এস আলম সুমন, কুলাউড়া

২১ জানুয়ারি, ২০১৭ ১২:৫৬

কুলাউড়ায় হাম-রুবেলার প্রকোপ, ঝুঁকিতে শিশুরা

কুলাউড়ায় সংক্রামক ব্যাধি হাম-রুবেলার প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। গত দুই মাসে পুরো উপজেলা জুড়ে ২০ এর অধিক শিশু আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।

এর মধ্যে ভুকশীমইলের সাদিপুর জেলে পল্লীর ১৬ জন শিশু হাম-রুবেলায় আক্রান্ত ও ৯ মাসের একটি শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাছাড়াও ওই এলাকায় ১৭ জন শিশু সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) টিকা পাননি। হাম-রুবেলা সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। সম্প্রতি অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ভূকশীমইল ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের সাদিপুর গ্রামে মোট জনসংখ্যা ১০ হাজার ৭শ জন। ওই এলাকায় ০ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা ২৮২ জন, ১৫ মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা ২৫৭ জন। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপে এই ওয়ার্ডের ৮টি ইউনিটে হাম-রুবেলায় আক্রান্ত হয় ০ থেকে ৫ বছর বয়সের ১৬ জন শিশু। এছাড়াও ১৭ জন শিশুকে সনাক্ত করা হয় যাদেরকে ইপিআইয়ের কোন টিকা ও ভ্যাকসিন দেওয়া হয়নি। তাদের অধিকাংশের বয়স ৩ থেকে ৫ বছর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য ১০টি টিকা প্রদান করতে হয়। হাম-রুবেলা সংক্রামক হওয়ায় এ রোগে আক্রান্ত শিশুর হাঁচি কাশির মাধ্যমে সুস্থ শিশুও দ্রুত আক্রান্ত হয়। দ্রুত এর প্রতিকার না করা গেলে এতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

সরেজমিনে ভূকশীমইলের সাদিপুরে অনুসন্ধান করে জানা যায়, দক্ষিণ সাদিপুর গ্রামের কালা মিয়ার ৯ মাসের শিশুকন্যা রীমা আক্তার গত বছরের ১৮ নভেম্বর হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। রিমার মা লিজা বেগম ও দাদি নাজমা বেগম বলেন, নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখ জ্বর ও গায়ে ফেরা (হাম) হওয়ায় তাকে কুলাউড়া হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখান থেকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পরবর্তীতে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। রিমার বড় বোন নাজমিন আক্তারও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে এখনো অসুস্থ।

এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল খালিক ও সরফর মিয়া জানান, রিমা আক্তার হামে হাম রোগে অসুস্থ হওয়ার পর সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আশেপাশের কয়েকটি ঘরের প্রায় ৮ জন শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয়। মাস খানেক আগে হেলাল মিয়ার আড়াই বছরের মেয়ে সাউদা এ রোগে আক্রান্ত হয়ে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।

তারা আরও বলেন, সপ্তাহ খানেক আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও ইপিআই এর মাঠ-কর্মীরা সাদিপুর এসে হাম রোগে আক্রান্ত বেশ কয়েকজন শিশুকে সনাক্ত করেন। এই এলাকায় নভেম্বর মাস ধরে শিশুরা হাম রোগে আক্রান্ত হওয়ায় এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিপদ বাড়তে পারে।

শিশুকন্যা জাহিরা বেগমের মা সামিয়া বেগম বলেন, তাঁর মেয়ের ৩ সপ্তাহ ধরে জ্বর ও শরীরে লালচে দাগ দেখা দেয়। পরবর্তীতে কুলাউড়ায় প্রাইভেট চেম্বারে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানান শিশুটি হামে আক্রান্ত। এখনো সে সুস্থ হয়নি।

বাচ্চু মিয়ার স্ত্রী সাহেলা বেগম বলেন, মাসখানেক ধরে প্রথমে তাঁর আড়াই বছরের ছেলে ইব্রাহিম ও পরে ১ বছরের মেয়ে সাদিকা হাম রোগে আক্রান্ত  হলে তাদেরকে কুলাউড়া হাসপাতালে ডা. জাকিরের নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। এখনো তারা সুস্থ হয়ে ওঠেনি। ওই এলাকার আজমান আলীর দুই মেয়ে পান্না বেগম ও মুকমাইয়া জান্নাত সুরাইয়া, সেলিম আহমদের ছেলে মাহাদি হাসান, রহিমা বেগমের ছেলে সাদিক ও মাছুম ও হোসাইন আহমদের ছেলে ওবায়েদ উল্লাহ একই রোগে আক্রান্ত।

কুলাউড়া উপজেলা হেলথ্ ইনচার্জ আব্দুল আহাদ ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির এমটি আপ্তাব হোসেন বলেন, এই এলাকায় আমাদের জরীপ অভিযান চলছে। এ পর্যন্ত জনবহুল এই ওয়ার্ডের ৮ টি ইউনিটে হাম রোগে আক্রান্ত ১৬ জন শিশু ও টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) টিকা পাননি এমন ১৭ জন শিশু সনাক্ত করা হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হামে আক্রান্ত ও এর টিকা পাননি এমন শিশু সনাক্ত করে তাদেরকে টিকা প্রদান করা হচ্ছে।

এই এলাকায় গত নভেম্বর মাসে ৯ মাস বয়সী শিশু রিমার মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে হেলথ্ ইনচার্জ আব্দুল আহাদ ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির এমটি আপ্তাব হোসেনের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলে তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুরুল হক হাম রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এ বছর শুধু কুলাউড়া উপজেলায় নয় সমস্ত সিলেট বিভাগে এ রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। আমরা এ রোগের প্রকোপ কমাতে কাজ করে যাচ্ছি। স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী এক সপ্তাহের মধ্যে হাম রোগ ও এর টিকা পাননি এমন (৯ থেকে ২৩ মাস বয়সী) শিশু সনাক্ত করে তাদেরকে টিকা প্রদানের আওতায় আনা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, হাম রোগে আক্রান্ত ও ইপিআইর টিকা পায়নি যে সকল শিশুরা তাদের বেশিরভাগই ৪-৫ বছরের। অনেক আগেই তারা ইপিআইয়ের টিকা থেকে বাদ পড়ায় এখন তারা আক্রান্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী হাম রোবেলা রোগে কুলাউড়ায় শিশু আক্রান্ত হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আমরা খোঁজ নিয়ে তাদের চিকিৎসার দিয়েছি। ৯ মাস থেকে ১৮ মাস বয়সী ৩৬ জন শিশুকে কোন প্রকার ভ্যাকসিন প্রদান করা হয়নি তাদেরকে ভ্যাকসিন প্রদান করেছি।

কুলাউড়ার সাদীপুর এলাকার কালা মিয়ার মেয়ে রিমা আক্তার লিমা (৯ মাস) এর শিশু হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন. এখন পর্যন্ত আমি এ বিষয়ে অবগত নয়। তবে এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখবো।
 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত