নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩ মার্চ, ২০১৭ ১৫:৪৫

সিলেটকে বদলে দেবে যে ভাবনাচিত্রের বাস্তবায়ন

বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসবের শেষ দিন

সিলেট শহর ও অঞ্চল ইতিহাসের বহু ধারায় উৎকর্ষিত। হাওর-বাওর, নদী-ছড়া, পাহাড়-টিলা নিয়ে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ। সিলেটের অর্থনীতি গতিশীল। সংস্কৃতি আঞ্চলিকভাবে ঐশ্বর্যমণ্ডিত, আর লন্ডনের মাত্রা যুক্ত করলে এর প্রসার হয় আন্তর্জাতিক, সিলেট শহরের বাড়িঘর ও পাড়া-পরিবেশের অবস্থা এখনো অনুপম। সব মিলে সিলেট অনন্য। সিলেট অঞ্চল ও শহরের অন্যান্য অবস্থা ধরে রাখা ও আরো সমৃদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন একটি নতুন নাগরিক কল্পনা ও ভাবনাচিত্র।

সিলেটে চলমান বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসবের দশম ও শেষ দিন শুক্রবার (৩ মার্চ) সকাল ১১টায় সৈয়দ মুজতবা আলী মঞ্চে 'আগামীর সিলেট' নিয়ে বিশেষ উপস্থাপনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বেঙ্গল ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর জেনারেল কাজী খালেদ আশরাফ বলেন, আমরা আর্কিটেক্ট নিয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কাজ করি আর আমাদের কাজ গবেষণামূলক। সুযোগ পেলেই আমরা তা প্রচার করি। আমরা সব সময় নতুন ধারণা দেয়ার চেষ্টা করি। আমরা ঢাকার মেয়রদের সাথে এ বিষয়ে কাজ করেছি। এমনকি আমরা অনেক বিদেশি সংস্থার সাথেও কাজ করেছি।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালের অক্টোবরে আমাদের সিলেট আসা ড. আব্দুল মোমেনের আমন্ত্রণে। সিলেটকে ৫টি মোড়কে গোছানোর একটা পরিকল্পনা করার জন্য। তখন আমরা এসে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে, অলিতে-গলিতে হেঁটে সিলেটকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করি। এগুলো করতে গিয়ে আমরা সিলেটবাসীকে ভালোবেসে ফেলেছি। যা করেছি আমরা ভালোবেসেই করেছি, প্রফেশনালি নয়। আর ভালোবাসা, কেয়ার না থাকলে শহরকে গোছানো যাবে না।

তিনি আরো বলেন, সিলেট শহর সত্যিকার অর্থে অনবদ্য। অবিশ্বাস্য ঐশ্বর্য আছে এখানে। চা বাগানের ভেতর দিয়ে শহরে প্রবেশ করা- এটা সত্যি অসাধারণ। সিলেটে চারদিকে যে ল্যান্ডস্কেপ এসেট, তা চট্টগ্রাম ছাড়া আর কোথাও নেই। সিলেট শহর ইকোনমিকালি অনেকটা উপরে। সিলেটের ছোট ছোট অলিতে-গলিতে হেঁটে আমরা অনেক পুরনো বাড়ি পেয়েছি। ঢাকাতে এরকম বাড়ি পাওয়া সম্ভবই না। চা বাগান ও সিলেটের আদিবাড়িগুলো নিয়ে কাজ করা যাতে পারে। আগামীর সিলেটে আমরা উপস্থাপন করেছি রিং রোডের ধারণা, কাজিরবাজার-কিন ব্রিজের মধ্যবর্তী জায়গা নিয়ে আমরা গভীরভাবে চিন্তা করেছি। চত্বরের পাশে অডিটোরিয়ামের একটা ধারণা দিয়েছি। তাছাড়া ছড়া নিয়ে কাজ করার এক অভিনব সুযোগ সিলেটে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা গ্যালারি, চত্বর, ত্রিমুখী রাস্তা- এসব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে। শহর বাড়ির আশেপাশের প্রত্যেকটা মানুষকে নিয়ে গড়ে উঠে। শহর মানে কোন বাউন্ডারি না। শহর মানে শহরের পাশেও একটা জায়গা আছে। সিলেটে এতো সম্ভাবনা আছে যে সিলেটকে নতুনভাবে আদর্শ শহর হিসেবে গড়ে তোলা যায়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন কামরান, জীনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী, জেরিনা হোসেন ও বেঙ্গল ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর (রিসার্চ) সাইফুল হক।

সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী পরিষদের সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, সিলেটকে নিয়ে আমরা যতই গর্ব করি না কেন সিলেট অগোছালো শহর। এখন বেঙ্গল আমাদেরকে যে চিন্তার সুযোগ করে দিয়েছে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। দখল হয়ে যাওয়া ছড়াগুলোকে উদ্ধার করতে হবে। সিলেটকে নিজের শহর ভাবতে হবে। সিলেট বিভাগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উপজাতিদের নিয়ে এবং পর্যটন শিল্পকে নিয়ে ভাবতে হবে। সিলেটের বাঁশ বেত শিল্পকে প্রাধান্য দিতে হবে। আগামীর সিলেট নিয়ে ভাবনা যেন বন্ধ না হয় সে বিষয়টিকে নিয়ে চিন্তাশীল হতে হবে। বর্তমানে যে মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী সিলেটের উন্নয়ন কাজ চলছে সে বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই আরও পরিকল্পনা করতে হবে।

তিনি এসময় বলেন, সিলেটবাসীকে বিগত ১০ দিন ধরে যে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ করে দিয়েছে বেঙ্গল, তার জন্য তিনি বেঙ্গল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান। সেই সাথে সিলেটবাসীর কোন ধরনের আচরণে সামান্যতম দু:খ পেয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান।

স্থপতি জেরিনা উদ্দিন বলেন, সিলেটবাসী আজকাল নানা ধরনের ভীতির কারনে নিজেদেরকে আড়াল করে ফেলছে। তবে এখনও পাড়া মহল্লার কমিউনিটি এখনও স্ট্র্রং আছে। তিনি বলেন, নিজের গহনা কিংবা কাপড়চোপর নিজের ভাবুন কিন্তু নিজেদের বাসস্থান রাস্তাঘাটকে জনগনের পরিসরে ভাবতে হবে। বিষয়টিকে সামষ্ঠিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে। আজকাল নিরেট দেয়াল দিয়ে মাঠগুলো ঘিরে ফেলা হচ্ছে। কিছু দিন আগেও এমনটি ছিলনা। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পুলিশ লাইন মাঠ কিংবা এমসি কলেজের মাঠকে ঘিরে নীল রঙ করে দেওয়া হয়েছে। যা শহরকে অসুন্দর করে তোলছে। তিনি সিলেটবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা বাড়ি তৈরি করছেন করেন কিন্তু বাড়ির আঙ্গিনা আর রাস্তাকে জনগনের পরিসরে ভাবতে হবে। গাছ লাগাতে হবে।

বিশ্বের খ্যাতনামা ধান গবেষক এবং জীন বিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই বৃহত্তর সিলেটের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান। কিন্তু এখন আমরা চলাচলে নদী ব্যবহার করি না। নদী এখন কবিতায় স্থান করে নিয়েছে। এখন নদীকে আমরা ভুলে যাচ্ছি। নদীর দিকে পিছন দিয়ে দিয়েছি আমরা। নদী হলো আবর্জনা ফেলার স্থান। এই সাইকোলজি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। কেন এমনটি হলো। একসময় নদীকে কেন্দ্র করে আবাদ শুরু হয়েছিল।

তিনি বলেন, সিলেট হচ্ছে প্রাচীন একটা শহর। এই শহরকে নতুন করে সাজাতেই এই পরিকল্পনা। ৬০ এর দশকে একটা কথা প্রচলিত ছিল- আলী আমজাদের ঘড়ি, চাদনীঘাটের সিড়ি, এক ইটের মসজিদ বাড়ি। সিলেটে পায়ে হাটা পথ তৈরির কথা বলা হচ্ছে সেখানে সিলেটের সংস্কৃতি ভাষাকে স্থান দিতে হবে। মানুষজন হাটতে হাটতে সিলেটের গান শুনবে, সিলেটের ‘মাত’ শুনবে।

আবেদ চৌধুরী বলেন, সিলেটকে বলা হত শাহজালালের পূণ্যভূমি, শ্রীচৈতণ্যের জন্মভূমি আর বিপীন পালের কর্মভূমি। এ কথাগুলো অসাম্প্রদায়িক সিলেটের ঐতিহ্যকে ধারণ করে। সিলেটের ভবিষ্যত নগর পরিকল্পনায় নাগরিক পরিসর নির্মাণে এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন থাকতে হবে।

তিনি একটি নুতন তথ্য তুলে ধরে বলেন, সাম্প্রতিক নৃতাত্বিক গবেষণায় পাওয়া গিয়েছে যে, হিউম্যান মাইগ্রেশন আফ্রিকা থেকে শুরু হয়ে পূর্ব এশিয়ার সিলেট অঞ্চল হয়ে চীন অভিমূখে যায় এবং তা আরও উত্তরে গিয়ে পরে পশ্চিম অভিমূখে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছে। সুতরাং সিলেট শুধু হাজার বছর নয়, এই পৃথিবীর লক্ষ্য বছরের ইতিহাসে অংশীদার।

 

তিনি বলেন, সিলেট শহরকে সুন্দরভাবে সাজাতে 'আগামীর সিলেট' পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত