মিহিরকান্তি চৌধুরী

১০ আগস্ট, ২০২৬ ১৬:০৯

সিলেট-ঢাকা রুটে বিমানভাড়া নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

একসময় বিমানে ভ্রমণ ছিল বিলাসিতার প্রতীক, উচ্চবিত্তের সীমাবদ্ধ এক সুযোগ। কিন্তু বিশ্বব্যাপী যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রতিযোগিতামূলক বাজারনীতি এবং সাশ্রয়ী বিমানসেবার কারণে আজ ইউরোপ, আমেরিকা, ভারতসহ বহু দেশে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষও নিয়মিত বিমানে যাতায়াত করেন।

বিমান এখন আর কেবল আরাম বা আভিজাত্যের বাহন নয়; এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক কাজ ও জরুরি মানবিক প্রয়োজনের অপরিহার্য মাধ্যম।

দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রুটে, এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে এয়ারলাইনসগুলো যাত্রীচাহিদাকে কেন্দ্র করে ইচ্ছামতো ভাড়া নির্ধারণ করছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া এমনভাবে বৃদ্ধি পায় যে সাধারণ মানুষের জন্য তা প্রায় অসহনীয় হয়ে ওঠে। কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এতটা অস্বাভাবিক ছিল না।

উদাহরণ হিসেবে ঢাকা–সিলেট রুটের কথা বলা যায়। এ রুটের দূরত্ব মাত্র প্রায় ১২০ নটিক্যাল মাইল। অথচ অনেক সময় একমুখী ভাড়া ১২ হাজার টাকারও বেশি নির্ধারণ করা হয়। দূরত্ব, জ্বালানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক তুলনা বিবেচনা করলে এই ভাড়া সাধারণ মানুষের কাছে অযৌক্তিক বলেই প্রতীয়মান হয়।

আন্তর্জাতিক তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ভারতের আগরতলা থেকে চেন্নাইয়ের দূরত্ব প্রায় ১৬৭৮ কিলোমিটার বা ৯০৬ নটিক্যাল মাইল, অথচ সেই রুটে ভাড়া প্রায় ১১,৭০০ রুপি। আবার কলকাতা–দিল্লি রুটের দূরত্ব প্রায় ৭০৯ নটিক্যাল মাইল; সেখানে একমুখী ভাড়া প্রায় ৭৩ মার্কিন ডলার এবং আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রায় ১৪৬ ডলার। সেই তুলনায় মাত্র ১২০ নটিক্যাল মাইলের ঢাকা–সিলেট রুটের ভাড়ার বর্তমান অবস্থা যে কতটা বেসামাল, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।

এই উচ্চ ভাড়ার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ—রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, বিদেশগামী যাত্রী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জরুরি পারিবারিক বা মানবিক পরিস্থিতিতে যাতায়াতকারী নাগরিকরা। অনেক সময় ঢাকায় চিকিৎসা, ভর্তি পরীক্ষা, ব্যবসায়িক বৈঠক বা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরার জন্য বিমানই একমাত্র বাস্তবসম্মত মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে ঢাকা–সিলেট রেল ও সড়ক যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। সময়ক্ষেপণ, যানজট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও অনিশ্চয়তার কারণে বিপুলসংখ্যক যাত্রী বাধ্য হয়ে বিমানপথ বেছে নেন। এই বাধ্যতামূলক চাহিদাকে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই জনস্বার্থসম্মত নয়।
সিলেট বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। প্রতিবছর লক্ষাধিক যাত্রী আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরার জন্য ঢাকা যাতায়াত করেন। অস্বাভাবিক অভ্যন্তরীণ বিমানভাড়া তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই জনগোষ্ঠীর স্বার্থও এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিমানবাজারে কি প্রকৃত প্রতিযোগিতা বিদ্যমান? একই সময়ে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ভাড়া প্রায় একই রকম উচ্চ হওয়া যাত্রীদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন সৃষ্টি করে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (CAAB) আরও সক্রিয় নজরদারি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। পাশাপাশি টিকিটের মূল ভাড়া, সারচার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য ফি পৃথকভাবে স্পষ্টভাবে প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত, যাতে যাত্রীরা প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত থাকতে পারেন।

আমরা মনে করি, সরকার অভ্যন্তরীণ বিমান রুটগুলোতে একটি যৌক্তিক সর্বোচ্চ ভাড়ার সীমা (fare cap) নির্ধারণ করতে পারে, বিশেষ করে ঢাকা–সিলেট, ঢাকা–চট্টগ্রাম ও ঢাকা–কক্সবাজারের মতো উচ্চচাহিদাসম্পন্ন রুটে। গণপরিবহন ও জনসেবামূলক খাতে যেমন নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালন করা হয়, বিমানসেবার ক্ষেত্রেও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

আমরা সিলেটবাসী আশা করি, সিলেটের মান্যবর দুই উপদেষ্টা জনাব আরিফুল হক চৌধুরী ও জনাব খন্দকার মুকতাদির আহমদ এ বিষয়ে আন্তরিক ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। তাঁদের নেতৃত্বে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনসমূহ—সিলেট আইনজীবী সমিতি, সিলেট প্রেসক্লাব, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব, ইমজা, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব, সিলেট চেম্বার অব কমার্স, মহানগর চেম্বার, স্টেশন ক্লাব, সিলেট ক্লাব, ঢাকাস্থ জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন, বিএমএ সিলেট, ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স সিলেট, রেড ক্রিসেন্ট, ডায়াবেটিস সমিতি, হার্ট ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও এমসি কলেজের অধ্যক্ষবৃন্দ, সিলেটের সকল দৈনিক পত্রিকা, রাজনৈতিক দলসমূহ, লায়ন্স, রোটারি, এপেক্স, রাইফেলস ক্লাব, অন্যান্য পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সিলেটের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যবৃন্দ এবং অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটি যৌথ জনউদ্যোগ গড়ে তোলা জরুরি।

এটি কেবল সিলেটের সমস্যা নয়; বাংলাদেশের সব অঞ্চলের যাত্রীদের সমস্যা। সিলেট থেকে একটি সুসংগঠিত ও যুক্তিনির্ভর উদ্যোগ শুরু হলে তা জাতীয় পর্যায়ে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। বিমানভাড়া কোনো বিলাসী বিতর্ক নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যবসা, প্রবাসসংযোগ ও আঞ্চলিক উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই এখন সময় এসেছে স্বচ্ছ ভাড়ানীতি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃত প্রতিযোগিতা এবং যাত্রীস্বার্থ রক্ষায় সরকারের দৃশ্যমান ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণের। জনস্বার্থে এ প্রশ্নের বিহিত হওয়া আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি।

লেখক পরিচিতি : লেখক, অনুবাদক, গবেষক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত