০৪ মার্চ, ২০১৭ ১৬:৩৩
সিলেটে দশ দিনব্যাপী বেঙ্গল উৎসব শেষ হয়েছে শুক্রবার রাতে। তবে উৎসব শেষ হলেও এর রেশ এখনো রয়ে গেছে। আজ (শনিবার) অনলাইন ও অফলাইনে চলছে শেষ হয়ে যাওয়া এই উৎসব নিয়েই আলোচনা। ফেসবুকে ভাসছে উৎসব শেষ হয়ে যাওয়ার আফসোস।
শুক্রবার উৎসবের শেষদিনে কথা হয়েছিলো বেশ কয়েকজন দর্শকের সাথে। সবারই মুখে এক কথা, আবার কবে হবে এ ধরণের উৎসব?
সংস্কৃতি কর্মী কাবেরি পাল বলেন, আয়োজনটা ছিল বিশাল। উপভোগ করার মত। বিশেষ করে শিল্পী নির্বাচন অনেক ভালো ছিল। যেমন- শ্রীকান্ত, হৈমন্তী শুক্লা, জয়তী চক্রবর্তী, কৃষ্ণকলি, মনোময় ভট্টাচার্য, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, ফেরদৌসি আরা, পার্বতী বাউল। আর আমাদের বাংলার এই সংস্কৃতিকে তোলে ধরে অনেক অজানাকে আমরা জেনেছি। এইটা আমাদের জন্য এক বিশাল পাওয়া।
কানাডা প্রবাসী তরপদার নুরুর রহমান বলেন, বৃহত্তর সিলেটের মানুষ শুধু ফোক গান বোঝে। কিন্তু এর বাইরেও সংগীতের একটা জগত আছে তা বেঙ্গল ফাউন্ডেশন সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছে। রবীন্দ্র, নজরুল ও আধুনিক গানগুলো এখানে উপস্থাপন হয়েছে। যদিও ঢাকার অনুষ্ঠানগুলোর মত এখানে উচ্চাঙ্গসংগীত ছিল না। হৈমন্তী শুক্লা, শ্রীকান্তের মত শিল্পী প্রথমবারের মত সিলেট এসেছেন। বৃহত্তর সিলেটে অনেক বিত্তশালীদের বসবাস। কিন্তু কেউ সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন। তাদের সবার উচিত সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে, চর্চার জন্য এই খাতে বিনিয়োগ করা। এ ধরনের অনুষ্ঠানের মধ্যে সংস্কৃতি চর্চায় আমাদের আরো সমৃদ্ধ করবে।
উৎসব আয়োজনে কিছু ত্রুটিও চোখে পড়েছে তার। তিনি বলেন, এই অনুষ্ঠানের পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও টয়লেটের ব্যবস্থা ছিল না। যা ছিল তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। পরবর্তী কোন অনুষ্ঠানে এই সুবিধা আরো বাড়ানোর দরকার।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি পরিচালক খলিলুর রহমান ফয়সল বলেন, বেঙ্গল সিলেটে সংস্কৃতি চর্চার নতুন একটা মাত্রা দিল। বহুদিন এরকম গোছানো কোন আয়োজন দেখি নি। দেশ বিদেশের শিল্পীদের নিয়ে শুদ্ধ বাংলা সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বেঙ্গল। মনে হয়েছে প্রাণের উৎসব। বিকেল হলেই মানুষের মিলনমেলা জমতো। সারা মাঠ জুড়ে মনে হয়েছে বসন্তের রঙ লেগেছে।
বেসরকারি কলেজের শিক্ষক আমিন উদ্দিন বলেন, মানুষ কাজের পর বিশ্রাম নিয়ে যে বিপুল উদ্দীপনায় কাজ করে চিত্তবিনোদন ঠিক একইভাবে মানুষের কাজের উৎসাহকে দিগুণ বাড়িয়ে দেয়। বেঙ্গলের এই সংস্কৃতি উৎসব সিলেটের সমস্ত পরিশ্রমী মানুষকে বিপুল এক বিরাট অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছে। সকল মানুষ আগ্রহ ও গৌরবের সাথে এ উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে। অনেক সাধারণ মানুষ, সংস্কৃতিমনা ও বিখ্যাত মানুষদের সরাসরি দেখতে পেরেছে। আর তাও একদম ফ্রী রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে। অনেক সাধারণ মানুষের এই সচ্ছলতা থাকে না যে টিকেট কেটে এই ধরণের প্রোগ্রাম দেখার। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে অনেক ধন্যবাদ ফ্রিতে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে এ ধরণের অনুষ্ঠান সিলেটবাসীকে দেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
সাংবাদিক হাসানাত কামাল বলেন, বেঙ্গল উৎসব সিলেটে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এক সাথে এই পর্যায়ের এতো শিল্পী এর আগে কখনও সিলেটে আসেননি। উৎসবের আবহ, স্ট্যান্ডার্ড, রুচিশীলতা, শৃংখলা- আমি বলবো সব মিলিয়ে এক অনন্য আয়োজন। এটা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে।
শুধুই যে সঙ্গীত, নাটক কিংবা চলচ্চিত্র তা নয়, বাদ্যযন্ত্রের প্রদর্শন ও ইতিহাস, কারুশিল্প, স্থাপত্য প্রদর্শনী, লোকগান ও লোকশিল্পী, সাহিত্যিকদের ইতিহাস, আর্ট ক্যাম্প সবকিছু ছিলো অনন্য সংযোজন। এমনকি খাবারের স্টলের মান ও রুচিশীলতা, আবার দামটাও সূলভ- এটা নজর কেড়েছে। সাধারণত এ রকম অনুষ্ঠানে খাবার ও পণ্যের দাম অনেকগুণ বেশি থাকে। এখানে তা হয়নি। কি আশ্চর্য্য্ এতো বড় আয়োজনে একটা মশাও কামড় দেয়নি। সেটা করা হেয়েছে, তাও শৈল্পিকভাবে।
সিলেট এমসি কলেজের সম্মান চতুর্থ বর্ষের ছাত্র পাপলু দে বলেন, অনেক গুণী মানুষদের অনেক কাছ থেকে দেখলাম। আমাদের সংস্কৃতি বিশেষ করে সিলেটের সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশদ জানতে পারলাম। সিলেটের অতীত, বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যতের রুপরেখা সম্বন্ধে জানতে ও দেখতে পারলাম। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা শুদ্ধ বাংলা সংস্কৃতি দেখতে পেয়েছি। । অনেক বাদ্যযন্ত্র, গান , শিল্প ইত্যাদির সাথে পরিচিত হই যা এ অনুষ্ঠান ছাড়া সম্ভব হত না। এই রকমের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে সিলেটবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। সিলেটে এই রকম অনুষ্ঠান আমরা আরো চাই। এই ধরণের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুরা আমাদের শিকড় সম্বন্ধে জানতে পারবে। আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে আমাদের এই ধরণের অনুষ্ঠান খুবই দরকার।
মুরারি চাঁদ কলেজের সম্মান শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী প্রার্থীতা পিমা বলেন, প্রথমেই এই সংস্কৃতি উৎসবের জন্য বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে অনেক ধন্যবাদ এতো সুন্দর একটা আয়োজনের জন্য। একটি সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়েছে। অনুষ্ঠানের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিল আমাদের বাংলার সংস্কৃতি। বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক গুণী শিল্পীদের আগমন ঘটেছে এখানে। তাদের আমরা সরাসরি দেখতে পেরেছি। তাদের গলায় বিভিন্ন জনপ্রিয় গান উপভোগ করতে পেরেছি। অনেক বাদ্যযন্ত্র ছিল আমাদের অজানা সেগুলোর সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। আগামীর সিলেটকে নিয়ে যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে তা অনেক ভালো লেগেছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কাছে আমার প্রত্যাশা তারা যেন সিলেটে আবারো সংস্কৃতির এ উৎসব নিয়ে আসেন। আর বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারের স্বাদ ছিল সত্যিই অসাধারণ। আর তার সাথে ছিল মিষ্টির বাহার।
এমসি কলেজের শিক্ষার্থী জাকারিয়া হোসেন বলেন, অনুষ্ঠানটা এক কথায় ছিল অসাধারণ। আশা করি প্রত্যেক বছর এ ধরণের উৎসবের। সিলেটের মধ্যে এতো বড় পরিসরে সংস্কৃতির উৎসব এই প্রথম। মানুষের মাঝে আলাদা একটা নন্দ ছিল। প্রত্যেক বছর আমরা এরকম অনুষ্ঠান চাই।
মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত সিনহা বলেন, আগ্রহটা জন্মেছিল ইউটিউবে বিগত উৎসবগুলোর ভিডিও দেখে । অপেক্ষায় ছিলাম কবে সরাসরি এই উৎসব দেখার সুযোগ পাব। এই বছর সিলেটে হওয়ার খবর শুনে অনেক খুশি হই। আনন্দ শতগুন হলো শিল্পী, কলাকুশলীদের তালিকা দেখে। পছন্দের শিল্পী, প্রিয় লেখক, দেখব দেখব করে দেখা হয়নি এমন সব মুভি সব মিলিয়ে এলাহীকান্ড। টেলিভিশন, জলের গান দিয়ে শুরু এবং ঘাসফুল, শফি মন্ডল দিয়ে শেষ। কুদ্দুস বয়াতির পালাগান, কৃষ্ণকলির গান কিংবা শ্রীকান্ত আচার্য্য, রেজওয়ানা চৌধুরীর রবীন্দ্রসংগীত, বাদ দেইনি কোন কিছুই। এ উৎসব অনেকগুলো ইচ্ছা পূরন করে দিল। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ দিতেই হয় । এরকম উৎসব সিলেটে আবার হোক, বারবার হোক এবং আরো বড় পরিসরে হোক এই প্রত্যাশা করি।
আপনার মন্তব্য