহপরান থানায় মামলা দায়ের করার পর পুলিশ তৎপর হয়ে উঠে। এ কারণে ঐশীকে নিয়ে পালিয়ে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়ে রনির। গত ১৬ নভেম্বর রনি সিংহ ও তার পরিবারের লোকজন ঐশীকে জানান- আদালতে হাজির হবে। এবং আদালতে রনির পক্ষে কথা বলার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। ঐশী জানিয়েছেন, ‘আদালতে নিয়ে আসার আগে তারা জানিয়ে দেয়- যদি রনির পক্ষে বক্তব্য না দেই তাহলে তারা আমার বাবা-মা ও ভাইকে খুন করে ফেলবে। এসব হুমকিতে আমি তটস্থ হয়ে পড়ি। আর ১৭ নভেম্বর সিলেটের আদালতে হাজির করার পর আমি রনির পক্ষে বক্তব্য দেই।’

ওই দিন আদালত ঐশীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রনি সিংহকে জামিন দিয়েছেন। আর ঐশীকে নিজ জিম্মায় জামিন দেন। নিজের জিম্মায় জামিন পাওয়ার পর ঐশী সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পিতা সনাতন হামোম, মা ঊষা রানী সিনহা ও ভাই সাগর হামোম।

আদালতের নির্দেশে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ঐশীর মেডিকেল চেকআপ করানো হয়েছে। এরপর আরো দুই দিন চিকিৎসা দেয়ার পর ২০ নভেম্বর তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। এবং মা- বাবার সঙ্গে নিজ বাড়ি কমলগঞ্জে চলে যান।

যাওয়ার আগে সিলেটের আদালতে গিয়ে ঐশী এফিডেভিটের মাধ্যমে উৎপল সিংহ রনিকে ডিভোর্স দিয়েছেন। ঐশী ডিভোর্সের কপিতে জানান, রনি সিংহ তাকে জোরপূর্বক অপহরণ এবং পরে ধর্ষণ করেছে। নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে কাগজে তার মতের বিরুদ্ধে দস্তগত নিয়েছে। ঐশী এখন গ্রামের বাড়িতেই আছেন।

ঐশী বলেন, ‘আমার ভবিষ্যৎ রয়েছে। একটি ঝড় আমাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। আমি আবার ঘুরে দাঁড়াতে চাই। আবারো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো। বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবো। আবার স্বাভাবিক হবো।’

আদালত সূত্র জানিয়েছে, ঐশীর পিতার দায়ের করা মামলায় আসামি ছিলেন রনি, তার পিতা উপেন্দ্র সিংহ, মা নন্দারানী সিনহা সহ আরো কয়েকজন। তারা ইতিমধ্যে আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন।

ঐশীর পিতা সনাতন হামোম জানিয়েছেন, আদালতে হাজির করার দিন ঐশী গুরুতর অসুস্থ ছিল। তার ওপর যে মানসিক নির্যাতন চালানো হয় এতে করে সে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ছিল। এ কারণে টানা ৪ দিন তাকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়ার পর সে কিছুটা সুস্থ হয়েছে। তিনি বলেন, তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। তার মেয়েকে জোরপূর্বক অপহরণ করে নির্যাতন চালানো হয়েছে। এ ঘটনার বিচার তিনি চাইবেন আদালতের কাছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত