নিরঞ্জন দে

২৫ মে, ২০২৬ ১৯:৩০

যুগমানব কবি নজরুল : প্রেমই তাঁর সৃজনের মূল শক্তি

যুগমানব কাজী নজরুল ইসলাম জন্মেছিলেন বাঙালির ঘরে এ জাতির ভাগ্যলক্ষ্মী সুপ্রসন্ন ছিলেন বলেই। নজরুল জন্মেছেন একবার, কারন প্রতিটি মানুষ একবারই জন্মায় কিন্তু নজরুলের মৃত্যু হয়েছে এবং হচ্ছে বার বার। একবার মরণে যদি বিলীন হয়ে যেতেন তাহলে সমস্যা ছিলোনা কিন্তু নদীমাতৃক বাংলায় নদীর মোহনায় জাগা চরের মতো ধাবমান প্রবল স্রোতকে অগ্রাহ্য করে নজরুল বার বার জেগে উঠেন আরও বিস্তৃত হয়ে। ঘোরে মত্ত অসংস্কৃত অমার্জিত অনালোকিত বাঙালি আবার তাঁকে ঠেলে দেয় মৃত্যু গহন অন্ধকূপে অমানিশার ধুম্রধুপের আড়ালে। আমরা কোনো মহামানব মনিষীকে ততোটাই নিতে পারি যতোটা যার মগজে কুলোয়। আর তাই -
“ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে
ভাগ হয়নিকো নজরুল।”

কবি অন্নদাশংকরের এই লাইনটির মর্মার্থ বুঝতে গিয়েও আমাদের সাধারণ বাঙালির তো কথাই নেই পণ্ডিত গবেষকদের শব্দের ব্যায়ামটাও খুব উপভোগ্য। এরা রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলে নানা ছলছুতোয় খোঁজে হিন্দু জাতীয়তাবাদ আর মুসলিম জাতীয়তাবাদ। একচিমটি লবনের মতো রবীন্দ্র-নজরুল আলোচনায় এরা এসব যোগ করবেই নিজের মজ্জাগত বৈশিষ্ট্যের কারনে। শুকনো গাছে কাঠ হয়, সেই কাঠে আসবাবপত্র তৈরী হয় কিন্তু শুকনো গাছে ফুল ফোটেনা, ফল হয়না। আবেগহীন, অনুভূতিহীন, বিশ্বাসহীন, রস ও প্রেমহীন শুকনো তথ্য আর রেফারেন্স নির্ভর শুধু বইপড়া পাণ্ডিত্য আর গবেষকের বক্তৃতায় সেই ভুল বা ভ্রান্তিটা ঘুচেনা ; যে ভুলের কারনে নজরুলের মৃত্যু হয় প্রতিদিন।

কাকতীর্থে যেমন ময়ূর বেমানান ঠিক তেমনি মুর্খের রাজ্যে বিনম্র পণ্ডিত বেমানান। যে লোকের অন্তরকে নজরুলের সুর ও বাণীর মালা ছুঁয়ে যায়না, যার শূন্য হৃদয়পদ্ম পদ্মার উথাল ঢেউয়ের জন্য উতলা হয়না, যে বর্ষণমুখর দিনে তমাল তলে রাধানামের মধুর বাঁশি শুনেনা, সুরে সুরে তৌহিদের বাণী যার মর্ম স্পর্শ করেনা - সেই লোক নজরুল শেখায়, ভাষণ দেয়, সে বাঙালি! জীবনে নজরুলের গোটা বিশেক গানের সাথে গুণগুণ করেছে বলে মনে হয়না, সুরে যার প্রেম জাগেনা, মনে আলোড়ন হয়না, সে নজরুলের বাণীর গভীরতা ও রূপকের ধারেকাছেও নাই - সেই লোক নজরুলকে জানাবে! এরকম কিছু রবীন্দ্র, নজরুল, লালন বিশেষজ্ঞ আছেন বলেই আমাদের ঘোরটা আর কাটে না। বুদাই মুর্খরা হা করে ওদের কথা শুনে আর গিলে। সময়ের বাঁকে বাঁকে তাই কবি নজরুলের মতো যুগমানব আর মহামানবের মৃত্যু দেখি প্রতিদিন। বার বার তাঁরা মরেন আবার বেঁচে ওঠেন দূর্বাদল হয়ে আমাদের মাথায় শুভাশিস নিয়ে। সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান কাজী নজরুল তাঁর কালের দাবী মেটাতেই যেনো ধরায় এসেছিলেন কবি হয়ে।

বিচিত্র ঘাতপ্রতিঘাত সংগ্রাম ও সংকটে ঘেরা তাঁর জীবন জুড়ে ছিল প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, বিক্ষোভ। ছিল অসংকোচ সত্যের পক্ষাবলম্বন, ছিল প্রেম, ভালোবাসা, রোম্যান্টিকতা, ছিল দয়া, ভক্তি, প্রজ্ঞা ও সহানুভূতি। তাঁর আদি শিকড় ও অস্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস তাকে অনতিক্রম্য উচ্চতায় স্থান দিয়েছিল। বাঙালি আজও এটা ধরতে পারেনি ঠিকঠাক। এতো বড় নজরুলকে জানা বুঝা ও ধারণ করার মতো উপযুক্ত পাত্র আমরা হতে পারলাম কোথায়? বরং তাঁর সবাক জীবনের শেষ দিকে, তাঁর দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে, তাঁর সমাজের প্রতি সরল ভালোবাসার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ তাঁকে নানা ভাবে তাঁকে প্রভাবিত করেছেন। তবুও ভাগ হননি নজরুল। প্রেম ও ভক্তির রসধারার সমান্তরালে প্রতিবাদ আর দ্রোহটা বহমান ছিল মানবতার পক্ষে, মানুষের পক্ষে, সভ্যতার পক্ষে, মুটেমজুরের পক্ষে, শৃঙ্খলিত নারীর পক্ষে। ফুল পাখি আর ভ্রমরের হয়ে, একাদশীর চাঁদের হয়ে, অরুণকান্তি যোগী ভিখারির হয়ে তিনি প্রকাশিত হয়েছেন। তিনিই পারেন নটরাজ শিবকে প্রলয়তাল ভুলে সৃজনছন্দের আনন্দে নাচার আহ্বান জানাতে। তিনি সত্যি বিস্ময় বিশ্ব-বিধাত্রীর।

যুগমানব নজরুলের সাহিত্যকর্মে প্রেম, দ্রোহ, মানবতা ও সৌন্দর্য্যবোধের অপূর্ব সমন্বয় তাঁকে কালোত্তীর্ণ করে এক ভিন্ন উচ্চতায় স্থাপন করে দিয়েছে। বাংলা সাহিত্যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক বিস্ময়কর ও অভাবনীয় সত্তা । তিনি যেমন বিদ্রোহের কবি, তেমনি প্রেমের কবি; সাম্যের কণ্ঠস্বর ও সুন্দরের উপাসক। সত্যম শিবম সুন্দরমের উপলব্ধি ছিল তাঁর বোধির উৎস জুড়ে। নজরুলের সৃজন ভুবনে তাই ছিল বিদ্রোহ, মানবতা, প্রেম ও সাম্যের এক অপূর্ব সমন্বয়। তবে সমগ্র নজরুলের গভীরে যে শক্তি সবচেয়ে উজ্জ্বল ও বাধাহীনভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তা হলো তাঁর প্রেমিক সত্তা। নজরুলের বিদ্রোহ, মানবতাবাদ ও সাম্যচেতনার মূলে ছিল গভীর প্রেম-মানুষের প্রতি প্রেম, সৌন্দর্যের প্রতি প্রেম, স্বাধীনতার প্রতি প্রেম এবং পরমের প্রতি প্রেম।

নজরুলের প্রেম কোনো সংকীর্ণ ব্যক্তিগত আবেগ নয়; এটি এক বিশ্বজনীন মানবিক শক্তি। এই প্রেম শুধু রোমান্টিক অনুভূতি নয়, বরং মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার উৎস। তাঁর প্রেম কখনো অসাধারণ রূপকে ও উপমায় প্রকাশ করেছে প্রেয়সীর প্রতি আকুলতা, আবার কখনো অবারিত ঝর্ণাধারার মতো প্রবাহিত হয়েছে নিপীড়িত মানুষের জন্য মমতায়। আবার সেই চির বিদ্রোহী ভৃগু শান্ত হয়েছেন স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণে। নজরুলের পাণ্ডিত্য শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থ বা পারপাস নির্ভর ছিলনা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাহীন ছিলনা বরং ছিল প্রগাঢ় শ্রদ্ধায় বিগলিত ভাব-ভক্তি ও প্রেমের উষ্ণ প্রস্রবণ। মগজে নানা সমীকরণ নিয়ে সেটা বুঝতে পারা কঠিন। নজরুলের রূপক ও উপমা তাই আমাদের কাছে অধরা মাধুরী হয়েই শুধু উচ্চরিত হয়ে গেলো, তিনি রইলেন দূর গগনতলে, মনের নিভৃত কোনে নয়।

নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটি এখনো যথেষ্ট ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দাবি রাখে যুগের প্রয়োজনে। হিন্দু মুসলিম উভয় ধারার অনেক উপমা উপাখ্যান ও বিচিত্র রূপকে তৎসম, আরবী, ফার্সি, ফৌজি নানা ভাষার সংমিশ্রণে এ এক অমিত প্রভার অগ্নিশিখা। এতো স্পর্ধা, এতো আত্মবিশ্বাস, এতো তেজ, এতো প্রতিজ্ঞা, এতো গগনবিদারী হুংকার কবিতায় বাঙালি দেখেছে এর আগে কখনো! এই বিদ্রোহী কণ্ঠস্বরের মধ্যেও প্রেমের সুর ধ্বনিত হয়েছে।
“আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন-মন উদাসীর,”

“আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
চিত চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর!
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন-কন!”

আবার দ্রোহীসত্তার উচ্চারণে বলেন-
“বল বীর-
চির উন্নত মম শির!”
এই উচ্চারণ অহংকারের নয়; এটি অপমানিত মানুষের আত্মমর্যাদার জাগরণ।
“মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।”

এখানে স্পষ্ট হয়, তাঁর বিদ্রোহের উৎস ঘৃণা নয়, বরং মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। কারণ যে সত্যিকার অর্থে মানুষকে ভালোবাসে, সে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে দ্রোহী হয়ে উঠবেই। বাঙালি নাগরিক মানুষ যখন ভারতের লখনৌ ও বেনারসের লঘু-শাস্ত্রীয় ভাবপ্রধান গান ঠুমরী, উত্তর ভারতের কাজলকালো বর্ষাসিক্ত আধা-শাস্ত্রীয় লোকসঙ্গীত কাজরী, উর্দু ও ফার্সিতে মিশ্র গজল, সংস্কৃত ও মৈথিলী ব্রজবুলির পদাবলী আর রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবুর বাংলা টপ্পা শুনে শুনে অভ্যস্ত হয়ে রবীন্দ্র যুগে প্রবেশ করে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন প্রমুখের প্রায় কাছাকাছি ধরণের বাণী ও সুরের গান শুনছে। বাউল ও লোকসঙ্গীত শুনে মগ্ন হয়ে আছে। তখনই আধুনিক বাংলা গানের অতুলনীয় বাণী ও সুর নিয়ে এলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর কাব্যগীতি বাঙালির নাগরিক মানসে উতল হাওয়ার দোল জাগালো।

"মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেবো খোঁপায় তারার ফুল" - এমন সহজ করে বাঙালি এর আগে প্রেমের কথা বলতে পারেনি। তাঁর অসাধারণ সব প্রেমের গান নিয়ে কতো লেখা যায়, কতো বলা যায়- তারকি শেষ আছে! গানেই আসল নজরুলের পরিচয়। আজ সেই প্রেমহীন ঘোরে মত্ত আমরা নজরুলকে ধারণ করবো! কি করে?
কবি নজরুলের কাব্যগান, গজল ও প্রেমের কবিতায় আছে আকুলতা, সৌন্দর্যবোধ, দহন, বিরহ ও আত্মবিসর্জনের এক অনন্য মিশ্রণ।
“তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়,
সে কি মোর অপরাধ?”

প্রেমিক কবির দৃষ্টি কেবল পার্থিব সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট নয়; এটি চিরসুন্দরের প্রতি শর্তহীন নিবেদন। তাঁর প্রেমের ভাষা তাই দেহাতীত সৌন্দর্যচেতনায় উৎসারিত এক অনিন্দ্য সুষমার প্রকাশ। প্রেম প্রকাশে তাই লক্ষ্য করা যায় অসাধারণ রূপক ও উপমার সুনিপুণ ব্যবহার। আবার কখনো তাঁর প্রেম শান্ত ও স্থির নয়; তা বজ্রের মতো তীব্র, আগুনের মতো দহনময়। তাই প্রেমের উপমায় তিনি বিচিত্র শব্দ সমূহ রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাই নজরুলের প্রেমে যেমন কোমলতা আছে, তেমনি আছে উদ্দাম অফুরন্ত প্রাণশক্তি। আবার বিরহী নজরুলের কাব্যভাষা হয়ে ওঠে গভীর বেদনাময়। শাওন রাতে ঘরের বাহিরে যখন ঝড় বয়ে যায় তখন তাঁর নয়নে বারি ঝরে। কতোটা আবেগ আর অধিকারের শক্তি থাকলে বলা যায় -
“যবে তুলসীতলায় প্রিয় সন্ধ্যাবেলায় তুমি করিবে প্রণাম
তব দেবতার নাম নিতে ভুলিয়া বারেক
প্রিয় নিও মোর নাম।”

প্রেমিক নজরুলের আরেকটি ব্যতিক্রমী দিক হলো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতার গণ্ডী ডিঙিয়ে একইসঙ্গে ইসলামী গজল, শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও সুফি ভাবনার প্রেম-সঙ্গীত রচনা করেছেন। তাঁর প্রেমে যেমন জীবাত্মা ও পরমাত্মা রূপী রাধাকৃষ্ণের মিলন-বিরহ আছে, তেমনি সুফি সাধকের সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মবিসর্জনের আকাক্সক্ষাও আছে। ফলে তাঁর প্রেম কোনো ধর্মীয় সংকীর্ণতায় আবদ্ধ নয়; তা হয়ে উঠেছে বিশ্বমানবতার বিরহ-মিলন গাঁথা।

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

এমন সত্য ভাষণে নারীর মর্যাদার কথাটি সহজ করে আমাদের অবরোধবাসিনীদের কবি শুনিয়েছিলেন। নারী কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, ঘরের শোভা নয়, নারীকে সভ্যতার সহ-নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন কবি। তাঁর প্রেম নারীকে মর্যাদা ও সমতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যে প্রেমে দ্রোহ, প্রতিবাদ, শক্তি, সাহস, দহন, তেজ, ঔদার্য, ঐতিহ্যপ্রীতি, কোমলতা, বিগলিত আবেগ একই সাথে প্রবহমান হয়েছিল সেই প্রেমই তাঁকে সাম্য ও মানবতার কবিতে রূপান্তরিত করেছিল।

মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই তিনি সাম্যবাদী হয়েছেন, ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, শোষিতের কণ্ঠস্বর হয়েছেন এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে দ্রোহ ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ তাঁর বিদ্রোহের মূল উৎস ছিল প্রেম। প্রেমহি কেবলম্। ভোগবাদী নয়, প্রেমই শক্তি হয়ে মানবতার পক্ষে তাঁকে দ্রোহী সত্তায় পরিণত করেছে। এ কারণেই নজরুল এক অনন্য সমন্বয়ের নাম। তাই নজরুল আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক- যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, মানুষকে মুক্ত ও মহৎ হতে শেখায়। আমরা তাঁর প্রেমটাকে আদৌ কতোটা বুঝতে পেরেছি! আমাদের আবরণে আস্ফালনে আবদ্ধতায় প্রতিদিন সেই প্রেমের মৃত্যু হয়, নজরুলের মৃত্যু হয়। যুগমানব নজরুল প্রেমে মগ্ন থেকেও সেসময়ের বৈশ্বিক বাস্তবতাকে বুঝতে ভুল করেননি। কবি সত্যকে দেখেন, জানেন, প্রকাশ করেন পক্ষপাতহীনভাবে। কবি নজরুলের প্রেমসিক্ত মানব ভাবনা ও রাজনৈতিক দর্শনকে যথার্থভাবে বুঝতে হলে তাঁর সময়ের বৈশ্বিক ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনুধাবন করা প্রয়োজন। কারণ নজরুল কেবল একটি উপনিবেশিক দেশের কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার কবি। তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার ভিত গড়ে উঠেছিল এমন এক অস্থির যুগে, যখন সমগ্র পৃথিবী যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ, বিপ্লব, জাতীয়তাবাদ, সাম্যবাদ ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল।

বিশ শতকের প্রথমার্ধ ছিল মানবসভ্যতার এক গভীর রূপান্তরের সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ঔপনিবেশিক শোষণ, রুশ বিপ্লব, তুরস্কের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের উত্থান, এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনÑসবকিছু মিলিয়ে সেই সময়ের মানুষ এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান করছিল। নজরুলের মানবপ্রেম ও মানবতাবাদ এই বৈশ্বিক অস্থিরতারই এক সৃজনশীল ও বিদ্রোহী প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিস্ফোরিত হয়েছিল।

১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্ষমতার লড়াই লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, ধ্বংস ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। যুদ্ধ মানুষের সভ্যতা, নৈতিকতা ও আধুনিকতার অহংকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কাজী নজরুল বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন অতিবাহিত করেন এবং ১৯২০ সালে রেজিমেন্টটি ভেঙে দেওয়া হলে সেনাবাহিনীর চাকরী ছেড়ে চলে আসেন। যার ফলে তিনি যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের নির্মম বাস্তবতা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেন। যুদ্ধে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে ক্ষমতালিপ্সু রাষ্ট্রব্যবস্থা সাধারণ মানুষকে কেবল হীনস্বার্থে বলির পাঁঠায় পরিণত করে। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মানব ভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই তাঁর কবিতায় মানুষ বারবার রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। তাঁর বিদ্রোহ কেবল ব্রিটিশবিরোধী নয়; এটি যুদ্ধনির্ভর অমানবিক সভ্যতার বিরুদ্ধেও। রুশ বিপ্লব ও সাম্যচেতনার উত্থানও নজরুলকে প্রভাবিত করেছিল।

১৯১৭ সালের Russian Revolution বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করে। শ্রমিক ও কৃষকের অধিকার, শ্রেণিবৈষম্যের অবসান এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা পৃথিবীর নানা দেশের মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে আলোড়ন তোলে। তখন নজরুল সরাসরি কোনো রাজনৈতিক মতবাদের প্রচারক না হলেও রুশ বিপ্লবের সাম্যচেতনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর “সাম্যবাদী” কবিতা, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং ধনী-গরিব বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এই বৈশ্বিক সমাজতান্ত্রিক আবহের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবেই সম্পর্ক যুক্ত। তবে সর্বতোভাবে প্রেমিক নজরুলের সাম্যবাদ ছিল মানবিক ও নৈতিক সাম্যবাদ। তিনি কেবল অর্থনৈতিক বিপ্লব চাননি; তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মর্যাদার অধিকার। এই কারণে তাঁর সাম্যচিন্তা একটি কঠোর মতাদর্শিক কাঠামোর চেয়েও বেশি মানবতাবাদী। নজরুল এমন এক সময়ে লিখছিলেন, যখন এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির শাসনের অধীনে ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারতকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করছিল। একই সঙ্গে মিশর, তুরস্ক, আরব বিশ্ব ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলেও স্বাধীনতার আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল।

এই বৈশ্বিক উপনিবেশবিরোধী চেতনা নজরুলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এখানেই বিশ্বচেতনার সাথে কবির যোগ ছিল। তাঁর সাহিত্য মুক্তিকামী ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে আন্তর্জাতিক মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। বিশেষত তুরস্কের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং কামাল আতাতুর্ক -এর নেতৃত্বে আধুনিক তুরস্ক গঠনের ঘটনা নজরুলকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি তুরস্কের স্বাধীনতা সংগ্রামকে মুসলিম বিশ্বের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ ধর্মীয় ছিল না; বরং এটি ছিল উপনিবেশবিরোধী মানবমুক্তির চেতনা। ভারতীয় উপমহাদেশে খিলাফত আন্দোলন এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন তখন ব্রিটিশবিরোধী গণআন্দোলনের নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল। একই সময়ে হিন্দু-মুসলিমের দীর্ঘকালের পুরোনো সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বিভাজন তীব্র হয়ে উঠেছিল। নজরুল উপলব্ধি করেছিলেন যে ঔপনিবেশিক শক্তি ধর্মীয় বিভাজনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই তিনি মানবতার ভিত্তিতে ঐক্যের ডাক দেন।

“অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন।
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার”

এমন মানবতাবাদী প্রতিবাদ ও প্রতিজ্ঞা প্রেম না থাকলে হয়ে ওঠেনা। ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে মানুষ পরিচয়কে বড় করে তুলেছেন কবি। পরবর্তীকালের ধর্মনিরপেক্ষ ও pluralist রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে কবির এই মানবপ্রেম ও মানবতাবাদ গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়েছিল। ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদ ও কর্তৃত্ববাদের প্রেক্ষাপটেও নজরুলের দর্শন বিরুদ্ধ অবস্থান নিয়েছিল। নজরুলের সাহিত্যকর্ম যখন চারিদিকে প্রশংসিত ও সমাদৃত হচ্ছে তখন ইউরোপে ধীরে ধীরে ফ্যাসিবাদ ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির উত্থান শুরু হচ্ছিল। বেনিতো মুসোলিনির ইতালি এবং পরবর্তীতে এডলফ হিটলারের জার্মানিতে ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধ হুমকির মুখে পড়ে। যদিও নজরুল সরাসরি ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেননি, তাঁর সমগ্র সাহিত্যের অবস্থান ছিল কর্তৃত্ববাদ ও অমানবিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে। তাঁর বিদ্রোহী চেতনা মূলত সেই সব রাজনৈতিক শক্তির বিরোধিতা করে, যারা মানুষকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখতে চায় না। তাঁর মানব ভাবনায় প্রেম, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব-এই চারটি মূল্যবোধ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশ শতকের শুরুতে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ, রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ফলে “বিশ্বমানবতা” বিষয়ক ধারণা নতুনভাবে গুরুত্ব পেতে থাকে। নজরুলও নিজেকে কেবল বাংলা বা ভারতীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কবিতায় আরব, পারস্য, তুরস্ক, আফ্রিকা, ইউরোপ-বিভিন্ন দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির উল্লেখ পাওয়া যায়।

তিনি মানুষের সংগ্রামকে সার্বজনীন হিসেবে দেখেছেন। এই কারণেই তাঁর মানবতাবাদ এক ধরনের cosmopolitan humanism বা বিশ্বজনীন মানবতাবাদ। তাঁর কাছে মানুষের বেদনা ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা সর্বত্র এক। বিশ শতকের আধুনিকতা একদিকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক চেতনার নতুন দিগন্ত খুলে দেয়; অন্যদিকে যুদ্ধ, ভোগবাদ ও বিচ্ছিন্নতার সংকটও সৃষ্টি করে। নজরুল এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে মানবিক মূল্যবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর মানব ভাবনা তাই উন্নাসিক আধুনিকতার সমালোচনাও বটে। তিনি এমন এক সভ্যতার বিরোধিতা করেছেন, যেখানে প্রযুক্তি আছে কিন্তু মানবতা নেই; রাষ্ট্র আছে কিন্তু ন্যায় নেই; ধর্ম আছে কিন্তু প্রেম নেই।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রেমহীনতাই মানুষকে চরম উগ্র, ধর্মান্ধ, কপট, বর্ণচোরা, ভোগবাদী, আবেগহীন যন্ত্র অর্থাৎ অমানুষে পরিণত করেছে। পারপাস নির্ভর আয়োজনে ও উদযাপনে প্রেম থাকেনা থাকে হেডম। করেছিতো! কতো বড় অনুষ্ঠান করেছি! বাঙালি এতেই পটু হয়ে গেছে অনেক আগে থেকেই। আউট অব টপিক বক্তৃতা, আত্মপ্রচার, রসহীন প্রেমহীন শব্দ প্রক্ষেপণ, নানা হিসেব-নিকেশ, ছলচাতুরী - এসবে আমার ভালোবাসার নজরুলের, প্রেমিক নজরুলের, চেতনার নজরুলের মৃত্যু হয়, যদিও তিনি অমর অক্ষয়। তথ্য ও পরিসংখ্যান জানার প্রয়োজন আছে অবশ্যই। তবে অখণ্ড নজরুল, ভাগ না হওয়া নজরুল, প্রেমিক নজরুলকে না বুঝতে পারলে শুধু তথ্য, পরিসংখ্যান, রেফারেন্স এসব নিরস আলোচনায় নজরুলের প্রতিদিনের মৃত্যু থামানো যাবেনা। রবীন্দ্রনাথ, লালন সকলের ক্ষেত্রেই তাই রসটা নেওয়া বা নিতে জানাটা খুব জরুরী। মন সফেদ নাহলে, নিজে রসের নাগর নাহলে তা হয় না।

পাঠ নেই, বোধ নেই, অনুধ্যান নেই, সারগর্ভ প্রজ্ঞা মথিত আলোচনাও নেই, আছে শুধুই বাহ্যিক আড়ম্বর। গান শুনেনা, গান বুঝে না, গানের সুর-তাল-বাণী রক্তেও নেই হৃদয়েও নেই। প্রতিদিন তাই অপমানিত হন নজরুল, মৃত্যু হয় তাঁর। প্রেমহীন সমাজে প্রেমের সমাধি রচিত হয় রোজ। যেমনটা হয় শত মহাজনের, মনিষীর। যেমনটা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের। অপার বিস্ময়ে আবার জেগে ওঠেন তাঁরা বার বার। যুগচেতনার অগ্নিমশাল, যুগদ্রষ্টা, যুগচিন্তক, যুগমানব কবি কাজী নজরুল ইসলাম চরম দারিদ্র্য, বৈষম্য, অপমান, নিষ্ঠুরতা ও অন্যায় দেখে দেখে বড় হয়েছেন। তাঁর নির্মাণটা ছিল এর ভেতরে থেকেই। এসকল কঠিন বাস্তবতা তাকে মহান করেছে। কন্টক মুকুট মাথায় পরেও তিনি আজন্ম প্রেমিক ছিলেন। প্রেম তাকে অমর করেছে, অক্ষয় করেছে, উদার করেছে। এই যুগনায়ক প্রেমের শক্তিতেই হয়েছেন চিন্তানায়ক। সেই প্রেম অবিরাম বর্ষণে মুখরিত করুক অগণিত দিশাহারা শুষ্ক হৃদয়কে। বিভাজিত আমি চেয়ে দেখি শুধু ভাগ না হওয়া আমার কবিকে অপার বিস্ময়ে আর নিভৃত ভালোবাসায়।

নিরঞ্জন দে - লেখক, প্রামাণ্যকার ও সংগঠক

আপনার মন্তব্য

আলোচিত