আজ মঙ্গলবার, , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

রাশিদা আক্তার

০২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ১৩:৫১

কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়

“মেঘ ছুঁয়েছে পাহাড়চূড়া পাথরগলা নদী,
কল কল ছল ছল পাহাড় ঝর্ণাবতি”

একদিন অনভ্যস্ত পায়ে হেঁটে ঠিক সূর্য ডোবার কয়েক মুহূর্ত আগে পৌঁছে গেলাম কেওক্রাডং-এর চূড়ায় ; সমুদ্রের ঢেউয়ের মত অসংখ্য পাহাড়চূড়ার ঢেউ খেলানো রেখা দেখে নিমিষেই অবসান হল সব ক্লান্তি। মনে শুধু একটি গান বাজছিল “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবেনা কো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি”।

কেওক্রাডং জয়ের গল্পটা ছিল স্বপ্নের মত। ঢাকা, সিলেট এবং চিটাগাং মিলিয়ে বন্ধুদের তিনটি দল মিলিত হলাম চিটাগাং রেল স্টেশনে। ঢাকার আট জনের দলকে সমন্বয়ের দায়িত্ব নেন ডা. হক, এবং সিলেটের সাত জনের দলকে এইচ, বি, ভদ্র ।

ট্রেন এর টিকেট যোগাড় করা থেকে শুরু করে সব আয়োজনে তারা ছিলেন অসাধারণ। সব মিলিয়ে ১৭ জনের একটি দল বান্দরবান বাস স্ট্যান্ডে চলে গেলাম। প্রথমে হলো চমৎকার নাস্তা- পরোটা, ডাল এবং ডিম দিয়ে। এরপর এলো পুদিনা পাতার চা; এ যেন সুবাসে হারিয়ে যায় মন!

সেখান থেকে বাসে আমরা রওয়ানা দিলাম বান্দরবান। প্রায় তিন ঘণ্টা পরে পৌঁছে গেলাম, যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল চাঁদের গাড়ি। সেটাতে স্বাভাবিক ভাবেই জায়গা হবেনা ব্যাগ সহ সবার, তাই তিনজন উঠে পড়ল গাড়ির ছাদের রডের উপর। বাকিরা ঠাসাঠাসি করে বসে গেলাম।

পথে যেতে যেতে উপভোগ করলাম রাস্তার দুপাশের পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য। পথে কেউ একজন কলার কাদি কিনে ঝুলিয়ে দিল গাড়িতে, সাথে সাথে মনে হল চারপাশ থেকে সমস্ত অভুক্ত হাত ঝাঁপিয়ে পড়ে কেড়ে নিল কলাগুলো। এভাবেই হই-হুল্লোড় করে আমরা পৌঁছে গেলাম রুমাবাজার।

তখন বিকেল প্রায় তিনটা। সবাই ক্ষুধার্ত কিন্তু খাবার খোঁজার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তিনটার মধ্যে আর্মি ক্যাম্পের ফরম পূরণ করে প্রত্যেকের স্বাক্ষর দেয়া নিশ্চিত করা।

এখানেই শেষ নয়; রুমাবাজার থেকে কেওক্রাডং আসা যাওয়ার পথে মোট ছয়বার আমাদের স্বাক্ষর করতে হয়েছে, যেটা ১৭ জন মানুষের জন্য ছিল বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার এবং ক্লান্তিকর যেকোনো ভ্রমণকারীর জন্য।

রুমাবাজারের সব ফর্মালিটি শেষ করে আমরা চললাম খাবারের সন্ধানে, কারণ দ্রুত খেয়ে আমাদের যেতে হবে বগালেক সন্ধ্যার মধ্যে, সেখানেও সময় মত স্বাক্ষর না দিতে পারলে আমাদের অসুবিধা হতে পারে।

রুমার মত ছোট বাজারে পড়ন্ত দুপুরে ১৭ জন মানুষের খাবার পাওয়াটা দুষ্কর। এক দুই দোকান ঘুরে অবশেষে খাবারও জুটল সবার, সাঙ্গু নদীর মাছ, মুরগি এবং বাসমতী চালের ভাত আমাদের ক্ষুধার্ত পেটে ছিল অমৃতের মতই।

খাওয়া শেষ করে আমরা ঘুরে দেখলাম রুমাবাজার। পাহাড়ি পান-সুপারি আর তামাক পাতার বিড়ি ছিল আমাদের জন্য নতুন আকর্ষণ। কেউ কেউ তামাক পাতার বিড়ি কিনলেন কিন্তু কাশির ভয়ে সাহস করলেন না টান দিতে। কেউ কেউ ব্যস্ত হলেন রুমা বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অপরূপ সাঙ্গু নদীর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে।

এরপর রুমাবাজার থেকে আরেকজন আদিবাসী বন্ধু সহ আমরা রওয়ানা দিলাম বগালেকের উদ্দেশ্যে। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর দেখলাম প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে বগালেক পর্যন্ত।

হয়ত একসময় কেওক্রাডং পর্যন্ত হবে এই রাস্তা, হয়তবা প্রকৃতির এই নীরবতা, পরিবেশের এই নিজস্বতা হারাবে অধিক মানুষের যাতায়াতের ফলে। ভাবতে ভাবতে প্রায় বগালেকের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম, সন্ধ্যা নেমে গেছে।

আমাদের এইচ, বি, ভদ্র এখন দলপতি। তিনি বললেন তিনি শক্তি পরীক্ষা করতে চান কে কে কেওক্রাডং এর পথে হাঁটতে সমর্থ হবে পরের দিন। আর এ শক্তি প্রমাণ করার জন্য ছোট একটি পাহাড় ডিঙ্গিয়ে বগালেক যেতে হবে। তবে কেউ পাহাড়ে উঠতে না চাইলে সে গাড়িতে যেতে পারে।

মুহূর্তেই গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন বেশিরভাগ, বাকি যারা ছিলেন নানা কথার উস্কানি এবং নিজেকে অসমর্থ প্রমাণ না করার জন্য দ্বিধান্বিত মন নিয়ে নেমে পড়লেন। পাহাড়ে হাঁটার সুবিধার জন্য বাঁশ (ট্র্যাকিং পোল) কেনা হল সবার জন্য।

আমরা অন্ধকারে টর্চের আর মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে উঠতে লাগলাম খাড়া পাহাড়ের সরু রাস্তা ধরে। সারারাত আর দিনের দীর্ঘ যাত্রায় ক্লান্তি নেমে আসছিল সহজেই। মাঝে মাঝে আমরা বসে পড়ছিলাম পাহাড়ের বাঁকে।

এরই মধ্যে কেউ একজন ভরাট কণ্ঠে ভুপেন হাজারিকার গান ধরলেন, যা নির্জন পাহাড়ে চাঙ্গা করল আমাদেরকে। এগিয়ে গেলাম। পেছন থেকে একজন বিদেশী ভাষায় গেয়ে উঠলেন “How many people live in your house you do not know” বুঝতে একটু সময় লাগলো যে তিনি আসলে নকল করছিলেন “তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা মন জান না” গানটির; হাসির শব্দে মুখরিত হল নিস্তব্ধ সন্ধ্যা। এভাবেই উঠে গেলাম পাহাড়টির উপর যার কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে অনিন্দ্য সুন্দর বগালেক।

পাহাড়ে ওঠার সাথে সাথে রাতের স্বচ্ছ আকাশের অগনিত উজ্জ্বল তারা, হিম শীতল বাতাস আর থ্রিজি নেটওয়ার্ক যেন এক সাথে স্বাগত জানালো। ভুলে গেলাম পথের ক্লান্তি। আহা, এমন রাত হয় নাকি!

পাহাড়টির পাদদেশে একটি পাড়া যেখানে আমাদের রাতের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। ধীরে ধীরে নেমে গেলাম পাড়ার দিকে।

থাকা এবং টয়লেটের ভাল ব্যবস্থা না থাকলেও মানিয়ে নিয়েছিলাম, কারণ আমাদের আনন্দের কাছে পরাজিত ছিল সামান্য অসুবিধা; যেখানে এক সঙ্গে ছিলাম ১৮ জন বন্ধু, বারবিকিউ, ক্যাম্পফায়ার, গান, আড্ডা সব কিছু। প্রথম রাত কাটল আমাদের বগালেক পাড়ায়।

সকালবেলা উঠে তড়িঘড়ি করে আমরা তৈরি হলাম কারণ সূর্য ওঠার আগে রওয়ানা দিবো আমাদের প্রধান গন্তব্য কেওক্রাডং। যদিও শেষ পর্যন্ত সূর্য উঠে গেছে রওয়ানা দিতে দিতে। পথ যদিও মোটে সাত কিলোমিটার কিন্তু আমাদের যেতে প্রয়োজন পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময়।

কেওক্রাডং রওয়ানা দেয়ার আগে মামির (হোটেল মালিক) হাতের খিচুরি, ভর্তা আর ডিম ভাজি দিয়ে নাস্তা ছিল অসাধারণ। আদিবাসী এই নারীর আন্তরিকতা এবং হাসিমুখে আতিথেয়তা আমাদের মন ছুঁয়েছে।

টাকা দিয়ে নাস্তা যেকোনো জায়গায় কেনা যায় কিন্তু মানুষে মানুষে এইযে আন্তরিকতা বোধ এটা পাওয়া সহজ নয়। নির্জন পাহাড়ে মিলল অন্তরের স্পর্শ।

নাস্তা খাওয়ার পরে, বগালেক এর স্বচ্ছ সবুজ পানিতে গোলাপি, বেগুনি শাপলা, লেক ঘিরে পাহাড়ের মনোরম দৃশ্যপট ধারণ করতে আমরা কিছু সময় নিলাম।

সকাল দশটায় আমারা যাত্রা শুরু করলাম কেওক্রাডং এর পথে। যেহেতু বড় টিম, তাই তিন চার জনের করে দলে ভাগ হয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। পথে যেতে যেতে চোখে পড়ল অসংখ্য রঙ, বেরঙের বনফুল; লাল, নিল, বেগুনি, হলুদ, সাদা। নানা রঙের প্রজাপতি। মনে পড়লো রবীন্দ্রনাথ-

“ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে,
ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে;
ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান”

কেওক্রাডং এর পথে আরও বিস্ময় ছিল পাথরের ফসিল, ছোট ছোট ছড়ি এবং ঝিরি (ঝর্ণা)। সবচাইতে বড় ছিল চিংড়ি ঝিরি। পাথর আর মাটির ফসিলে আবৃত এ ঝর্ণার ঠাণ্ডা পানিতে গা ভিজিয়ে নিলাম কিছুক্ষণ । এমন গহীন পাহাড়ে এমন সুন্দর ঝর্ণা যেন নিশিরাতের পরীর গল্পের মতই অদ্ভুত রহস্যময়!

ধীর গতিতেই চলছিলাম আমরা। মাঝে মাঝে আমরা বসে পড়েছি ক্লান্ত হয়ে। খেজুর, পানি, কিসমিস, চকলেট খেয়ে নিয়েছি ক্লান্তি দূর করার জন্য। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়েছি স্তরে স্তরে বিন্যস্ত পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে, আলোচনা করেছি আমাদের দেশ কত বেশি সুন্দর, কত বেশি সম্ভাবনাময় ট্যুরিজম এখানে।

বিকেল তিনটা যখন বাজে তখনো বেশ খানিকটা পথ বাকি আছে। ক্লান্ত সবাই। দলপতি এবং তার দুইজন সঙ্গী একটু বেশি এগিয়ে রইলেন, অপেক্ষা করছিলেন পেছনের বন্ধুদের জন্য। যখনি কাউকে দেখলেন তার সেই হাস্যকর নাচ, গান আর পানিও দিয়ে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করলেন।

একটি ছোট ছাউনিতে আমরা কিছুটা অবসর নিয়ে এগিয়ে গেলাম নিকট একটি বাজারের দিকে। কিছুক্ষণ পর আমরা আদিবাসী পাড়ার বাজারে পৌঁছে গেলাম। কলাপাতায় মোড়ানো বিন্নি চালের ভাত, ডিম সেদ্ধ, জাম্বুরা খেয়ে বাকি পথ চলার শক্তি জোগাড় করে চলতে শুরু করলাম। আমাদের লক্ষ্য তখন কেওক্রাডং এর উপর থেকে সূর্যাস্ত দেখব।

আদিবাসীদের ঘরের গ্রিল বিহীন জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল শিশু এবং বৃদ্ধরা। কখনও তারা হাস্যোজ্জল মুখে হাত নেড়ে অভিবাদন জানিয়েছে। পাহাড়ি কাশফুল, বুনো ঝোপ পথকে করে তুলেছে সুন্দর।

পাহাড়ি শিশুর বিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার অসুবিধা, তাদের খেলাধুলা চোখে পড়েছে। চলতি পথে কথা হয়েছে কিছু স্থানীয় লোকের সাথে, ভাল বাংলা না বলতে পারলেও বুঝেছে আমাদের কথা।

আমাদের সফরসঙ্গী ছিলেন ৬১ বছর বয়সি একজন তরুণ বন্ধু; যিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন আগের মত বড় গাছের সংখ্যা কম দেখেছেন তিনি। পাখি দেখতে পাওয়া যায়নি তেমন। যেখানে সেখানে চিপসের প্যাকেট, ময়লা দেখা গেছে।

এভাবেই ভালোলাগা, খারাপ লাগার আলোচনা করতে করতে সূর্য ডোবার কয়েক মিনিট আগে পৌঁছে গেলাম কেওক্রাডং এর চূড়ায় । দেশের সব চাইতে উঁচু পাহাড় চুড়ায় উঠে কেউ ওড়ালেন দেশের পতাকা, কেউবা ডুবে গেলেন পাহাড়ের সৌন্দর্যে।

চোখের সামনে দিয়ে পাহাড়ের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল শেষ বিকেলের রক্ত রাঙা সূর্যটা। গোধূলি লগ্নে পাহাড়ের স্তরগুলোকে মনে হল কোন মহাসমুদ্রের ঢেউ কালের স্থিরতায় থেমে গেছে। অপরূপ এ দেশ আমার! সন্ধ্যা নামলো তারার মেলা নিয়ে।

পথের ক্লান্তি বিদায় নিয়েছে রাতের সুন্দরের আগমনে। মনে বেজে উঠেছে কবির সুমন, “এ যদি আমার দেশ না হয়তো কার দেশ বল?”

কেওক্রাডং এ থাকার ব্যবস্থা বলতে চারটি বড় টিনের ঘর নিচে কাঠের পাটাতন পাতা, একটি আমরা পেয়েছিলাম যেখানে ১৮ জনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। খাবার আর টয়লেট এর ব্যবস্থা একমাত্র লালা মামার হোটেল কাম বাসা। গুগলে সার্চ দিলে এই ঠিকানাই পাওয়া যায়।

রাতের খাওয়া শেষ করে আমাদের গানের আড্ডা, যে যার প্রতিভা প্রকাশ করলেন দারুণভাবে। কেউ কেউ ব্যস্ত ছিলেন সারাদিন কত ঢং করে ছবি তুলতে পেরেছেন তা দেখতে। এরপর কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লাম সবাই। আমাদের মধ্যে অনেকেই ঘুমকে যেন গভীর হতে দিলাম না ভোরের সূর্যোদয় দেখবো বলে।

ভোর চারটা বাজতেই এক এক করে মৃদু পায়ে বের হল ঘর থেকে। আমিও উঠে চলে গেলাম হেলিপ্যাডে। বন্ধু চারুশিল্পী তার পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে বসে গেলেন ছবি আঁকতে। শীতের বাতাসকে উপেক্ষা করে পাহাড়ের সাগরে বসে যেন মহাবিশ্বের অংশ রূপে নিজেকে অনুভব করলাম।

“আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান”

সূর্যোদয় হল তার রাজকীয় আভা ছড়িয়ে। বিদায়ের পালা এল স্বপ্ন ভ্রমণের। আমরা ফিরে এলাম গাড়িতে। কাচা মাটির আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে গাড়িতে চড়ার ভয় ভীতি, উচ্ছ্বাস নিয়ে ফিরে এলাম বগালেক এবং সেখান থেকে বান্দরবান।

১৭ থেকে ২১ জানুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত আমাদের চারদিনের এই আনন্দভ্রমণ, বন্ধুত্ব, হাসি, গান বিদায়টাকে করেছিল বেদনাদায়ক। এক সাথে কেওক্রাডং জয়ের এই আনন্দ আমাদের স্মৃতির পাতায় সঞ্চয় হয়ে থাকবে অমলিন।

  • রাশিদা আক্তার: গবেষক, আইসিডিডিআরবি, মহাখালী, ঢাকা।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত