শাকিলা ববি, হবিগঞ্জ

০৮ মার্চ, ২০১৭ ১১:৩৮

নারী: পরিবারের পাশাপাশি কাজ করেন সড়ক রক্ষণাবেক্ষণেও

প্রায় ৪ বছর আগে আকস্মিক স্বামী মারা যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ৫নং গোপায়া ইউনিয়নের বহুলা গ্রামের লাকী আক্তারের স্বামী আলতাব আলী। ৪ মেয়ে নিয়ে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়ে তার। দিশেহারা অবস্থায় কিছু দিন চলার পর তিনি গ্রামের চেয়ারম্যান-মেম্বারের সহযোগিতায়  এলজিইডি (রুরাল এমপ্লয়মেন্ট এন্ড রোড মেইনটেনন্স প্রোগ্রাম) আর.ই.আর.এম.পি-২ প্রকল্পের আওতাধীন রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করেন। ৫ জনের সংসারে একমাত্র উপার্জনকারী লাকী আক্তারের মূল আয়ের উৎস এই আর.ই.আর.এম.পি-২ প্রকল্প থেকে পাওয়া বেতন। এছাড়াও বিভিন্ন সময় মানুষের বাড়িতে কাজসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করে ৪ মেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছেন তিনি। বড় মেয়ে বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে। মেঝে মেয়ে এবছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে এবং বাকি ২ মেয়েও মাধ্যমিক ও প্রাথমিকে পর্যায়ে লেখাপড়া করেছে বলে জানান লাকী আক্তার।  

হবিগঞ্জ শহর পেরিয়ে কিছু দূরে হাইওয়ের ডান পাশে ৫নং গোপায়া ইউনিয়নের, নারায়নপুর-দিগলবাগ রাস্তায় সবুজ ইউনিফরম পরে কাজ করছেন বেশ কয়েকজন মহিলা। আলাপকালে জানা গেলো তারা এলজিইডি (রুরাল এমপ্লয়মেন্ট এন্ড রোড মেইনটেনন্স প্রোগ্রাম) আর.ই.আর.এম.পি-২ প্রকল্পে রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন। তাদের সুপারভিশন করছেন কমিউনিটি অরগানাইজার মো. মানিক মিয়া। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেলে এখানে কর্মরত বেশিরভাগ মহিলারা বিধবা, না হয় স্বামী পরিত্যক্তা এবং হত দরিদ্র। তাদের সবারই আয়ের উৎস এই প্রকল্প থেকে পাওয়া অর্থ।

ফাল্গুনের হঠাৎ বৃষ্টির আগমনে নারায়নপুর-দিগলবাগ পাকা রাস্তার পাশের যে মাটিগুলো সরে গেছে সেগুলো ঠিক করছেন পারভিন, ছায়া, আম্বিয়া, ফুলরাজ, সালেমা, মালেকা, শাহেনা, লাকী, হনুফা ও শাহেনা বেগম। রাস্তারা পাশের জমি থেকে ১ কোদাল ২ কোদাল করে মাটি নিয়ে ঠিক করছেন রেইনকাট হওয়া জায়গাগুলো।

রাস্তায় কর্মরত ৪২ বছর বয়সী রেহেনা বেগম জানান, প্রায় ১৮ বছর আগে ১ ছেলে নিয়ে স্বামীর ঘর থেকে চলে আসতে হয় তাকে। এর পর থেকে মানুষের বাড়িতে কাজ করে তার ছেলেকে বড় করেছেন তিনি। তিনি বলেন, এই কাজ পাওয়ার পর আর মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হয়নি। এখন থেকে যে টাকা পাই সেটা দিয়ে মোটামুটি চলে যায় আমার সংসার।
হবিগঞ্জ জেলার এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আর.ই.আর.এম.পি-২ প্রকল্পের আওতায় হবিগঞ্জ জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ১০ জন করে মহিলা কর্মরত আছেন। দুস্থ, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত মহিলাদের অগ্রাধিকার দিয়ে এই প্রকল্পে নিয়োগ দেয়া হয়। এ প্রকল্পের অধিনে সারা বছরই নারী কর্মীরা রাস্তা সংস্কার ও পরিচ্ছন্ন করার কাজ করে থাকেন। হবিগঞ্জ জেলার ৭৭টি ইউনিয়নে ৭৭০ জন মহিলা বর্তমানে কর্মরত আছেন। তারা প্রতিদিন ১৫০ টাকা হারে বেতন পায়। যা থেকে ৫০ টাকা তাদের সবার পৃথক সঞ্চয়ি হিসাব নাম্বারে জমা থাকে। প্রতিটি ইউনিয়নে ১০ জন মহিলা নিয়ে একটি কমিটি আছে। তাদের বেতনের টাকা কমিটির ২ জন দলনেত্রীর যৌথ একাউন্টে জমা হয়। সঞ্চয় এর টাকা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রত্যেক কর্মজীবী মহিলার যৌথ  একাউন্টে জমা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতিদিন ৫০ টাকা করে জমাকৃত সঞ্চয় এককালীন দেয়া হবে কর্মীদের। ৫ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের আগামী ১৮ জুন মেয়াদ শেষ হবে।

৫নং গোপায়া ইউনিয়নের আর.ই.আর.এম.পি-২ প্রকল্পের দলনেত্রী  পারভিন আক্তার ও ছায়া বেগম বলেন, আমাদের ইউনিয়নের ১০জন গরীব, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে আমদের দল। সকাল থেকে দুপুরের মধ্যেই এই রাস্তার কাজগুলো আমরা করে নিতে পারি আমরা। সকালে রান্নার কাজ শেষ করেই কাজে আসা যায়। দুপুরে বাড়ি গিয়ে আবার ঘরের কাজ ও করতে পারি। গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি এ কাজ করায়  আমরা আর্থিকভাবেও সচ্ছল হচ্ছি। তারা আরো বলেন , আমাদের বেতনের টাকা আমাদের ২ জনের যৌথ একাউন্টে আসে। আর সঞ্চয়ের ৫০ টাকা অফিস থেকেই ইঞ্জিনিয়ার স্যারের সাথে সবার যৌথ একাউন্টে জমা থাকে।  

এলজিইডি জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দর বলেন, অসহায় ও দুস্থ মহিলাদের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যেই এলজিইডি আর.ই.আর.এম.পি-২ প্রকল্প কাজ করছে। ১ম বার এই প্রকল্পের কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় ২য় বারের মত এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দিক হলো প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এখানে কর্মরত নারীরা এককালীন বড় অংকের অর্থ পাবেন। যে অর্থ পাবেন সেটা তাদেরই জমাকৃত সঞ্চয়। এছাড়াও বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে এই দুস্থ মহিলাদের বিভিন্ন ধরনের মোটিভেশন ট্রেনিং দেয়া হয়। নারী কর্মসংস্থান ও দারিদ্র বিমোচনে এলজিইডির  আর.ই.আর.এম.পি-২ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে আমরা মনে করি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত