শাকিলা ববি, হবিগঞ্জ

০১ মার্চ, ২০১৭ ০৩:৩৩

বন্দোবস্ত পাওয়ার আশায় গুনই গ্রামের আড়াইশ’ ভূমিহীন পরিবার

“গ্রামের ভিতরে আমরার জাগা আছিল। আমার অরি (শাশুড়ি) অসুস্থ আছলা। গরিবের সংসার, তাইনের চিকিৎসার ল্যাইগ্গা জাগা জমি বেইচ্চা লাইছি। এরপরে পরের বারিত থাকছি বহুত দিন। আমার পরিবার বড় হওয়ায় পরের বাড়িত ও বেশিদিন থাকতে পারছি না। কেনোখানো থাকার জায়গা না পাইয়া বড়খালের পাড়ো আমার স্বামী আমরাররে লইয়া থাকা শুরু করুইন। আমরার দেখাদেখি আরো ৬/৭টা পরিবার এখানো আইয়া ঘর বানাইয়া থাকা শুরু করে। হেরার ও আমরার মত ভিটা-বাড়ি নাই। আমরা ইখানো আওয়ার পরে দেশওলায় (গ্রামের মুরব্বি) কত আপত্তি দিছইন। ইজাগা থেইক্কা আমরার তুলবার ল্যাইগ্গা অনেক চেষ্টা করছইন তারা। দেশওয়ালার (গ্রামের মুরব্বি) সাথে অনেক যুদ্ধ কইরা ১১ বছর যাবত আমরা টিক্কা আছি ইখনো।”

কথাগুলো বললেন বড়খালের পুবপাড়ে বসবাসরত ভূমিহীন মায়তন বিবি। স্বামী আলাউদ্দিনকে নিয়ে তিনিই প্রথম বড়খালের পুবপাড়ে বসবাস শুরু করেন।

হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বড়উউড়ি ইউনিয়নের দুর্গম ভাটির গ্রাম গুনই। এ গ্রামেই স্বামী সন্তান নিয়ে মোটামুটি শান্তিতে বসবাস করতেন মায়তন বিবি। প্রায় ১১ বছর আগে মায়তুনের শাশুড়ি গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার খরচ যোগাতে পর্যায়ক্রমে ধানী জমি ও পরে বসত বাড়িটিও বিক্রি করতে বাদ্য হন মায়াতুনের স্বামী আলাউদ্দিন। বছরখানেক বাস্তুহারা অবস্থায় গ্রামেরই এর-ওর বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বসবাস করে এক পর্যায়ে গুনই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বড়খালের পুব পাড়ে এসে বসতি স্থাপন করেন তারা। তার দেখাদেখি আরো কয়েকটি পরিবার এসে বড়খালের পাড়ে বসবাস শুরু করে।

প্রায় বছরতিনেকের মধ্যে গুনইয়ের আড়াইশ’ পরিবার বড়খালের পাড়ে বসতি স্থাপন করে ধীরে ধীরে এটিকে একটি আবাদি পল্লীতে পরিণত করেন বলে জানান ঐ পল্লীর বাসিন্দা রাজা মিয়া। এক পর্যায়ে বসতি স্থাপনকারী ভূমিহীনরা এ পল্লীর নাম দেন ‘শান্তি পাড়া’।

সরজমিনে কিছু পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদেরও মূল গ্রাম থেকে সরে আসা ও বড়খালের পাড়ে বসতি স্থাপন করার গল্প প্রায় একই। শান্তি পাড়ায় বসতি স্থাপনের শুরুতে প্রতিটি পরিবারই নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা অনুসারে সাধ্যমত জমির দখল নিয়েছেন।

গুনই গ্রাম থেকে বড়খালের পাড়ে শান্তি পাড়ায় এসে বসতি স্থাপন করার গল্পটা যত সহজে বলা হল, প্রকৃত পক্ষে কোনো ভূমিহীন পরিবারের পক্ষেই বিষয়টি এত সহজ ছিল না। ২০০৬ সালের শুরু থেকে শান্তি পাড়ায় বসতি স্থাপনকারী প্রতিটি পরিবারকেই গুনই গ্রামের মাতব্বর ও প্রভাবশালী মহলের নিকট থেকে ব্যাপক বাধ-বিপত্তি ও গ্রাম্য রাজনীতির কোপানলে পড়তে হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। যখন বাধা এসেছে, তখন সমবেত ভাবে হাতে হাতে লাটি নিয়ে প্রতিরোধ করেছেন। তবে এটিও নিতান্ত সহজ ভাবে ঘটেনি। ভূমিহীনদের নিজেদের মধ্যেও ব্যাপক অনৈক্য এবং সুবিধাবাদিতা তাদেরকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে।

এর সুযোগ নিয়ে জায়গা বন্দোবস্তের নামে, প্রতারক চক্র বিভিন্ন সময় বড় অংকের টাকাও হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানান শান্তি পাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রহিম।

শান্তিপাড়ার বাসিন্দারা স্থানীয় কোনো পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের নিকট থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পাননি। তবে জনপ্রতিনিধিরা তাদের ভোট ঠিকই আদায় করে নিয়েছেন ভূমিহীনদের নিকট থেকে।

শান্তিপাড়ায় বসবাসকারী রেজিয়া বিবি জানান, ৮ বছর যাবত তিনি এ জায়গায় বসবাস করছেন কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারী কোনো অনুদান বা বিভিন্ন সময় ইউনিয়ন পরিষদে আসা চাল গম তাদেরকে দেয়া হয়নি।

গুনই গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে কিন্তু শান্তি পাড়ায় এখনোও বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছায়নি। এ সম্পর্কে ঐ পাড়ার বাসিন্দা হেনা বেগম বলেন, “আমরার এই জাগার কোনো রেকর্ড নাই, কাগজ পত্র নাই এর ল্যাইগা কারেন্টে ও আনতে পারি না আমরা।” হারিকেন, কুপি বাতি ছাড়াও শান্তিপাড়ার বাসিন্দারা অনেকেই নিজ খরচে টিনের চালার উপড়ে ছোট আকারের সৌরবিদ্যুত প্যানেল বসিয়েছেন ।

শান্তি পাড়ার আড়াইশ’ পরিবারের শিশুদের জন্য পল্লীতে নেই কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অদূরে গুনই যাওয়ার সদর রাস্তার নিকটে আছে একটি এতিমখানা। আর প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে গুনইয়ের মূল ভূখণ্ডে আছে একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।

নানা অসুখ-বিসুখে ফার্মেসিত কাজ করা ‘ডাক্তার সাহেব’রা-ই শান্তি পাড়ার লোকজনের চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভরসা। মাঝে মাঝে গর্ভবতী মায়ের সন্তান জন্মদানের মত জরুরী চিকিৎসার প্রয়োজনে ছুটে যেতে হয় ৩ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বে অবস্থিত ইমামবাড়ি বাজারে। সেখানে কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা সম্ভব না হলে ছুটতে হয় নবীগঞ্জ উপজেলা সদর অথবা জেলা সদরে। কারণ সদর বানিয়াচং উপজেলার সঙ্গে গুনই অথবা শান্তিপাড়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই আদিম পর্যায়ে রয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরত্ব পেরুতে শুকনো মৌসুমে পা ও বর্ষা মৌসুমে নৌকাই ভরসা।

জানা যায়, আড়াইশ’ পরিবারের বসত ভিটা, জলাশয় ও ধানি জমি মিলিয়ে প্রায় ৮০ একর খাস জমি ভূমিহীনরা বন্দোবস্ত পাওয়ার জন্য বহুবার বহু কর্মসূচী পালন করেছেন। তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করেছেন, স্মারকলিপি দিয়েছেন, অনেক মিছিল-সমাবেশ করেছেন। ভূমিহীনদেরই একজন বাদি হয়ে হবিগঞ্জ আদালতে একটি মামলাও করেছেন। কিছুদিন পর মামলাটি ‘সরকার বাদি’ হয়ে যাওয়ার পর মামলার অগ্রগতি সমর্পকে বর্তমানে তারা কিছু জানেন না ।

এক দশকেরও বেশি কাল ধরে আইনগতভাবে উদ্বাস্তু হয়ে থাকা আড়াইশ’ ভূমিহীন পরিবার এ পর্যন্ত সরকার, সরকারীদল ও প্রধান বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহলের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানা যায়নি। শুধুমাত্র একটি বামপন্থী রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদ’ উল্লিখিত ভূমিহীনদের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করে আসছে বলে জানান শান্তি পাড়ার বাসিন্দারা।

পুরো পল্লী ঘুরে দেখা গেছে, তারা নিজেদের মত করে জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিজেরাই উৎপাদনের চেষ্টা করছেন। শাক-সবজির বাগান করছেন, মাছ, হাঁস-মুরগী ও গবাদি পশু পালন করছেন। শান্তি পাড়ার বাসিন্দারা জানান, খালের পাড়ে বসবাসের কারণে তাদের সাথে সাথে কেউ আত্মীয়তা করতে চান না। এজন্য নিজেদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন অটুট রাখতে নিজেদের পল্লীতেই আত্মীয়তার সম্বন্ধ তৈরি করছেন। এক বাড়ির তরুণীর সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে অন্য বাড়ির তরুণের।

বাংলাদেশের ভূমিহীন মানুষের সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে শান্তিপাড়ার ভূমিহীনদের চালচিত্র হয়তো ব্যতিক্রমধর্মী কিছু নয়, তবে তাদের সংকট তাদেরই। এখনকার বাসিন্দারা শেষ পর্যন্ত তাদের বসবাস ও চাষের জমিটুকুতে আইনগত অধিকার চান। আর দশজন নাগরিকের মত মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চান বলে জানান শান্তি পাড়ার বাসিন্দারা।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) রোকন উদ্দিন বলেন, সরকার চাচ্ছে ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত দিতে। উচ্চ আদালতের কোনো স্থগিতাদেশ না থাকলে বন্দোবস্ত দেয়া যাবে। গুনই গ্রামের প্রায় ২৫টি পরিবার এখন পর্যন্ত আবেদন করেছে। বন্দোবস্ত নেয়ার ব্যাপারে সাধারণ জনগণকে আরো সচেতন হতে হবে। টাকা দিয়ে বন্দোবস্ত নেয়ার কোনো নিয়ম নেই। শুধুমাত্র ১টাকা সালামির বিনিময়ে বন্দোবস্ত দিবে সরকার। বন্দোবস্ত নেয়ার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে ভূমিহীনদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এসিল্যান্ড অফিসে ভূমিহীনরা দরখাস্ত করবে। খাস জায়গা যদি কারো দখলে থাকে তবে তিনি অগ্রাধিকার পাবেন। যদি সে জায়গায় পাকা বিল্ডিং করে সে ক্ষেত্রে তাকে উচ্ছেদ করে প্রকৃত ভূমিহীনকে দেয়া হবে। সাধারণত বাড়ির জন্য ১ থেকে ৩ শতাংশ ও ও কৃষিকাজের জন্য ১ একর পর্যন্ত জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়। যদি কোনো ভূমিহীন কাচা বাড়ি করে থাকে তবে তিনি আবশ্যিক ভাবে কমপক্ষে ৩ শতাংশ জায়গা বন্দোবস্ত পাবেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত