দেশের প্রথম ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ৬৩ বছরের পুরাতন এই সারকারখানাটি বাংলাদেশ ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) এর এক সময়ের মাদার ইন্ড্রাস্ট্রি বলে খ্যাত ছিল। গত বছরের ৩০ জুলাই কারখানাটির প্রধান ট্রান্সফরমার (১৩,৩০০ কেভিএ) বিকল হওয়ার পর থেকেই এটি বন্ধ রয়েছে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় থাকা সারকারখানার ৫শতাধিক শ্রমিক, কর্মচারি ও কর্মকর্তা গত ১২ ডিসেম্বর শিল্প সচিব মোশাররফ হোসেন ও বিসিআইসি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবালের ফেঞ্চুগঞ্জ সারখানার সফরের মধ্য দিয়ে চিরতরে বন্ধের বিষয়টি সম্পর্কে তারা স্পস্ট ধারণা পান। যদিও সরকারের তরফ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষনা দেয়া হয়নি। গত ১২ ডিসেম্বর শিল্প সচিব ফেঞ্চুগঞ্জে শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরির নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করতে এসে পুরাতন ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত প্রদান করেন। ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা ১৯৬১ সালের ১৩ই ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক জাপানের মেসার্স কোবে ষ্টীল লিমিটেড প্রায় ৫২ একর জায়গার উপর এই নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন দিয়ে আসছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানায় প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। আর প্রতি মেট্রিক টন সার বিক্রি করতে হয় সরকার নির্ধারিত ১৪ হাজার টাকায়। ফলে এ কারখানায় প্রতি মেট্রিক টনে লোকসান গুণতে হয় প্রায় ২২ হাজার টাকা। অথচ পাশেই নির্মানাধীন শাহজালাল সার কারখানায় প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনে ব্যয় হবে মাত্র ৭ হাজার টাকা। এমনকি আশুগঞ্জ সারকারখানা, যমুনা সারকারখানা, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সারকারখানাসহ দেশের বাকী প্রায় সব কারখানায়ই প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনে ব্যয় হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতিদিন এ কারখানায় ৪০ মেট্রিক টন সার উৎপাদন করা সম্ভব হয়। এ হিসেবে কারখানাটি পুরোদমে চালু থাকলে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হয় প্রায় ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
এই হচ্ছে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সরকারী মালিকানাধীন সার কারখানাটির করুণ অবস্থা। যে কোন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বাড়লে সেই সাথে বাড়ে আয়ের পরিমাণ। কারখানা বন্ধ থাকলে ক্ষতির সম্মুখিন হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু দেশের প্রাচীনতম শিল্প প্রতিষ্ঠান ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার অবস্থা এর ঠিক উল্টো। এই প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন যত বাড়ে, লোকসানের পরিমাণও ততো বৃদ্ধি পায়। কোন কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ থাকলে কমে আসে ক্ষতির পরিমাণ। সারের উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রয় মূল্য কম হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অব্যাহত লোকসানের কারনে সারকারী এই কারখানাটি চালুর চেয়ে বন্ধ রাখতেই আগ্রহী সংশ্লিস্টরা। ফলে গত সাড়ে তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা। পাশেই নির্মানাধিন শাহাজালাল সার কালকানা চালু হলে জীর্ণ এই কারখানাটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের মতে, অন্যন্য কারখানার এখন উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সার উৎপাদন করা হয়। যার ফলে তাদের উৎপাদন খরচ অনেক কম হয়। কিন্তু এ কারখানায় একশ বছর আগের প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি দিয়ে সার উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে ব্যয় অনেক বেশি হচ্ছে, কেবল লোকসানই গুণতে হচ্ছে।
পুরাতন সারকারখানার পাশে শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরী নামের আরেকটি অত্যাধুনিক সারকারখানার নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে ২০১২ সালে। ৩৮ মাস সময়সীমা নির্ধারণ করে চীনের মেসার্স কমপ্লান্ট নতুন সারকারখানাটি নির্মাণ করছে। সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে, ৬২ একর ভূমির উপর শাহজালাল সারকারখানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। আগামী জুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন সারকারখানার উদ্ভোধন করার লক্ষ্যে বর্তমানে এটির কাজও দ্রুত গতিতে চলছে। ইতিমধ্যে শাহজালাল সারকারখানার কাজ প্রায় ৯০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানার ব্যবস্থাপক মোঃ ইস্কান্দার আলী জানান; সারকারখানাটি বন্ধ থাকলে কোম্পানির লোকসানের পরিবর্তে লাভই হয়। পুরনো প্রযুক্তির কারণে এই কারখানার উৎপাদন খরচ বেশি। নতুন (শাহজালাল) সারকারখানা চালু হলে প্রতি মেট্রিক টন সার যেখানে ৭ হাজার টাকায় উৎপাদন করা সম্ভব হবে, সেখানে পুরাতন কারখানায় ব্যয় হচ্ছে ৩৬ হাজার টাকা। তাই এই কারখানাটি চালু রাখার চেয়ে বন্ধ করে দেওয়াই শ্রেয়। তিনি আরও জানান;শাহজালাল সারকারখানার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তাই পুরাতন সারকারখানাটি চালু সম্ভাবনা সংঘত কারণেই ক্ষীন হয়ে আসছে। পুরাতন সারকারখানার লোকজনকে শাহজালাল সারকারখানায় নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা কর্মচারীকে নতুন সারকারখানায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
তবে কারখানাটি চালু রাখার দাবি সিবিএ নেতা এবং কর্মচারীদের। সিবিএ নেতারা সিলেট টুডে ২৪ কে বলেন; যন্ত্রপাতি জীর্ণ হয়ে পড়া ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতি অনিয়মের কারনে সাত মাস ধরে কারখানা বন্ধ রয়েছে এবং কারখানায় লোকসান গুণতে হচ্ছে। আধুনিকায়ন করা সম্ভব হলে এটিও লাভজনক হয়ে উঠবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী; উনারা পুরাতন সারকারখানা চালু রাখার পক্ষে। নতুন কারখানা পুরোদমে চালু না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো কারখানা চালু রাখতে হবে। তা না হলে শ্রমিক কর্মচারীরা না খেয়ে মরতে হবে।
উল্লেখ্য , বিকল ট্রান্সফরমার মেরামত করে দুই মাসের মধ্যে কারখানা চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাত মাসের মধ্যেও চালু হয় নি দেশের এই প্রাচীনতম সারকারখানাটি।
আপনার মন্তব্য