নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ জানুয়ারি, ২০১৭ ০১:২০

নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না পাথর উত্তোলন

সিলেটের কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলনে খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তার আগে থেকে কোয়ারিতে বোমা মেশিন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে উচ্চ আদালতের। তবে এসব নিষেধাজ্ঞা মানছে না পাথর ব্যবসায়ীরা। কোয়ারিগুলো থেকে চলছে অবাধে পাথর উত্তোলন। চলছে বোমা মেশিনও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে আঁতাত করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

সোমবার সকালে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলনকালে টিলা ধ্বসে ৬ শ্রমিক মারা যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। যদিও পুলিশ দুইজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। একইদিনে কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনকালে মারা যান আরেক শ্রমিক।

সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনের ফলে পাথর কোয়ারিগুলোর পরিবেশ ও আশাপাশের জনবসতি হুমকির মুখে পড়ায় ২০১৬ সালের এক সেপ্টেম্বর সিলেটের পাঁচ কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়। এরআগে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি  (বেলা) দায়ের করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে সব ধরণের যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত।

তবে এমন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি পাথর উত্তোলন। বন্ধ হয়নি যন্ত্রের ব্যবহারও। শ্রমিকের মৃত্যুর পর মঙ্গলবার কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলায় অভিযান চালিয়ে একটি বোমা মেশিন ও ১১ টি সেলো মেশিন ধ্বংস করে টাস্কফোর্স।

একইদিনে জাফলংয়ে টাস্কফোর্সের অভিযানে পিয়াইন নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের দায়ে ৪টি সেইভ মেশিন ধ্বংস করা হয়।

সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় আ্ওয়ামী লীগ নেতারাই নিয়ন্ত্রন করেন পাথর কোয়ারিগুলো। তাদের মদদেই পাথর ব্যবসায়ীরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য পাথর উত্তোলন করে।

কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ কোয়ারি ও শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলনে মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কোম্পানীগঞ্জের পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম আহমদের বিরুদ্ধে। তিনিই এই উপজেলার পাথর কোয়ারিগুলো নিয়ন্ত্রন করেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থনীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে আঁতাত করে শামীম বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কোয়ারি ভাগবাটোয়ারা করে দেন।

তবে এসব অীভযোগ অস্বীকার করে শামীম আহমদ বলেন, আমার বংশের কেউ পাথর উত্তোলনের সাথে সম্পৃক্ত নন। আমার বাবা উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাই জেলা পরিষদের সদস্য। আমাদের পরিবারের সুনাম ক্ষুন্ন করতেই এসব অপপ্রচার চালানো হয়।

শাহ আরেফিন টিলাটির অবস্থান উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে। এই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল বলেন, টিলা থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করার সময় গত ছয় মাসে অন্তত আটবার এই টিলা ধসের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনা ধামাচাপা দেন পাথর উত্তোলনে নিয়োজিত প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ীরা। শ্রমিকরা মারা গেলে মরদেহও লুকিয়ে ফেলেন তারা।

মঙ্গলবার কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা পরিদর্শনে গিয়ে বেলা, সিলেটের সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আক্তার বলেন, নিষিদ্ধ থাকা সিলেটের সবগুলো কোয়ারি থেকেই প্রকাশ্যে পাথর উত্তোলন চলছে। জাফলং, ভোলাগঞ্জ, শাহ আরেফিন টিলাসহ সবখানেই বোমা মেশিনের ব্যবহার চলছে। প্রশাসনের যোগসাজশেই পাথর তুলে কোয়ারিগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।

তবে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ ও কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি বায়েছ আলম এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

শাহ আরেফিন টিলায় শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা হাকিম (এডিএম) আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম মঙ্গলবার বিকেলে শাহ আরেফিন টিলা পরিদর্শনে যান।

শাহেদুল ইসলাম পরিদর্শনকালে শাহ আরেফিন টিলায় বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করার দৃশ্য দেখতে পান। এসময় তিনি অভিযান চালিয়ে একটি বোমা মেশিন ও ১১টি সেলো মেশিন ধ্বংস করেন।

আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম বলেন, সিলেটের কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবু কিছুসংখ্যক অসাধু লোক পাথর উত্তোলন করছে। পাথর তুলে শাহ আরেফিন টিলাকে তারা একেবারে কঙ্কাল বানিয়ে ফেলেছে। তবে এখন থেকে আমরা নজরদারি আরো বৃদ্ধি করবো। কোয়ারিগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। পাথর উত্তোলনে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পাথর কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনেও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে গত তিনমাসে জালংয়ে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ কর্মসূচীগুলোতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের স্থানীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত