১৪ অক্টোবর, ২০১৫ ০৯:৫৫
ইতালির নাগরিক সিজার তাভেলার হত্যারহস্যের জট শিগগিরই খুলছে। এরই মধ্যে তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। যে কোনো দিন দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে গণমাধ্যমকে সবকিছু খোলাসা করা হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হয়েছেন, বাংলাদেশে দুই বিদেশি হত্যার সঙ্গে আইএস জড়িত নয়। তদন্তের ধারা অন্যদিকে নিতে আইএসের নাম ব্যবহার করে টুইটবার্তা আপলোড করা হয়েছে।
খুনের পর কখন কীভাবে আইএসের নামে টুইটবার্তা আপলোড করা হয়েছে, সে ব্যাপারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি গ্রুপ বিদেশিদের হত্যার টার্গেট করে।
নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফর বাতিল করলে ওই চক্রটি বিদেশিদের হত্যা করে 'ঘোলা পানিতে' মাছ শিকারের চেষ্টা করে। গুলশানে তাভেলাকে হত্যার পর একই মতাদর্শের জঙ্গিরা রংপুরে হোশি কোনিওকে খুন করে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকালও বলেছেন, বাংলাদেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে দুই বিদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। যারাই এই খুনে জড়িত, তারা কোনো ছাড় পাবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, তদন্তে অগ্রগতি হচ্ছে। আশা করি, অল্প সময়ের মধ্যে আরও 'ভালো খবর' পাওয়া যাবে। র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, খুব দ্রুত জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। র্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, আইএসের নাম ব্যবহার করে টুইটবার্তা ঢাকা ও রংপুর থেকে আপলোড করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি মাহফুজুল ইসলাম সমকালকে জানান, তাভেলা হত্যারহস্য দ্রুত উন্মোচনের ব্যাপারে তারা আশাবাদী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাভেলা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহভাজন গুরুত্বপূর্ণ একজনকে 'আটক' করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্যও মিলেছে। অবশ্য এখনও তাভেলা হত্যার ঘটনায় কাউকে আটক বা গ্রেফতারের কথা স্বীকার করেনি কোনো সংস্থা।
তাভেলা হত্যার ঘটনায় তিন মোটরসাইকেল আরোহীর ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে। যারা ইতালির নাগরিককে বারিধারা থেকে অনুসরণ করছিল, তাদের ব্যাপারে আরও খোঁজ নিচ্ছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, তাভেলা হত্যার পর মূল ঘটনাস্থলে সিসিটিভি না থাকলেও গুলশান এলাকার অন্যান্য সড়ক থেকে সংগ্রহ করা অন্তত দুই শতাধিক ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া গুলশান এলাকায় ব্যবহৃত পাঁচ হাজার মোবাইল ফোনের রেকর্ড ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তদন্ত করেন গোয়েন্দারা।
তাভেলা হত্যার ঘটনায় দুটি বিষয়ে গোয়েন্দারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এক. যারা সরাসরি হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করা; দুই. হত্যার পর 'আইএস' নাম ব্যবহার করে যে গ্রুপ টুইটবার্তা দেয়, তাদের শনাক্ত। তদন্তের এ পর্যায়ে টুইটবার্তার ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে। গোয়েন্দারা বলছেন, হত্যার পরপরই যিনি প্রথম টুইট করেন, তদন্তের জন্য তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পর তার মাধ্যমে যেসব লিংক থেকে রিটা কাৎজ পান, সে ব্যাপারে নিবিড় অনুসন্ধান চলছে।
'জজ মিয়া' নাটক নয়, তদন্তসংশ্লিষ্টরা সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আসামিদের আইনের আওতায় নিতে চান। গোপীবাগে সিক্স মার্ডার, ফার্মগেটে মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী ও ব্লগার অভিজিৎ খুনের মামলার মতো তাভেলা হত্যারহস্য উন্মোচনে দীর্ঘ সময় লাগবে না বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আইএস পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় যেসব সংগঠনকে তাদের 'সমমনা' বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানে এখনও বাংলাদেশের কোনো সংগঠন নেই। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কোনো উগ্রপন্থি সংগঠনকে আইএস স্বীকৃতি দেয়নি।
এ ছাড়া আইএস এখনও কোনো মুসলমান হত্যা করেনি। রংপুরে হোশি কোনিও ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন। তাই আইএস যেসব ব্যক্তিকে টার্গেট করে, তার সঙ্গে দুই বিদেশি হত্যার কোনো সাদৃশ্য নেই।
তাভেলা হত্যার পর সরকারের একাধিক প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করে কাজ করছেন। মঙ্গলবার সব গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি বৈঠকও হয়। আগামীতে একই ধরনের হত্যাকাণ্ড যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে আরও সমন্বিতভাবে কীভাবে কাজ করা যায়, তা সেখানে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে আজ বুধবার সিজার তাভেলার মরদেহ ইতালিতে নেওয়া হচ্ছে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মরচুয়ারিতে রাখা তাভেলার মরদেহ ইতালির দূতাবাস কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দেওয়া হবে। এর পর কার্গো বিমানে তা ইতালিতে নেওয়া হবে। যে কোনো বিদেশির মরদেহ নিজ দেশে ফেরত নিতে যে আট সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন, এরই মধ্যে সে অনুমোদন পাওয়া গেছে।
তথ্যসূত্র: সমকাল অনলাইন।
আপনার মন্তব্য