নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ জুন, ২০২১ ২০:১৮

বড়লেখা ও কুলাউড়ার খাসিপুঞ্জিতে সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে

নাগরিক প্রতিনিধি দলের সংবাদ সম্মেলন

মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও কুলাউড়ায় পানপুঞ্জি জবরদখল, গাছ কাটা ও পানজুম ধ্বংসের ঘটনায় আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। সম্প্রতি ওই এলাকার পানপুঞ্জি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক প্রতিনিধি দল এই অভিমত দিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে তারা ছয় দফা সুপারিশে ঘটনাগুলো তদন্ত করে দোষীদের আইন ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

এছাড়া পানপুঞ্জিতে বসবাসকারী খাসি ও মান্দিদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত, চা বাগান সম্প্রসারণের নামে পানপুঞ্জির ধ্বংস করা বন্ধ করার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

মঙ্গলবার রাজধানীর লালমাটিয়ায় নাগরিক উদ্যোগ হলরুমে এ সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারদের সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং পুঞ্জির অধিবাসীদের জীবন ও জীবিকার সামগ্রিক নিরাপত্তা বিধানের দাবিও জানায় দলটি।

সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জের খাসি ও মান্দিরা ঐতিহ্যগতভাবে বনবিভাগ, চা-বাগান এবং কিছু খাসজমি এলাকায় বসবাস করেন। খাসিদের বিশেষ পানজুম স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র্পে এক সবুজ আবহ তৈরি করে।’

সরেজমিনে আমরা দেখেছি, পানপুঞ্জিগুলো তুলনামূলকভাবে উদ্ভিদপ্রজাতিতে বেশ বৈচিত্র্যময় এবং সেখানকার প্রাকৃতিক ছড়া আবর্জনামুক্ত। জানতে পেরেছি পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা আদিবাসী শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শিখে থাকে। চা-বাগান কর্তৃপক্ষ, চা-বোর্ড, ভূমি মন্ত্রণালয়, বনবিভাগ, আদিবাসী সংগঠন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ সকলের মতামত ও পরামর্শেই এই সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

সম্মেলনে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘দেশের ভিন্ন সত্তার পরিচয়ে বসবাস করা জাতিসত্তার ওপর এই ধরণের নিপীড়ন বারবার হতে পারে না। এগুলো সিস্টেমেটিক এটেম্পট। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে উল্লেখ আছে যে, আদিবাসীদের ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এই পলিসির দ্রুত পরিবর্তন হবে বলে আমরা মনে করি না।’

চা বাগানের ভেতরে যত আদিবাসী ভূমি লিজ হিসাবে নেওয়া হয়েছে সেগুলোকে লিজের আওতা বহির্ভূত করে দেওয়ার আহ্বানও জানান রিজওয়ানা হাসান।

সঞ্জীব দ্রং মৌলভীবাজারের প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘ভূমি ও বন আইন দিয়ে আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা সমাধান করা যাবে না। এটার জন্য নতুন ভাবে ভূমি ও বন-নীতি করা লাগবে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কমিশন গঠন করা না হবে ততক্ষণ সমতলের আদিবাসীদের 'স্ব স্ব জমি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না' মর্মে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের প্রশাসনকে আইন অথবা ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে একটি 'গভর্মেন্ট অর্ডার' পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’

পাভেল পার্থ বলেন, ‘গত ৩৫ বছরে চা বাগান ও পান পুঞ্জি নিয়ে যে যতগুলো খবর বেরিয়েছে ততগুলো বিশ্নেষণ করে দেখেছি, কোনো গাছ কাটা বা জুম দখল করার ঘটনা ঘটলে সাংবাদিকেরা এগুলো সামনে নিয়ে আসেন। কিন্তু এই অঞ্চলের আদিবাসীদের পানজুম যে পরিবেশবান্ধব তা দেখানোর চেষ্টা করেছে না। তিনি পানপুঞ্জিগুলোতে আদিবাসীরা যে উৎপাদন ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে তার স্বীকৃতিরও দাবি করেন।’

সভাপতির বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, ‘মৌলভীবাজারে ৬৫টি পানপুঞ্জি ও চা শ্রমিকদের নিয়ে যথেষ্ট তথ্য ও গবেষণা নেই। তথ্য যদি না থাকে, তাহলে আমাদের আগামী ৩০ সাল নাগাদ যে লক্ষমাত্রা (এসডিজি) আছে সেটা কীভাবে বাস্তবায়ন করবো? বাংলাদেশে এই আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের জন্য কোনো ধরণের কমিশন ও পলিসি নেই। যার ফলে বিগত ৫০ বছরে তাদেরকে আমরা একটা 'ভালনারেবল' পরিস্থিতির মধ্যে রেখে দিয়েছি।’

মৌলভীবাজারের খাসি ও চা শ্রমিকরা যে পরিবেশে আছে সেটা আধুনিক দাসত্বের রূপ বলেও মনে করেন জাকির হোসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন বাপার কেন্দ্রীয় সদস্য আমিনুর রসুল বাবুল ও আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক দীপায়ন খীসা।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত