তপন কুমার দাস, বড়লেখা

২৯ জানুয়ারি, ২০১৭ ২২:৩২

বড়লেখায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগ নির্ণয়ের নামে অরাজকতার অভিযোগ

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় সুরমা ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশন সেন্টারে রোগ নির্ণয়ের নামে চলছে অরাজকতা। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভূক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটি অনেক রিপোর্ট ডাক্তারকে না দেখিয়ে নিজেরাই স্বাক্ষর করে রোগীদের সরবরাহ করছে। যার ফলে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

সম্প্রতি এক যুবকের জন্ডিস পরীক্ষার একটি ভুল রিপোর্ট প্রদান ও গর্ভবতী এক নারীর ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে মৃত সন্তান প্রসবের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর প্রায় বছরখানেক আগে এ প্রতিষ্ঠানে মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট নামধারী এক যুবকের হাতে এক নারী রোগী ধর্ষনের ঘটনায় উপজেলা জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নিম্নমানের রোগ নির্ণয়ের কারণে একের পর এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটলেও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। গত কয়েকদিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সুরমা ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশন সেন্টারে রোগ নির্ণয়ের নামে অরাজকতা ও ভুল রিপোর্ট প্রদানের বিষয়টি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বড়লেখা পৌর শহরের হাজীগঞ্জ বাজারের আল আমিন মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় সুরমা ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশন সেন্টারে রোগ নির্ণয়ে এসে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষার-নিরীক্ষার কাগজপত্রে আগে থেকেই মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট স্বাক্ষর করে রাখেন বলে জানা যায়।

গত ১১ জানুয়ারি বড়লেখা পৌরসভার গাজিটেকা গ্রামের বাসিন্দা সুনাম উদ্দিনের ছেলে কাওছার আহমদ জন্ডিস পরীক্ষা করতে সন্ধ্যা সোয়া ছ’টায় নিউ সেবা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার যান। সেখানে মেডিক্যাল প্যাথলজিষ্ট পংকজ কুমার সরকার স্বাক্ষরিত রিপোর্টে বিলোরবিনের পরিমাণ ৬.২০ উল্লেখ করে তাকে রিপোর্ট ডেলিভারী করা হয়। রিপোর্টে জন্ডিসের পরিমাণ বেশি হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি রাতে শহরের সুরমা ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেনশন সেন্টারে গেলে নামকরা জনৈক এক চিকিৎসকের এটেন্ডেন্স বিলোরবিন পরীক্ষার জন্য রক্ত সংগ্রহ করেন। রাতেই ওই এটেন্ডেন্স বিলোরবিন ১.৪ উল্লেখ করে রোগীকে একটি রিপোর্ট প্রদান করেন। রিপোর্টটিতে মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট হিসেবে রুবেল আহমদ নামের একজনের স্বাক্ষর থাকতে দেখা যায়।

প্রায় ১ ঘন্টার ব্যবধানে দুটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দু’ধরণের রিপোর্টে রোগীর মনে সন্দেহ দানা বাধে। পরে ঐ রোগী প্রকৃত রিপোর্টের জন্য পরের দিন (১২ জানুয়ারি) বড়লেখার শাহজালাল ডায়গনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করলে বিলোরবিন ৬.৭ আসে। একই রোগীর প্রায় ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে তিন ধরনের রিপোর্টে জন্ডিসের মত একটি জটিল রোগের ব্যাপক ব্যবধানের বিষয় জানাজানি হলে বিভিন্ন মহলে তোলপাড় শুরু হয়।

তিন ডায়গনস্টিক সেন্টারের ভিন্ন ভিন্ন রিপোর্টের বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে সুরমা ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশন সেন্টারে রোগ নির্ণয়ে প্রতিনিয়ত অবহেলার বিষয়টি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জানান, দুই একদিনের ব্যবধানে একটু তারতম্যে হতে পারে। তবে সুরমার দেওয়া রিপোর্ট ১.৪ কখনো সঠিক হতে পারে না। এটা মনগড়া তৈরি করা হয়েছে।

সুরমা ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশন সেন্টারের রিপোর্টে যে রুবেল আহমদের স্বাক্ষর রয়েছে, তিনি পাশ্ববর্তী বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরের মেডি ফাস্ট নামের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কর্মরত রয়েছেন। রিপোর্টে তাঁর স্বাক্ষর জাল করা হয়।

এ বিষয়ে সুরমা ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশন সেন্টারের মালিক অলিদ আহমদ সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, তার মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট খছরুজ্জামান অনুপস্থিত থাকায় রুবেল আহমদ এই রিপোর্টটি তৈরি করেন। কিন্তু রুবেল আহমদ বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরের মেডি ফাস্ট নামের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কর্মরত রয়েছেন এ কথা জানিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলে তিনি আর কোন উত্তর দেননি।

এদিকে বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরের মেডি ফাস্টে কর্মরত মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট মো. রুবেল আহমদের সাথে যোগাযোগ করা হলে রিপোর্টটি তিনি তৈরি করেননি জানিয়ে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট খছরুজ্জামানের অনুপস্থিতিতে গত বছর আমি কয়েকদিন সুরমায় কাজ করেছি। কিন্তু গত ৬ মাস ধরে আমি সেখানে যাইনি। রিপোর্ট করার প্রশ্নই আসে না। আমার স্বাক্ষরটি জাল করে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, উক্ত ডায়গনস্টিক সেন্টারে একজন গর্ভবতী নারীর আলট্রোসনোগ্রামের রিপোর্টেও তথ্যগত ভুলের কারণে মাস দেড়েক আগে ঐ গর্ভবতী নারী সিলেটে একটি ক্লিনিকে মৃত সন্তান প্রসব করেন। এ নিয়ে ঐ গর্ভবতী নারীর স্বামী, বড়লেখা পৌর শহরের জনৈক ব্যবসায়ীর সাথে ডায়গনস্টিক সেন্টারের মালিকসহ চিকিৎসকের সাথে বাক বিতন্ডা হয়। পরে গোপনে ডায়গনস্টিক সেন্টারের মালিকসহ চিকিৎসক ব্যবসায়ীর কাছে অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশসহ ক্ষমা চান। এভাবে সুরমা ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশন সেন্টারের রোগীরা প্রতারণাসহ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলার সিভিল সার্জন ডাঃ সত্যকাম চক্রবর্তীর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রিপোর্টগুলো কয়েকদিন আগের বলে জাস্টিফাই করা যাচ্ছে না। তবে পরীক্ষার সময় যদি রোগীর শরীরে জন্ডিসের উপস্থিতি সংশ্লিষ্ট ডাক্তার পেয়ে থাকেন, তবে ৬.২ ও ৬.৭ রিপোর্টটি সঠিক। ১.৪ রিপোর্টটি ভুল। যেহেতু প্রায় একই দিনের ব্যবধানে দু'টি ডায়গনস্টিক সেন্টারের রিপোর্টে ৬.২ ও ৬.৭ উঠে এসেছে, তাতে ওই রিপোর্ট দুইটি সঠিক হবে। সুরমার দেওয়া ১.৪ রিপোর্টটি ভুল।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত