০১ মে, ২০১৮ ১২:৩২
চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন চা শ্রমিকরা। নারী চা শ্রমিকদের মধ্যে ১৫ শতাংশ প্রাথমিকভাবে জরায়ুমুখে ক্যান্সারের আক্রান্ত থাকার লক্ষণ পাওয়া গেছে। গবেষণা মূলক সংস্থা সিআইপিআরবি’র জরিপে এ ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।
দেশে মোট চা বাগান ১৬৪টি। চা বাগানের প্রায় ৯ লক্ষ জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী শ্রমিক। এই অর্ধেক নারী শ্রমিকের ১৫ শতাংশের শরীরে মরণ ব্যাধি ক্যান্সার লক্ষণ পাওয়া গেছে। মৌলভীবাজারের রাজঘাট, খেজুরীছড়া, আমরাইলছড়া, সাঁতগাও, হোসেনাবাদ, আলীনগর, শমসেরনগর, মিরতিংগা, মাধবপুরসহ ১০টি বাগানে পরিচালিত এক জরিপে এ ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যেহেতু সারা দেশের সব চা বাগানে একই কাজ ও বাসস্থানের পরিবেশ বিদ্যমান থাকায় সারা দেশের চা বাগানে একই অবস্থা থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল ( ইউএনএফপিএ) অর্থায়নে জাতীয় স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও গবেষণা মূলক সংস্থা সিআইপিআরবি’র কারিগরি সহযোগিতায় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে মৌলভীবাজার জেলার চা বাগানে প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নে বিবাহিত নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার সনাক্তকরণের জন্য বিনা মূল্যে 'ভায়া' টেস্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলার ফাঁড়ি বাগানসহ ৯৩টি চা বাগানের মধ্যে দশটি চা বাগানে মোট তিন হাজার নারীর ভায়া টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৫শত ১৯জনের দুরারোগ্য ক্যান্সার নামক ব্যাধিটি পজিটিভও এসেছে।
এই ভায়া টেস্টের যে ভয়াবহ ফলাফল এসেছে তা চমকে দেওয়ার মত। তথ্যমতে চা বাগানে কর্মরত নারীদের শতকরা ১৫ জনের জরায়ুমুখে ক্যান্সারের লক্ষণ পাওয়া গেছে। এই কার্যক্রমে অংশ নেওয়া নারীরা সাধারণত ২১ থেকে ৬৫ বছরের। বাংলাদেশের মুল ভূ’খণ্ডে বসবাসকারী পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী গুলোর অন্যতম চা শ্রমিক। যে যে কারণে নারীদের জরায়ু মুখের ক্যান্সার হয় তার সব লক্ষণ রয়েছে চা বাগানে। দিনের পর দিন চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের স্বাস্থ্যসেবা সহ মৌলিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেও স্বাভাবিক জীবন পাচ্ছেনা। চা বাগানে শিক্ষার অভাব থেকে ক্যান্সার তথা স্বাস্থ্য নিয়ে অসচেতনতা, কাজের নোংরা পরিবেশ, অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা যা জরায়ূমুখে ক্যান্সারের জন্য দায়ী।
বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, মূলত বাল্যবিবাহ, বেশি সন্তান নেয়া, অসচেতনতা, অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্নতা ও নিয়ন্ত্রনহীন যৌনাচারের ফলে জরায়ূমুখে ক্যান্সারের সূত্রপাত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্ত নারীদের লেটেস্ট ডায়াগনস্টিক টুল ভিডিও কল্পস্কোপি'র মাধ্যমে মৌলভীবাজার ২৫০শয্যা হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এদের কে মৌলভীবাজারে ২৫০শয্যা হাসপাতালে লেটেস্ট ডায়াগনস্টিক টুল 'ভিডিও কল্পস্কোপি'র মাধ্যমে 'সারভাইকেল ক্যান্সার' কোন স্টেজে আছে সে অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে জরায়ুমুখে ক্যান্সার শনাক্তকৃত
মিরতিংগা চা বাগানের রুপা উরাং, অঞ্জনা ভ’মিজ, রূপালী গোয়ালাসহ কয়েকজন নারীর সাথে আলাপ করে জানা যায়, বিভিন্নভাবে চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত এই নারীরা প্রাথমিকভাবে ক্যান্সারের লক্ষণ ধরা পরায় আগেই সচেতন হতে পারছেন এবং চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ থাকার স্বপ্ন দেখছেন।
মৌলভীবাজার ২৫০শয্যা হাসপাতালের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত গাইনিকোলজিস্ট ডা. ফারজানা হক পর্ণা জানান, এই রোগের একটি বিশেষায়িত সেবা এখন বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান জরায়ুমুখের ক্যান্সার সনাক্তকরণের নিমিত্তে লেটেস্ট ডায়াগনস্টিক টুল 'ভিডিও কল্পস্কোপি'র মাধ্যমে 'সারভাইকেল ক্যান্সার' কোন স্টেজে আছে, তা প্রি-ইনভেসিভ কী না, বায়োপসি করা লাগবে কী না, এসব সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে।
সিআইপিআরবির জেলা সমন্বয়কারী মো. আলতাফুর রহমান জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইউএনএফপিএ ও সিআইপিআরবি’র যৌথ উদ্যোগে দশটি চা বাগানে মোট তিন হাজার নারীর ভায়া টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৫শত ১৯ জনের জরায়ু-মুখের ক্যান্সারপূর্ব অবস্থা (ভায়া পজিটিভ) সনাক্তকরণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জরায়ু-মুখের ক্যান্সারপূর্ব অবস্থা সনাক্তকৃত ৫২৩জন নারীকে মৌলভীবাজার ২৫০শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভিডিও কল্পস্কপির মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান করে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার ২৫০শয্যা হাসপাতালের তত্বাবধায়ক পার্থ সারথী দত্ত কাননগো জানান, সিলেট বিভাগের মধ্যে এই সেবাটি শুধু মৌলভীবাজারে দেয়া হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, মূলত বাল্যবিবাহ, বেশি সন্তান নেয়া, অসচেতনতা, অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্নতা ও নিয়ন্ত্রনহীন যৌনাচারের ফলে জরায়ূমুখে ক্যান্সারের সূত্রপাত হয়।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাম ভোজন কৈরী জানান, আমরা বহুদিন ধরেই জরায়ূমুখে ক্যান্সার রোধে কার্যত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করে আসছিলাম। চা শ্রমিকরা আধুনিক ক্রীতদাস উল্লেখ করে তিনি জানান, এখানে সামান্য স্বাস্থ্যসেবাটুকুও ঠিকমত মিলেনা। ক্যান্সার লক্ষণের যে হার উঠে এসেছে তার মাধ্যমে চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠে।
বাংলাদেশ চা সংসদের সিলেট ভ্যালির সভাপতি জি.এম. শিবলি বলেন, চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবাসহ জীবনমান উত্তরনের জন্য আমরা কাজ করছি। স্বল্প সংখ্যক বাগান ছাড়া সব বাগানেই চিকিৎসার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা আছে।
তিনি আরো জানান, আমরা শ্রমিকের চিকিৎসার প্রয়োজনে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।
আপনার মন্তব্য