২৯ মে, ২০২৫ ১১:৪৬
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘এই গণঅভ্যুত্থানকে আসিফ যেভাবে উপস্থিত করেছেন, তা ইতিহাসের চরম বিকৃতি।’
গতকাল বুধবার মধ্যরাতে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে তিনি এ মন্তব্য করেন।
আনু মুহাম্মদ তার পোস্টে লিখেছেন, ‘আসিফ নজরুল ভুল বলেছেন। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল দুর্বৃত্তায়ন, নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করে জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা ধরে রাখা, ভয়াবহ দমনপীড়ন, অভূতপূর্ব মাত্রায় দুর্নীতি, সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচার, সীমাহীন ঔদ্ধত্য এবং সবশেষে নির্বিচার নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও জুলুমের বিরুদ্ধে। এমন শাসনব্যবস্থার অবসান এবং বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেরণা ছিল।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘"আদেশক্রমে বিচার ব্যবস্থা" পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ জীবন দেয়নি। ১৯৭১-এর ঘাতক-দালাল, মৌলবাদী শক্তি, নারী ও ভিন্নমত দমনে হিংস্র গোষ্ঠী, চাঁদাবাজ ও দখলদারদের পুনর্বাসন বা গঠনের জন্যও এই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়নি। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে দেশের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছেন, যাদের অনেকেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সংগ্রাম করেছেন, শ্রেণি-লিঙ্গ-জাতি-ধর্মীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যমুক্ত দেশ গঠনের চিন্তা ও আন্দোলনে দীর্ঘদিন যুক্ত রয়েছেন।’
‘এই গণঅভ্যুত্থানকে আসিফ যেভাবে উপস্থিত করেছেন, তা ইতিহাসের চরম বিকৃতি। এটা অসংখ্য মানুষের প্রাণ, শ্রম, সংগ্রাম ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি বড় অর্জনকে কলঙ্কিত করার শামিল। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই,’ যোগ করেন তিনি।
এদিকে, আনু মুহাম্মদের এই পোস্টের মন্তব্য বিভাগে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সেখানে তিনি লিখেছেন, আনু ভাইকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তিনি এখানে যেভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তাতে আমি বিস্মিত হয়েছি।
প্রথমত, তিনি যেসব কারণে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, সেগুলো আমিও স্বীকার করি। এসব লক্ষ্য নিয়েই গত ১৫ বছর আমি সোচ্চার ছিলাম, এখনও আছি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমি যা লিখেছি, তাতে সহজ ভাষায় ঠিক এই লক্ষ্যগুলোর কথাই বলেছি।
কিন্তু আনু ভাই, আমার পোস্টটি গণঅভ্যুত্থানের সার্বিক লক্ষ্য নিয়ে লেখা নয়। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে সেখানে কীভাবে বিচার হয়েছে, তা তিনি নিশ্চয়ই জানেন। সেখানে বিচার হয়েছে মূলত ফাঁসির দাবির আন্দোলনের চাপে—অভিযুক্তরা দোষী ছিল কি না, কিংবা দোষী হলে তাদের কী শাস্তি প্রাপ্য, তা নির্ধারণে ‘ডিউ প্রসেস’ ও ন্যায়বিচারের শর্তগুলো পুরোপুরি মানা হয়নি। ফলে, সেই বিচারে অপরাধী সাব্যস্ত ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। (আমি তখনও এ ধরনের কথা বলতাম, যার কারণে নানা ভাবে নিগৃহীত হয়েছি।)
গতকাল সর্বোচ্চ আদালতের রায়েও এমনই একটি ঘাটতি দেখা গেছে, যার কারণে জামায়াত নেতা মাওলানা আজাহার মুক্তি পেয়েছেন। গত ১০ মাসে আরও অনেক রায়ে আওয়ামী লীগের আমলের বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান না হলে এই সুযোগ সৃষ্টি হতো না। তবে এর অর্থ এই নয় যে গণঅভ্যুত্থানের একমাত্র লক্ষ্যই এটি ছিল।
দ্বিতীয়ত, কোনো প্রমাণ ছাড়াই আনু ভাই স্বনামধন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এই বিচারব্যবস্থাকে ‘আদেশক্রমে বিচারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ বলে উল্লেখ করেছেন। আনু ভাই, আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি, এখানে সরকারের কোনো আদেশ ছিল না। এমন অভিযোগ না করে আপনি বা অন্য কেউ রায়টি বিশ্লেষণ করে দেখুন—কোথায় আদেশের প্রমাণ আছে, কোথায় অবিচার হয়েছে?
তৃতীয়ত, আপনি লিখেছেন, ‘এই গণঅভ্যুত্থানকে আসিফ যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা ইতিহাসের চরম বিকৃতি এবং অসংখ্য মানুষের প্রাণ, শক্তি, শ্রম আর প্রত্যাশার ওপর দাঁড়ানো একটি বড় অর্জনকে কলঙ্কিত করা।’
আপনার এই বাক্য আমাকে আতঙ্কিত করেছে। আপনার মতো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি যদি এমন সাধারণীকরণ করেন, তাহলে অন্যদের অবস্থা কী হবে?
আপনার মন্তব্য