১৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ০১:০৬
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বুধবার সকালে শহীদদের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে
বুধবার ১৬ ডিসেম্বর সকালে দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ এবং শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্মূল কমিটির ৫০তম বিজয় দিবস পালনের কর্মসূচি আরম্ভ হয়।
বিকেলে সংগঠনের সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে ৫টি দেশের ছাত্র ও যুব নেতৃবৃন্দকে নিয়ে এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে আলোচ্য বিষয় ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় বিজয়: নতুন প্রজন্মের নিকট আমাদের প্রত্যাশা ও করণীয়।’
সম্মেলনে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে যথাক্রমে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি এবং শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপি।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, নির্মূল কমিটির তুরস্ক শাখা ‘টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিজম’-এর সাধারণ সম্পাদক লেখক ও প্রামাণ্য চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন- সাংবাদিক মানস ঘোষ (মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ‘স্বাধীনতা মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত ভারতের দৈনিক স্টেটসম্যান-এর প্রাক্তন সম্পাদক), সমাজকর্মী ইলোরা দে (সাধারণ সম্পাদক, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতি, ভারত), চলচ্চিত্রনির্মাতা প্রকাশ রায় (আহ্বায়ক, নির্মূল কমিটি, ফ্রান্স), লেখক সাব্বির খান (সহযোগী সম্পাদক, জাগরণ, সুইডেন), গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক মারুফ রসুল (লেখক, ব্লগার, সহযোগী সম্পাদক, জাগরণ), অনলাইন এ্যাকটিভিস্ট কবীর চৌধুরী তন্ময় (সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম), গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক বাপ্পাদিত্য বসু (সাধারণ সম্পাদক, ইয়ুথ ফর ডেমোক্রেসি এন্ড ডেভেলপমেন্ট), সমাজকর্মী অলিদ চৌধুরী (কার্যনির্বাহী সাধারণ সম্পাদক, নির্মূল কমিটি, চট্টগ্রাম), সমাজকর্মী আজাদ জাহান শামীম (সদস্য সচিব, নির্মূল কমিটি, ময়মনসিংহ), সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী (সহ-সভাপতি, নির্মূল কমিটি, খুলনা) ও উপাধ্যক্ষ কামরুজ্জামান (সহ-সাধারণ সম্পাদক, নির্মূল কমিটি)।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী ’৭৫-এ শহীদ চার জাতীয় নেতা, ৩০ লক্ষ শহীদের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে অকুণ্ঠ সহযোগিতার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী এবং ভারতীয় জনগণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক এম পি বলেন, যারা ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে ভারতের চক্রান্ত ও ইসলামবিরোধী বলেছিল, যারা ’৭১-এ ইসলামের দোহাই দিয়ে গণহত্যা ও নারী নির্যাতন করেছিল তারাই আজকে ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে কথা বলছে ইসলামের দোহাই দিয়ে। এরা যুগে যুগে ধর্মের আধ্যাত্মিকতা বা প্রধান বিষয় বাদ দিয়ে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ও ব্যবসা করছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের আক্রোশে প্রধান কারণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু তাদের সাধের পাকিস্তান ভেঙেছিলেন। দেশের প্রকৃত মুসলমান বা প্রকৃত আলেমরা এদের সমর্থন করেন না। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান এবং সংবিধানে বর্ণিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে হবে। মাদ্রাসা বা কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাওয়া হবে না এটা কোনোভাবে চলতে দেয়া যায় না। স্বাধীনতাবিরোধীদের এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে সংবিধানে বর্ণিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সব অসঙ্গতি রয়েছে সেগুলো দূর করতে হবে।’
বিশেষ অতিথির ভাষণে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছে সে সব অর্ধশিক্ষিত তথাকথিত আলেমদের কাছে আমরা ইসলামকে ইজারা দেইনি। কোরান হাদিসের কোথাও ইসলামের এ ধরনের ঠিকাদারি ব্যবস্থা নেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ২১ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। সামরিক শাসন, স্বৈরাচার কিংবা মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করলে আওয়ামী লীগ অনেক আগেই ক্ষমতায় যেতে পারত। আওয়ামী লীগ ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সঙ্গে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে কিংবা বঙ্গবন্ধু আদর্শের সঙ্গে কখনও বেইমানি করবে না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ধর্ম অত্যন্ত পবিত্র বিষয়। ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক রাখতে হবে। ইসলাম এসেছে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য। ইসলাম কখনও কোনও নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের ধর্ম হতে পারে না। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের কোনও বিকল্প নেই। যে প্রযুক্তিকে তথাকথিত আলেমরা একসময় হারাম বলেছিল আজ সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্রবিরোধী, ইসলামের মূল চেতনাবিরোধী বক্তব্য ভাইরাল করছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের উচিৎ হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের মূল্যে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি ইসলামিক রিপাবলিক করার জন্য নয়। বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। এদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবাই সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাস করবে। যারা কোনও ধর্ম মানে না তারাও থাকবে। ওয়াজের নামে ভিন্নধর্ম বা ভিন্নমতের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ যা ছড়াচ্ছে তারা সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করছে। এদের বিরুদ্ধে গ্রামে গঞ্জে সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।’
মূল প্রবন্ধে নির্মূল কমিটির নেতা তুরস্কের শাকিল রেজা ইফতি বলেন, এদেশের তরুণরা ইতিহাস জানে এবং পড়ে কিন্তু এই ইতিহাসের পেছনের চেতনা নিয়ে ভাবে না। আমাদের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসটি যে ফেলনা নয়, এর মাহাত্ম্য ও গভীরতা যে কতটা মূল্যবান, সেই চেতনা তরুণদের লালন করতে হবে। এই চেতনার মূল উৎস হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর দর্শন, যা প্রতিফলিত হয়েছে ’৭২-এর সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রের চার মূলনীতিতে। শহিদ মিনারে প্রদীপ প্রজ্বলন, আলপনা অঙ্কন, বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা, ভাস্কর্য নির্মাণ- বাঙালি সংস্কৃতির এ ধরনের অভিব্যক্তি সম্পর্কে মৌলবাদীরা অহরহ ধর্মের নামে অপব্যাখ্যা করে এবং তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্তিতে ফেলার চেষ্টা করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ভাষা ও সংস্কৃতির কোনো ধর্ম হয় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ তরুণদের বিপুলভাবে উজ্জীবিত করেছে। বাংলাদেশে তরুণদের দেশপ্রেম এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার ক্ষেত্রে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ৩০ লক্ষ শহীদের স্বপ্নপূরণে তরুণরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমে যে অবদান রাখছে তার প্রতি সরকারকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে।’
সভাপতির ভাষণে শাহরিয়ার কবির বলেন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং জীবনদানকারী শতকরা ৯০ ভাগ ছিলেন বয়সে তরুণ। বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বের স্বাধীনতার সংগ্রামে এবং সমাজ বিপ্লবে তরুণরা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায়, যে ভবিষ্যৎ গড়বে পরবর্তী প্রজন্ম। বাংলাদেশ স্বাধীন করার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে একটি অনন্যসাধারণ সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- এই সংবিধান ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে লেখা। এটি রক্ষার দায়িত্ব পরবর্তী প্রজন্মের। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চিহ্নিত মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এবং তাদের রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকারীরা যখন আমাদের জাতির পিতার দর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর বার বার আঘাত করছে তখন এই অপশক্তিকে পরাজিত ও নির্মূল করার জন্য তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে এবং ৫০তম বিজয় দিবসে তাদের এই শপথই গ্রহণ করতে হবে।’
সভায় বক্তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি প্রদানকারী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি বাক্য উচ্চারণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য ব্যারিস্টার নওফেল ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা এবং জাতির পিতার দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তারা যেন মৌলবাদীদের কোনও রকম প্রশ্রয় না দেয়ার জন্য সরকারের উপরও চাপ সৃষ্টি করেন।
আপনার মন্তব্য