২৭ ফেব্রুয়ারি , ২০১৭ ১৯:৫৩
প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা শোনালেন তাদের যুদ্ধদিনের গল্প। সুদূর লন্ডনে থেকে বাঙ্গালির মুক্তিসংগ্রামে শরীক ইতিহাস। শোনালেন বর্তমান বঞ্চতা আর স্বীকৃতি না পাওয়ার আফসোস। মঞ্চে বসে সবই শোনলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী। আফসোসগুলো দূর করার আশ্বাসও দিলেন তিনি।
সোমবার বিকেলে নগরীর রিকাবীবাজার এলাকার মোহাম্মদ আলী জিমনেসিয়াম হলে গিয়ে শোনা যায় একাত্তরে লন্ডনে বসে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে শরীক হওয়া বীরদের গল্প। ‘লন্ডন ১৯৭১’ শিরোনামে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর সমাপনী পর্বে অতিথি হয়ে এসে স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরেন তাঁরা।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও ১৯৭১ সালে লন্ডনে স্থাপিত বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশনের দ্বিতীয়সচিব মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, যুক্তরােজ্যর বাঙ্গালীরা যদি একাত্তর সালে সংঘবদ্ধভাবে এগিয়ে না আসতেন তা হলে হয়তো বঙ্গবন্ধু আমরা আর ফিরে পেতাম না। পাকিস্তানীরা কারাগারেই তাকে মেরে ফেলতো।
১৯৭২ সালের ৮ জানুয়াির পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সরাসরি যুক্তরাজ্যে যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন হিথ্রো বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর স্মৃতি স্মরণ করে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রায় নয় মাস পর দুনিয়ার মানুষ এই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পেলো। আমি তাকে দেখেই কেঁদে ফেলি। তিনি আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বলেন, 'ভয় নেই, আমি এসে গেছি।'
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ওইদিনই প্রথম বঙ্গবন্ধু সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ্যে বক্তৃতা করেন, বলেন মহিউদ্দিন।
মহিউদ্দিন বলেন, '৭১ সালে আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ঘন্টাা বক্তৃতা করেছিলাম।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অথচ আজও আমি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাইনি। তবে স্বীকৃতি পাই বা না পাই, আজও মুক্তিযুদ্ধের চর্চা করে যেতে পারছি, এটাই আমার ভালো লাগছে।
বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং দৈনিক মানবকন্ঠ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক জাকারিয়া চৌধুরী, ১৯৬০ সাল থেকেই আমরা লন্ডনে বসে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা শুরু করি। '৬৩ তে বঙ্গবন্ধু লন্ডন গেলে আমি তাকে এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলাম।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার এতো বছর আমাদের এখন সবকিছুতে নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে। সবকিছুতে বিবেকহীনতা। এখন আমাদের একটি আদর্শিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে হবে।
১৯৭১ সালে বিলেতে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটি অব দ্য অ্যাকশন কমিটিস এর সদস্য প্রফেসর ড. কবীর চৌধুরী বলেন, আমরা অস্ত্র হােত যুদ্ধ কিরিিন। তবু বাংলােদেশর স্বাধীনতার পক্ষে রাজপথে নেমেছিলাম। অথচ আমাদের কেউ স্মরণ রাখে না। কোথাও আমাদের নাম নেই।
তিনি অনুষ্ঠান মঞ্চে উপস্থিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে বলেন, এখন কি আমাকে আবেদন করে মুক্তিযোদ্ধা হতে হবে?
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, কেবল গুলি ফুটিয়ে যুদ্ধ হয় না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেশে বিদেশে যারা জনমত গঠন করেছেন তারাও মুক্তিযোদ্ধা। প্রবাসে যারা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাদের নাম অর্ন্তভূক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, যে জাতির কৃতজ্ঞতাবোধ নেই, সে জাতি কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখেছেন তাদের সকলকে আমাদের শ্রদ্ধা জানাতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব বলেন, সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কমপ্লেক্সে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ছবি, বই, স্মারক নিয় একটি সংগ্রহশালা করা হচ্ছে। সেখানে প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি কর্ণার থকবে।
সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন লন্ডন ১৯৭১’র উদ্যোক্তা উজ্জ্বল দাশ ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের সিলেট সেন্টার প্রধান মো. কাফিল হোসেইন চৌধুরী ।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগীতায় বিলেতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্রের কাটিং, পোস্টার, প্রচারপত্র ও ঐতিহাসিক ছবি নিয়ে চারদিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
আপনার মন্তব্য