১৭ ফেব্রুয়ারি , ২০১৭ ১৯:২৮
মাঠের মধ্যখানে বসে খুব মনোযোগ সহকারে ঘুড়ি উড়াচ্ছেন একজন। পাশে গিয়ে জানতে পারলাম তার নাম আশিষ দাশ। কাজীরগাও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তিনি। আশিষ দাশ বলেন, ছোটবেলায় আমাদের প্রধান খেলাই ছিল ঘুড়ি উড়ানো। সময়ের সাথে চলতে চলতে পরিবার, কর্মক্ষেত্র সব মেন্টেইন করে আমাদের জীবন এখন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। ছোট বেলার মত ঘুড়ি উড়ানোর সুযোগ বা খোলা স্থান পাওয়া এখন খুব মুশকিল। “দুই শূন্য শূন্য ছয়” নামের এই সংগঠন বিগত কয়েক বছর যাবত এই ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করছে। আমি প্রায় প্রতিটি উৎসবেই নিজ তাগিদে অংশগ্রহণ করি। এবছর ও অপেক্ষায় ছিলাম এই ঘুড়ি উৎসবের। কাগজের নয় মনের ঘুড়ি উড়াতে আসি এখানে। সারা বছর না পারি ১ দিনের জন্য হলেও সেই ছোট বেলায় ফিরে যাই।
মুনিয়া রহমান ও মাইকেল খন্দকার দম্পতি তাদের ২ সন্তানকে নিয়ে এসেছেন ঘুড়ি উড়ানো শিখানোর জন্য। মুনিয়া রহমান বলেন, ঘুড়ি উড়ানো আমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। উন্নত বিশ্বের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে আমাদের খেলাধুলায় ও চলে এসেছে অনেক পরিবর্তন। ইচ্ছা থাকলেও বিভিন্ন কারণে আমাদের সন্তানদের এই খেলাগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি না। ঘুড়ি উড়ানো যে কত মজার খেলা সেটা আমার সন্তানদের বুঝানোর জন্যই এই ঘুড়ি উৎসবে এসেছি।
শুক্রবার হবিগঞ্জে (১৭ই ফেব্রুয়ারি) দুই শূন্য শূন্য ছয় পরিবারের বসন্ত বরণ ও ঘুড়ি উৎসবে ছিল সহস্রাধিক মানুষের সমাগম। হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট মোঃ আবু জাহির ঘুড়ি উড়িয়ে উৎসবের শুভ সূচনা করেন। “দুই শূন্য শূন্য ছয় ”এর সভাপতি ফারজাদ ওয়াসিফ সভাপতিত্বে ও সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোঃ খাইরুল আলম শুভর সঞ্চালনায় আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক সফিউল আলম। এই ঘুড়ি উৎসবে সাধারণ মানুষের সাথে উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ক্রীড়াঙ্গনসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।
এ বছর ঘুড়ি উৎসবে পরিবার পরিজন নিয়ে এসেছেন বেশিরভাগ মানুষ। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে, বয়সের বিভেদ পদ মর্যাদা ভুলে সবাই উড়িয়েছেন ঘুড়ি। কারো ঘুড়ি আকাশ ছুইছে আর কারো ঘুড়ি মাটি থেকে উড়ছেই না।
ইনাতাবাদ এলাকার দুবাই প্রবাসী সাইফুল বেশ পরিপক্ষ ভাবে উড়িয়েছেন ঘুড়ি। নিজের ঘুড়ি দিয়ে নিমিষেই অন্যের ঘুড়ি কাটছেন। সাইফুল বলেন, ১০ বছর যাবত দুবাই ছিলাম। কিছুদিন আগে দেশে এসেছি। দেশে থাকা অবস্থায় ঘুড়ি উড়ানো ছিল আমার নেশা। ঘুড়ি উড়ানোর এই খেলায় অন্যের ঘুড়ি কাটতে খুব মজা পাওয়া যায়। ১০ বছর পর নাটাই হাতে নিয়েছি তাই একবারে ঘুড়ি উড়ানোর তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা করছি।
মাঠের মধ্যে একদল যুবক শুধু নাটাই নিয়ে ঘুরছে। জিজ্ঞাস করলাম তাদের ঘুড়ি কই? উত্তর আসলো খুব মজার। তারা বললো, আমরা কেউ ঘুড়ি কিনি নাই। যার ই ঘুড়ি কাটে সেটা নিয়ে আমরা উড়াই। ঘুড়ি উড়ানোর চেয়ে কাটা ঘুড়ি ধরার মজা আরো বেশি।
প্রতিবছরের ন্যায় এইবার ও অনুষ্ঠানে ছিল সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, রঙবেরঙের ঘুড়ি মেলা, পিঠা উৎসব। তবে এ বছর স্বপ্নপুরিতে আলোকচিত্র নামের একটি পর্ব নতুন সংযোজন হয়েছে। স্বপ্নপুরিতে আলোকচিত্রের জায়গাটিতে সব বয়সের মানুষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে সেখানে বাচ্চাদের ভিড় ছিল বেশি।
উল্লেখ্য, সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চতুর্থ বছরের মত “দুই শূন্য শূন্য ছয় ”পরিবার বসন্ত বরণ ও ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করেছে। আর্তমানবতার সেবায় কাজ করে যাওয়া এ সংগঠনটি পথশিশুদেরকে নিয়ে কাজ করে ইতিমধ্যে অনেক সুনাম অর্জন করেছে। “দুই শূন্য শূন্য ছয়” মূলত একটি সামাজিক সংগঠন। এই সংগঠনটি সমাজের সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। ২০১১ সালের ১১ই নভেম্বর হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০০৬ ব্যাজের কিছু উদ্যমী তরুণের হাত ধরে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। তার শহরের অলিগলি থেকে পথশিশু খুঁজে বের করে তাদের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করে। তাছাড়া এই পথশিশুদের ঈদের কাপড়, শীতের কাপড় দেয়া হয় ও গ্রীষ্মকালীন ফল এবং শীতের পিঠা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয় এই সংগঠন থেকে। এই শিশুদের অংশগ্রহনেই আজকের বসন্ত বরন ও ঘুড়ি উৎসবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
আপনার মন্তব্য