২৬ জানুয়ারি, ২০১৭ ০১:১৪
অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা ধ্বংসের ক্ষয়ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা হাকিম (এডিএম) আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পাথর তুলে ১৩৭ দশমিক ৫০ একর এই টিলা প্রায় ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এখন আর টিলা বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। কঙ্কালটুকু পড়ে আছে।
তিনি বলেন, এই টিলা পুরোটাই সরকারী সম্পত্তি। কিন্তু অসাধু পাথর ব্যবসায়ীরা সব ধ্বংস করে দিয়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা তাঁর।
সোমবার পাথর উত্তোলনকালে এই টিলা ধ্বসে ৬ শ্রমিক নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। যদিও পুলিশ দু’জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এই ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান সিলেটের অতিরিক্ত জেলা হাকিম (এডিএম) আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম।
তদন্তের জন্য দু’দিনের সময় দেওয়া হয়েছিলো এডিএমকে। সে হিসেবে বুধবার সময় শেষ হয়েছে। তবে তিনি আরো ১০ দিনের সময়ের আবেদন করেছেন। এডিএম বলেন, এতো বছর ধরে এই টিলা থেকে লুটপাট চলছে। হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া হয়েছে। মাত্র দুই দিনের এর সবকিছু তদন্ত করা সম্ভব নয়। তাই আমি সময় চেয়েছি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শাহ আরেফিন টিলার কিছু জমি খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ ২০০৯ সাল থেকে টিলা কেটে পাথর উত্তোলন করছে।
এখনো চলছে বোমা মেশিন : শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলন যেনো কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। এতো ঘটনার পর এখনো এই টিলা থেকে পাথর তুলে চলছে বেপোরোয় পাথর ব্যবসায়ীরা। পাথর উত্তোলনে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ বোমা মেশিনও।
বুধবার দুপুরে ফের শাহ আরেফিন টিলায় অভিযান চালায় ভ্রাম্যমান আদালত। এসময়ও টিলায় বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের চিত্র দেখতে পায় ভ্রাম্যমান আদালত। অথচ আগেরদিনই ট্রাক্সফোর্সের অভিযানে বোমা মেশিন ধ্বংস করে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো।
বুধবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্র্যাট জিয়াউল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে অভিযানকালে দুটি বোমা মেশিন ও ৮টি শোলে মেশিন পুড়িয়ে ধ্বংস করে আদালত। এসময় অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর বহনকারি একজন ট্রাক্টর চালক ও এক শ্রমিককে আটক করা হয়।
অভিযানের পর জিয়াউল আলম বলেন, এই টিলা থেকে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবু নিষেধাজ্ঞা অম্যান্য করে কিছু লোক পাথর উত্তোলন করছে।
তিনি বলেন, এখন থেকে নিয়মিত এই এলাকায় অভিযান চলবে। আইন অমান্যকারিদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনের ফলে পাথর কোয়ারিগুলোর পরিবেশ ও আশাপাশের জনবসতি হুমকির মুখে পড়ায় ২০১৬ সালের এক সেপ্টেম্বর শাহ আরেফিন টিলাসহ সিলেটের পাঁচ কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়। এরআগে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) দায়ের করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে সব ধরণের যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত।
পাঁচ জনের নামোল্লেখ করে হত্যা মামলা : সোমবার শাহ আরেফিন টিলা ধ্বসে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় কেম্পানীগগঞ্জ থানায় মঙ্গলবার রাতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই তরিকুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলা করেন বলে জানিয়েছেন সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) সুজ্ঞান চাকমা।
মামলায় পাথর উত্তোলনকারী আইয়ুব আলী, সোহরাব হোসেন, আঞ্জু মিয়া, চেরাগ আলী, শ্রমিক সর্দার জাহাঙ্গির আলমের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৬/৭জনকে আসামী করা হয়েছে বলে জানান তিনি। মামলা দায়ের হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি বলে জানান সুজ্ঞান।
মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা হাকিম (এডিএম) আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন।
মামলা দায়েরের ব্যাপারে বুধবার এডিএম বলেন, শ্রমিক হত্যা, সরকারী সম্পত্তি চুরি ও পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারী সম্পদ ধ্বংসের অভিযোগে এই মামলা করা হয়েছে।
আদালত অবমাননার দায়ে উকিল নোটিশ : বুধবার শাহ আরফিন টিলা কাটা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ও আদালতের আদেশ পালন করতে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। বেলা প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, পরিবেশগত ছাড়পত্র না নিয়েই চিকাডোরা মৌজায় অবস্থিত আরফিন টিলা কাটার বিরুদ্ধে বেলা ২০০৯ সালে হাইকোর্টে জনস্বার্থমূলক মামলা (নং ৫৮৭৩/২০০৯) দায়ের করে। সে সময় আদালত ওই টিলা কাটার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আদেশ প্রদান করেন যা এখনো বলবৎ আছে। আদালতের এমন নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে টিলা কেটে পাথর উত্তোলনের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
গত ২৩ জানুয়ারি টিলা খুঁড়ে পাথর উত্তোলনের সময় টিলার কিছু অংশ ধ্বসে পড়ে ছয়জন শ্রমিক ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত শ্রমিকরা হলেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বাসিন্দা আবদুল কাদির (৩০), একই জেলার দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের আল হাদিস (৪০), আল আমিন (৩০) তাহিরপুরের তাহের মিয়া (৩৫) নেত্রকোনার পূর্বধরা এলাকার আসিফ (২৫) ও খোকন। এছাড়াও মাটিচাপা পড়ার ঘটনায় রফিক মিয়া নামের একজনকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আদলতের নির্দেশ সম্পূর্ণরূপে অমান্য করে টিলা কর্তন করে পাথর উত্তোলনের কাজ এখনো অব্যাহত থাকায় ১৩৭.৫০ একর টিলার অনেকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। হাইকোর্টের নির্দেশ কার্যকর করতে এবং অবিলম্বে শাহ আরফিন টিলা কাটা বন্ধ করতে সেইসাথে, টিলা কর্তনকালে ক্ষতিগ্রস্ত নিহত ও আহত পাথরশ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এই নোটিশ প্রদান করা হয়।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, খনিজ ও জ্বালানী বিভাগের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক; সিলেটের জেলা প্রশাসক, খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় অফিসের পরিচালক, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ওয়াকফ প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব ও মেসার্স বসির কোম্পানীর স্বত্তাধিকারীর উপর এ আদালত অবমাননার নোটিশ প্রেরণ করে বেলা।
আপনার মন্তব্য