১২ মার্চ, ২০১৮ ১৯:১২
মধ্যরাতে স্থানীয় একজন সংবাদকর্মীর ফোন, 'তানিয়া আপু এখন কি রাজনগর আসতে পারবেন? একটা মেছো বাঘ জনতার হাতে ধরা পড়ছে। এখন না উদ্ধার করলে এলাকাবাসী মেরে ফেলবে। তানিয়া খান আসছি বলে মধ্যরাতে সিএনজি নিয়ে ছুটে গেলেন রাজনগর। গিয়ে বুঝতে পারলেন আরেকটু দেরী হলে মেছো বাঘটি মেরে ফেলা হতো। উত্তেজিত জনতা বাঘটিকে মারতে না পেরে সব রাগ তানিয়ার ওপর মেটাতে চাইলেন। কিন্তু স্থানীয় থানার পুলিশ উপস্থিত থাকায় মেছো বাঘটিকে নিরাপদে নিয়ে আসতে পারলেন। এভাবেই ১০ বছর ধরে মৌলভীবাজার জেলাজুড়ে বন্যপ্রাণী রক্ষায় বনবিভাগের পাশাপাশি স্বেচ্ছায় কাজ করে যাচ্ছেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষক ও সেবক তানিয়া খান। বনবিভাগ থেকে যখনই কোন প্রাণী উদ্ধারের বা সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয় তানিয়া খান ছুটে যান রাত-বিরাতে বনজঙ্গলে।
অসুস্থ বন্যপ্রাণীদের উদ্ধারের পাশাপাশি নিজ ঘরে রেখে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলে আবারো তার আপন নিবাসে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কোন কোন প্রাণীর ক্ষেত্রে ৪/৫ মাস ঘরে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। এখন পর্যন্ত ৩০/৩৫ প্রজাতির ৫ হাজারের অধিক পাখি এবং ৮/৯ প্রজাতির ৪ শতাধিক বন্যপ্রাণীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন নিজের স্বেচ্ছাশ্রমে।
তানিয়া খান জানান, তিনি যখন স্কুলে ভর্তি হননি তখন থেকেই উনার বাবা মো. ওয়াজেদুল ইসলাম বাড়ী ফেরার সময় প্রায়ই অসুস্থ কুকুর-বিড়ালের বাচ্চা নিয়ে আসতেন এবং তানিয়া খানকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব দিতেন। তানিয়া খান সে বয়সেই মায়ের মত পরম মমতায় যত্নসহকারে কোলে রেখে প্রাণীদের সুস্থ করে আবার মুক্ত করে দিতেন। সেই থেকে তার বন্যপ্রাণীর প্রতি অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করতে থাকে।
স্বামীর বাড়ী সুনামগঞ্জে হলেও স্বামী ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার এ.কে. এম মুনির আহমেদ খানের চাকুরীস্থল মৌলভীবাজার হওয়ায় ২০০৯ সাল থেকে এখানেই বসবাস শুরু করেন এবং স্থানীয় বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মত বিশাল এলাকায় শুরু হয় তার বিচরণ। ২০১৫ সালে স্বামী মারা গেলেও তিনি বন্যপ্রাণীর প্রেমে মৌলভীবাজারে থেকে যান।
তানিয়া খানের ৩ মেয়ে এবং ১ ছেলে। বড় ২ মেয়ে নিজেদের সংসার এবং চাকুরী নিয়ে ব্যস্ত ছোট মেয়ে এবং একমাত্র ছেলে সুনামগঞ্জে শাশুড়ির কাছে থেকে লেখাপড়া করে। মাঝে মাঝে মাকে দেখতে আসে। তবে সন্তানদের সবাই চায় তাদের মাকে তাদের সাথে রাখতে, তাদের অভিযোগ শুধু শুধু নিজের খেয়ে বন্যপ্রাণীর সেবা করার কি দরকার। সন্তানরা বিরক্ত হলেও শাশুড়ি উৎসাহ দিয়ে যান তাঁর কাজে। শাশুড়ি সংসারের চালিকা শক্তি।
তানিয়া খানের কাছে সন্তানের মত প্রিয় বন্যপ্রাণীরাও। বাসায় একজন কাজের মানুষ আর তিনি থাকেন। প্রতিটি রুমে, বারান্দায় শুধু প্রাণী আর প্রাণী। এই প্রাণীদের কোন কোনটার সুস্থতার জন্য চলছে চিকিৎসা, কোনটার আবার ২/৩ দিনের মধ্যেই অবমুক্ত করা হবে। আবার কোন কোন প্রাণী আছে ২/৩ মাস যাবত, চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। আশায় আছেন কবে সুস্থ হবে।
বনবিভাগ থেকে শুরু করে সাধারণ শিশু সবার কাছে প্রিয় নাম তানিয়া খান, বৈশাখী ঝড়ে আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে পাখি অসুস্থ হয়ে মাটিতে পড়ে থাকলে স্থানীয় শিশুরা তা দুহাতের তালুতে করে নিয়ে আসে তানিয়া খানের কাছে। তিনি তাদের সুস্থ করে তুলেন পরম মমতায়। প্রায়ই শিশুরা নিয়ে আসে অসুস্থ কুকুর-বিড়ালের বাচ্চা।
শুধু মৌলভীবাজার জেলা নয় এর বাহিরেও তানিয়া ছুটে যান বিভিন্ন এলাকায়। ২০১৩ সালে খবর পান সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের দুর্গম এলাকায় একটি বড় প্রজাতির পাখি আহত হয়েছে। পরে জানা যায় এটি বিরল প্রজাতির কালো শকুন। উৎসাহী জনতা এবং বাচ্চাকাচ্চারা টেনে তার পালক ছিঁড়ে ফেলেছে। সিদ্ধান্ত হয় পাখিটির চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
কিন্তু তখনকার বাংলাদেশ বার্ডক্লাবের সভাপতি জানান, এতো দূর অসুস্থ পাখিটি নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তানিয়া খান নিজের বাসায় রেখে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে প্রায় ৪ মাসে কালো শকুনটিকে সুস্থ করে তুলেন। পাখিটির পাখা গজায়, পরে দেওড়াছড়ায় বনবিভাগের সহযোগিতায় অবমুক্ত করেন।
সিলেটের ওসমানীনগর থেকে গত বছর উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন একটি মেছো বাঘ। কিছু দিন আগে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে আহত বিরল প্রজাতির একটি শকুনকে উদ্ধার করে মৌলভীবাজার বন বিভাগের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শকুনটিতে সুস্থ করার তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয় তানিয়া খানকে। তিনি তাঁর বাসায় ১৬ দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে সুস্থ করে তোলার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেন গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে।
তানিয়া খান জানান, বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেশী-বিদেশী সরকারি ও বেসরকারি অনেক সংস্থা থেকে বিভিন্ন বিষয়ে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা পেয়েছেন। স্থানীয় বনবিভাগ এত কম জনবল নিয়েও যেভাবে মৌলভীবাজারের বিশাল এলাকা নিয়ে কাজ করছে এবং তাকে সবদিক দিয়ে সহযোগিতা করছে তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। কাজ করতে গিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা পেয়েছেন আন্তরিকভাবে।
তানিয়া খান সবাইকে বন্যপ্রাণীকে ভালবাসার আহবান জানিয়ে বলেন, বন্যপ্রাণী ধ্বংস হয়ে গেলে হুমকিতে পড়বে মানবজাতি। বন্যপ্রাণীরা আমাদের ক্ষতি করেনি বরং আমরাই তাদের বসবাসের জায়গায় বসতি গড়ে তাদের ক্ষতি করছি।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দো জানান, বনবিভাগের জনবল সংকট কিন্তু তানিয়া খান যেভাবে আন্তরিকতার সাথে বন্যপ্রাণীদের নিয়ে কাজ করে এবং মাতৃস্নেহে প্রাণীদের লালন পালন করে তা পেশাদার কর্মীদের থেকে অনেক বেশী। তিনি তাঁর সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে আবেগের জায়গা থেকে কাজ করেন।
আপনার মন্তব্য