২৩ আগস্ট, ২০২১ ১৬:০০
বরিশালে ইউএনওর বাসভবনে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সিটি মেয়রকে প্রথমে গ্রেপ্তার, পরে বরখাস্ত করা হবে—সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে এই পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন থেকে কঠোর ভাষায় একটি বিবৃতি প্রকাশের পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিবৃতিতে মেয়রকে ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত’ উল্লেখ করায় ক্ষুব্ধ হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলও। এখন সেই বিবৃতিকে কেন্দ্র করে সচিবালয়সহ সারা দেশের মাঠ প্রশাসনের সর্বত্র আক্ষেপের সুর শোনা যাচ্ছে।
এ ঘটনায় রবিবার রাতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে।
রোববার আট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার নিয়ে নিয়মিত মাসিক বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদসচিবের সভাপতিত্বে বিভাগীয় কমিশনারদের বাইরে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ স্থানীয় সরকার, জননিরাপত্তা বিভাগ, জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসচিবসহ কয়েকজন সিনিয়র সচিব উপস্থিত ছিলেন। বরিশালের ঘটনার পর বিবৃতির ঘটনাটি ওই বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে কেউ কেউ বিবৃতির ভাষা কড়া হলেও তা এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজন ছিল বলেও মত প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ওই রকম ভাষায় বিবৃতিটি না দিলেই বরং প্রশাসনের জন্য ভালো হতো। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
ওই বিবৃতির ভাষার বিষয়ে দুই দিন রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে সমালোচনামূলক কোনো মন্তব্য না এলেও গতকাল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হাছান মাহমুদ বিবৃতিটি ‘চটজলদি হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন। আর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম আশা প্রকাশ করেন, ঘটনাটি ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে, দ্রুতই এটা মিটে যাবে।
কমিশনারদের বৈঠক শেষে সিনিয়র সচিবরা মন্ত্রিপরিষদসচিবের কক্ষেও কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ইউএনওর ওপর হামলা কোনো ব্যক্তি বা অফিসারের ওপর হামলা নয়, এটা সরকারের ওপর হামলা। হামলার ঘটনার ভিডিও থাকায় সেটার গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। তাই এ বিষয়ের আগে থেকেই সরকারপ্রধান মেয়রের বিষয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাকে গ্রেপ্তারের পর বরখাস্ত করা হবে, তা-ও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু অ্যাসোসিয়েশনেরর পক্ষ থেকে বিবৃতিটি প্রকাশ হওয়ার পর রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। যা পুরো ঘটনাকে প্রশাসনের বিপক্ষে নিয়ে গেছে।
সচিবালয়ে একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারাও বিবৃতির কারণে ঘটনার বল রাজনৈতিক পক্ষের ঘরে চলে গেছে বলে মনে করেন।
জনপ্রশাসনের একজন যুগ্ম সচিব বলেন, বরিশালের ঘটনার পর থেকে সদ্য সাবেক ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পর্যন্ত ইউএনওর পক্ষ নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। পুরো বিষয়টিই অফিসারের পক্ষে ছিল; কিন্তু ওই ভাষায় বিবৃতি দেওয়ার কারণে সেটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
রোববার কমিশনার বৈঠকেও এ বিষয়ে আলোচনা উঠলে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেছেন, এই বিবৃতি সংগঠনের বৈঠকের পর গেছে। তাই এটা কারো ব্যক্তিগত বিবৃতি নয়, সংগঠনের বিবৃতি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সরকারের একজন সিনিয়র মন্ত্রী বলেন, বরিশালে অন্য অনেক বিষয়েই মেয়রের ওপর সরকারের শীর্ষ পর্যায় ক্ষুব্ধ ছিল। এই ঘটনা সেটা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তবে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ওই রকম ভাষায় বিবৃতি না দিলেই পারতেন।
প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকে বরিশালের ঘটনায় তাদের বিবৃতিগত অবস্থান থেকে পেছানো হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। তবে সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে কোনো নিদের্শনা এলেই শুধু তারা সেটা বিবেচনা করবেন। অন্যদিকে মাঠ প্রশাসনের জুনিয়র কর্মকর্তাদের কার্যক্রমে পরিপক্বতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ কারণে ইউএনও পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম করা হচ্ছে বলে বৈঠকে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আলী আজম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনসচিব বৈঠকে জানান, এসি ল্যান্ড থেকে সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে যাতে নিয়োগ দেওয়া না হয় সেই ব্যবস্থা করছে তার মন্ত্রণালয়। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, এসি ল্যান্ড হিসেবে কাজ করার পর অন্তত দেড় বছর জেলা প্রশাসনে কাজ করতে হবে। এতে একদিকে মাঠ প্রশাসনে কর্মকর্তার সংকট কমবে, অন্যদিকে তুলনামূলক দক্ষতা নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের প্রধান হিসেবে যোগ দিতে পারবেন কর্মকর্তারা।
এর আগে দিনাজপুরের এক ইউএনওর ওপর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আরো অভিজ্ঞ অফিসারদের ইউএনও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত কি না সেই প্রশ্ন উঠেছিল। এদিকে বরিশাল সদরে নতুন ইউএনও নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় প্রশাসন ক্যাডারের কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিতে পারবেন না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। যদি কেউ এই সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করেন তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্তও হয়েছে।
সচিবালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সবার কাজেরই একটা সীমারেখা আছে। কাজ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে কোনো ঘটনাই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেই। বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল হাসান বাদল বরিশাল সদরে নতুন ইউএনও যেকোনো সময় নিয়োগ হতে পারে বলে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান ইউএনওকে বিভিন্ন কাজে আটকে রাখা হয়েছিল। নতুন কেউ নিয়োগ পেলেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে ব্যানার অপসারণকে কেন্দ্র করে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমান শোভনের সঙ্গে সরকারি বাসভবনের সামনে পুলিশের সঙ্গে মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর সমর্থক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। অন্যদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সাদিক আবদুল্লাহকে রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত উল্লেখ করে তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি জানায়।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
আপনার মন্তব্য